স্পোর্টস ডেস্ক।।
বাবা হোর্হে মেসিকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন লিওনেল মেসি। বাবার সঙ্গে নিজের দীর্ঘ পথচলা, ফুটবল ক্যারিয়ারে তার অবদান এবং শেষ বিশ্বকাপের সময়কার স্মৃতি তুলে ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন এক বার্তা দিয়েছেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি।
বাবাকে উদ্দেশ করে তিনি লিখেছেন, ‘কেন আকেটু অপেক্ষা করলে না? আমরা একসঙ্গে শেষটা করতে পারতাম।’
হোর্হে মেসির স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগ সামলাতে পারেননি লিওনেল মেসি। বাবার সঙ্গে প্রতিদিন কথা বলতেন তিনি। বিভিন্ন ব্যস্ততার মধ্যেও সুযোগ পেলেই দেখা করতেন। তাই বাবার অনুপস্থিতি কীভাবে সামলাবেন, সেটি এখনো বুঝে উঠতে পারছেন না রেকর্ড আটবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী মহাতারকা।
মেসি লিখেছেন, ‘বাবা, তুমি চলে গেছ—এটা এখনো আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। আসলে আমি বিষয়টি মেনে নিতে পারছি না, কিংবা সত্যি বলতে মেনে নিতে চাইও না। এটা ভাবতেই খুব কষ্ট হচ্ছে যে, তোমাকে আর কখনো দেখতে পারব না, তোমার সঙ্গে আর কথা বলতে পারব না। ’
অনেক দিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন হোর্হে মেসি। তার চলে যাওয়াটা হয়তো কষ্টের হলেও মেনে নেওয়ার চেষ্টা করছেন লিওনেল মেসি। তবে তার আক্ষেপ, বাবা আরো কিছুদিন বেঁচে থাকলে তারা একসঙ্গে আরো অনেক কিছু উপভোগ করতে পারতেন।
মেসি জানিয়েছেন, বিশ্বকাপ শুরুর কয়েক দিন আগে তার বাবার শারীরিক অবস্থার সবচেয়ে বেশি অবনতি হয়েছিল। সেটি ছিল এমন একটি বিশ্বকাপ, যেখানে প্রথমবারের মতো হোর্হে মেসি কোনো টুর্নামেন্টে সরাসরি উপস্থিত থাকতে পারেননি।
এ ব্যাপারে মেসি লিখেছেন, ‘তুমি আমাকে শেষ বিশ্বকাপ খেলতে কতবার বলেছিলে। অথচ বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার কয়েক দিন আগে তোমার শারীরিক অবস্থা সবচেয়ে খারাপ হয়ে গেল। প্রথমবার তুমি কোনো টুর্নামেন্টে থাকতে পারলে না। মা আমাকে বলেছিল, তুমি ভালো হয়ে যাবে, ঠিক হয়ে যাবে এবং আমাদের সঙ্গে ভ্রমণ করতে পারবে। আমিও তোমাকে বলতাম, আমরা ফাইনালে উঠব, তখন আমাদের ম্যাচ দেখতে আসবে।’
বিশ্বকাপ চলাকালে প্রতিটি ম্যাচ শেষে বাবার বার্তার অপেক্ষায় থাকতেন মেসি। কিন্তু একসময় বুঝতে পারেন, পরিস্থিতি সত্যিই গুরুতর, ‘প্রতিটি ম্যাচ শেষে আমি অপেক্ষা করতাম, তোমার বার্তাটা খুব মিস করতাম। তখন বুঝতে পারি, পরিস্থিতি সত্যিই খারাপ। তারপরও যত দূর সম্ভব, এগিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতাম যেন তোমাকে সময় দিতে পারি এবং তুমি অন্তত একটি ম্যাচ দেখতে পারো।’
