খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
বরিশাল ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে জয় পেয়েছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দুই প্রার্থীই। বরিশালে আবুল খায়ের আবদুল্লাহ (খোকন সেরনিয়াবাত) ও খুলনায় তালুকদার আবদুল খালেক- দুজনই জিতেছেন বড় ব্যবধানে। আর দুই সিটিতেই দ্বিতীয় হয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীরা।
গতকাল সোমবার দুই সিটির ভোট ছিল অনেকটাই শান্তিপূর্ণ। ভোট পড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। খুলনায় বড় কোনো সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি। বরিশালে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের বিরুদ্ধে পেশিশক্তি প্রদর্শন ও এক মেয়রপ্রার্থীর ওপর হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
দুই সিটিতে ‘আনন্দমুখর’ পরিবেশে ভোট হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল। সিইসি বলেন, ‘দু-চারটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া সার্বিকভাবে সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও আনন্দমুখর পরিবেশে ভোট হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘যেটা দেখেছি, আমরা সন্তুষ্ট বোধ করছি। সার্বিকভাবে যে নির্বাচন আজ হয়েছে, তা বেশ সুশৃঙ্খল, আন্দমুখর পরিবেশে হয়েছে। গণমাধ্যমসহ সবখানে ইতিবাচক সংবাদ পেয়েছি।’ ভোটে অনিয়ম ও কেন্দ্রের গোপন কক্ষে ‘ডাকাতে’র উপস্থিতির মতো কোনো ঘটনা দেখা যায়নি বলেও জানান তিনি।
এ সময় একজন মেয়রপ্রার্থীকে রক্তাক্ত করা হলেও এ নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ বলা যায় কিনাÑ এমন প্রশ্নে সিইসি বলেন, ‘এটা আপেক্ষিক। রক্তাক্ত! সব কিছু আপেক্ষিক; উনি কি ইন্তেকাল করেছেন? আমরা দেখেছি, উনার রক্তক্ষরণটা দেখিনি। যতটা শুনেছি-উনাকে কেউ পেছন থেকে ঘুষি মেরেছে। উনিও বলেছেন, ভোট বাধাগ্রস্ত হচ্ছে না, তাকে আক্রমণ করা হয়েছে।’
বরিশাল ও খুলনা সিটি করপোরেশনের নতুন জনপ্রতিনিধি বেছে নিতে গতকাল সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ভোটকেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটগ্রহণ শুরু হয়। খুলনায় সকালের দিকে কেন্দ্রগুলো ফাঁকা থাকলেও সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটার উপস্থিতি বাড়তে থাকে। বেশির ভাগ ভোটকেন্দ্রের বাইরে আওয়ামী লীগের মেয়রপ্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেকের কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতি ছিল।
আওয়ামী লীগের মেয়রপ্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক সকাল সোয়া ৯টায় নগরীর ২২ নম্বর ওয়ার্ডের পাইওনিয়ার বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেন। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘নিরপেক্ষ নির্বাচন করার জন্য ইলেকশন কমিশন সব উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এ জন্য আমি একজন প্রার্থী হিসেবে এটাকে সাধুবাদ জানাই। সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে ভোট হচ্ছে। ফল যাই হোক, আমি মেনে নেব।’
অপরদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মেয়রপ্রার্থী মাওলানা আবদুল আউয়াল সকাল ১০টায় নগরীর ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের বানিয়াখামার এলাকার দারুল কোরআন বহুমুখী মাদরাসা কেন্দ্রে ভোট দেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এখনো ভোটের পরিবেশ ভালো। সব কেন্দ্রে আমাদের পোলিং এজেন্ট আছে। কোনো প্রকার ষড়যন্ত্র না হলে আশা করছি বিপুল ভোটে জয়ী হব।’
এদিকে বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সকাল থেকেই শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ চলে। রোদ উপেক্ষা করে নারী ও পুরুষ ভোটাররা কেন্দ্রে আসতে থাকেন। তবে ভোটগ্রহণে ধীরগতি ছিল। নারীদের কেন্দ্রগুলোয় ধীরগতি ছিল বেশি।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নগরীর বরিশাল কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেন আওয়ামী লীগের মেয়রপ্রার্থী আবুল খায়ের আবদুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত।
অপরদিকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন না হলে ফল মেনে নেওয়ার প্রশ্নই আসে না বলে জানান ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু অভিযোগ জানানো হয়। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী সৈয়দ ফয়জুল করিমের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। এরপর পরিস্থিতি কিছুটা উত্তপ্ত হয়ে যায়।
মেয়রপ্রার্থী সৈয়দ ফয়জুল করিমের ওপর হামলায় জড়িত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। সেই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনার মো. আহসান হাবীব খান হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থীর ওপর হামলার ঘটনা অনাকাক্সিক্ষত বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, হামলাকারীদের আগে গ্রেপ্তার করতে বলা হয়েছে। তারপর তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
এ ছাড়া বরিশাল সিটির কিছু কেন্দ্র থেকে এজেন্ট বের করে দেওয়া এবং দু-একটি বিচ্ছিন্ন হাতাহাতির ঘটনা ছাড়া ভোটগ্রহণ ছিল শান্তিপূর্ণ। ভোটার উপস্থিতিও ছিল মোটামুটি। তবে কিছু কেন্দ্রে ইভিএম জটিলতায় ভোট দিতে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। শেষ দেড় ঘণ্টা ঝড়বৃষ্টির কারণে ভোটার উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে।
ভোটগ্রহণের পর নগরীর শিল্পকলা একাডেমিতে স্থাপিত ফল সংগ্রহ ও পরিবেশন কেন্দ্র থেকে সমন্বিত ফল ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবীর। তিনি জানান, মোট ১২৬ কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের মেয়রপ্রার্থী আবুল খায়ের আবদুল্লাহ (খোকন সেরনিয়াবাত) নৌকা প্রতীকে পেয়েছেন ৮৭ হাজার ৮০৮ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ফয়জুল করিম হাতপাখা প্রতীকে ভোট পেয়েছেন ৩৩ হাজার ৮২৮টি। আবুল খায়ের আবদুল্লাহ এবার প্রথম এই নগরীর মেয়র হচ্ছেন।
খুলনা নগরীর শিল্পকলা একাডেমিতে স্থাপিত ফল সংগ্রহ ও পরিবেশন কেন্দ্র থেকে সমন্বিত ফল ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দীন। সেখানে আওয়ামী লীগের মেয়রপ্রার্থী তালুকদার খালেক নৌকা প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ৫৪ হাজার ৮২৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আউয়াল হাতপাখা প্রতীকে ভোট পেয়েছেন ৬০ হাজার ৬৪টি। খালেক এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হলেন।
ফিরে গেলেন জাহানারা বেগম
দুপুর আড়াইটার দিকে নগরীর মুন্সিপাড়া তৃতীয় গলির বাসিন্দা ৭৮ বছর বয়সের বৃদ্ধা জাহানারা বেগম ছেলে কামরুল ইসলামকে নিয়ে ১৭৯ খুলনা জিলা স্কুল কেন্দ্রে ভোট দিতে এসেছিলেন। কিন্তু ইভিএমের সঙ্গে তার হাতের আঙুলের ছাপ না মেলায় তিনি ভোট দিতে পারেননি।
জাহানারা বেগম বলেন, এই বৃদ্ধ বয়সে ছেলেকে নিয়ে ভোট দিতে এসেছিলাম। ভেবেছিলাম ইভিএম মেশিনে ভোট দেব। কিন্তু আঙুলের ছাপ না মেলার কারণে ভোট দিতে পারলাম না। জানি না, ভবিষ্যতে আর ভোট দিতে আসতে পারব কিনা।
এ কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার রাশেদুল বশির খান বলেন, আঙুলের ছাপ না মেলার কারণে জাহানারা বেগম ভোট দিতে পারেননি। তাকে বলা হয়েছে, বিকাল ৩টার পরে আসতে।
নতুন ভোটাররা খুশি