শেষ পর্যন্ত ফাইনালে উঠেছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু বাবার আর স্টেডিয়ামে বসে মেসির খেলা দেখা হয়নি। মেসির ইচ্ছা ছিল বিশ্বকাপ জিতে সেই ট্রফি বাবার হাতে তুলে দেবেন। কিন্তু ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে যায় আর্জেন্টিনা।
‘আমরা ফাইনালে উঠলাম, কিন্তু তুমি সেখানে থাকতে পারলে না। আমি চেয়েছিলাম ফাইনালটা জিতে ট্রফিটা তোমার কাছে নিয়ে যেতে এবং তোমাকে নতুন একটি ট্রফি দেখাতে। পারিনি। আমার পা আর চলছিল না। এবার নিজের শারীরিক অবস্থার বিরুদ্ধে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু পারিনি। কোনোভাবেই নিজেকে ফিট মনে হচ্ছিল না’—বাবাকে উদ্দেশ্য করে লিখেঝেন মেসি।
বিশ্বকাপ জিততে না পারলেও সেই আসরের প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করেছিলেন মেসি। বাবার সঙ্গে বিশ্বকাপ নিয়ে কথা বলার সুযোগ আর না পাওয়ার আক্ষেপও তার লেখায় স্পষ্ট, ‘আমি যখন ফিরে এলাম, তুমি ভেবেছিলে আমরা টাইব্রেকারে ফাইনাল হেরেছি। এরপর যা কিছু ঘটেছিল, সেসব নিয়ে আমাদের আর কথা বলা হয়নি। তুমি কিছুই উপভোগ করতে পারোনি। আমরা চ্যাম্পিয়ন হতে পারিনি। কিন্তু তুমি জানো না, আমরা প্রতিটি ম্যাচ কতটা উপভোগ করেছি।’
বাবার সঙ্গে যে বিষয়টি আর কখনো আলোচনা করা সম্ভব হবে না, সেটিই মেসির কাছে সবচেয়ে বড় কষ্টের।
ফুটবল ক্যারিয়ারে মেসির পথচলার শুরু থেকেই পাশে ছিলেন তার বাবা। ছোটবেলায় মেসিকে অনুশীলনে নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে ম্যাচে গ্যালারিতে বসে তাঁর খেলা দেখা—সবকিছুতেই ছিলেন হোর্হে মেসি।
মেসির ভাষায়, ‘ছোটবেলা থেকেই এমন ছিল। কাজ থেকে ফিরেই তুমি আমাকে অনুশীলনে নিয়ে যেতে। অনেক সময় মা আমাকে নিয়ে যেত, কারণ তুমি তখন কাজে থাকতে। তবে কোনো ম্যাচেই তুমি অনুপস্থিত থাকতে না।’
বাবা শুধু বাবা ছিলেন না, ছিলেন বন্ধুও এবং প্রতিনিধি। মেসির ভাষায়, জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে তিনি নিজের দায়িত্বটা ঠিকভাবে পালন করেছেন, ‘তুমি ছিলে বাবা, বন্ধু এবং আমার প্রতিনিধি। প্রতিটি মুহূর্তে তোমাকে যে মানুষটি হতে হতো, তুমি ঠিক সেটিই ছিলে। কোনো কিছুতেই তুমি ভুল করোনি। আমাদের মধ্যে কিছু ব্যাপারে ঝগড়া হলেও শেষ পর্যন্ত দেখা যেত তুমিই ঠিক ছিলে। শেষ পর্যন্ত সবকিছু তোমার কথামতোই হতো।’
মেসি আরো লিখেছেন, ‘তোমাকে আমি অনেক মিস করব। কিন্তু তুমি সব সময় আমার সঙ্গে থাকবে। বিশেষ করে আমার সন্তানদের শিক্ষাদানে তুমি সব সময় উপস্থিত থাকবে। কারণ তোমরা যেভাবে আমাকে শিক্ষা দিয়েছ, আমিও আমার সন্তানদের সেভাবেই শেখাব ও বড় করব।’
সবশেষে বাবার প্রতি ভালোবাসা জানিয়ে মেসি লিখেছেন, ‘শান্তিতে ঘুমাও। ওপর থেকে আমাদের দেখাশোনা করো, যেমনটা এখানে থাকতে করতে। সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ। বাবা, তোমাকে ভালোবাসি।’











