অনেক তরুণ-তরুণী এবার ভোটার হওয়ার পর প্রথমবার ভোট দিতে পেরেছেন। আবার প্রথমবারেই ইভিএমে ভোট দেওয়া তাদের। স্বাভাবিকভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরে তারা অনেক খুশি। এবারে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৪২ হাজার ৪৩৫ জন নতুন ভোটার ছিলেন। নগরীর ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের খুলনা কলেজিয়েট স্কুল কেন্দ্রে ভোট দেন নতুন ভোটার আবদুল কাদের। ভোট দিতে পেরে তিনি ছিলেন বেশ উচ্ছ্বসিত। সাব্বির নামের আর এক তরুণ বলেন, বন্ধুরা মিলে ইভিএমে ভোট দিতে এসেছি। ভোট দিতে পেরে খুব ভালো লাগছে। ইভিএমে যে এত সহজে ভোট দেওয়া যায়, তা জানতাম না।
নগরীর ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের খুলনা আলিয়া মাদ্রাসাকেন্দ্রে ভোট দিতে আসেন তরুণী নুসরাত রায়হানা। প্রথমবারে পছন্দমতো ভোট দিতে পেরে বেশ ভালা লাগছে বলে জানান তিনি।
৪ জনকে দণ্ড
খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন চলাকালে এক ওয়ার্ডের ভোটার অন্য ওয়ার্ডে গিয়ে বিশৃঙ্খলা করার অভিযোগে চারজনকে দণ্ড দিয়েছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। দুপুর ১২টার দিকে ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের ন্যাশনাল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে এ ঘটনা ঘটে। ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার আকরাম হোসেনের নিকট থেকে ৫০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। এছাড়া তাওহীদুল ইসলাম, আব্দুস সামাদ ও সিরাজুল ইসলামকে অন্য কেন্দ্রে প্রবেশ না করার শর্তে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
১৮ নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আসাদুজ্জামান বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার। তারা ১৮ নম্বর ওয়ার্ডে প্রবেশ করে ভোটকেন্দ্রের সামনে বিশৃঙ্খলা করছিলেন। তাদের নিকট থেকে জরিমানা ও মুচলেকা আদায় করা হয়।
কেন্দ্রের ভেতরেই দুই কাউন্সিলর সমর্থকদের হাতাহাতি
বরিশালের ২১ নং ওয়ার্ডের গোরস্থান রোড মাদ্রাসা কেন্দ্রের ভেতরেই ভোট দিতে আসা লাটিম মার্কার প্রার্থী মু. শাহরিয়ার সাচিব (রাজিব) এবং টিফিন বক্স মার্কার প্রার্থী শেখ সাঈদ আহমেদ (মান্না) এর সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে।
সোমবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
ভোটগ্রহণ শুরুর পর থেকেই দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রের ভেতরে ও বাইরে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। একপর্যায়ে উভয়পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে তর্কাতর্কি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
টিফিন বক্স মার্কার প্রার্থী শেখ সাঈদ আহমেদ (মান্না) এর সমর্থক শাহিন হোসেন বলেন, লাটিম মার্কার প্রার্থী ও তার স্ত্রী ভোটারদের জোর করে তাদের পক্ষে ভোট দেওয়াচ্ছে। আমাদের কাউকে ঢুকতে দিচ্ছে না। তারা আমাদের সন্ত্রাসী বলছে। আমাদের বিভিন্নভাবে হুমকিও দিচ্ছে।
লাটিম মার্কার প্রার্থী মু. শাহরিয়ার সাচিব (রাজিব) এর স্ত্রী মৌসুমী কবির মৌ বলেন, টিফিন বক্সের প্রার্থী মাঠে নেই। সে ভোটারদের টাকার প্রলোভন দিয়ে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসছে। বাধা দেওয়ায় আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করছে। আমাদের লাইনেই দাঁড়াতে দিচ্ছে না। বলছে, বের করে দেবে।
লাটিম মার্কার আরেক সমর্থক বলেন, সবাই জানে শেখ সাঈদ আহমেদ মান্না একাধিক মার্ডার ও অস্ত্র মামলার আসামি।
এপিবিএন কর্মকর্তা দুলাল আহমেদ বলেন, এখানে ঝামেলা হচ্ছে এমন খবর পেয়ে আমরা এসেছি। দুই কাউন্সিলরের লোকজনকে কেন্দ্রের সামনে থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন ভোটকেন্দ্রের পরিস্থিতি স্বাভাবিক। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পেলেই আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিচ্ছি।











































