Home আলোচিত সংবাদ মনমোহনের বিরুদ্ধে মামলা বাতিলের পর মোদিকে কড়া বার্তা সোনিয়ার

মনমোহনের বিরুদ্ধে মামলা বাতিলের পর মোদিকে কড়া বার্তা সোনিয়ার

0

আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।

প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহকে কয়লা খনি বরাদ্দ মামলায় স্বস্তি দিয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার মামলায় সর্বোচ্চ আদালত নিম্ন আদালতের সেই নির্দেশ বাতিল করেছে, যার ভিত্তিতে মনমোহন সিংহকে মামলায় তলব করা হয়েছিল। আদালতের এ রায়ের পরই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তার সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন কংগ্রেস সংসদীয় দলের সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী।

তার দাবি, মনমোহন সিংহের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে যে অভিযোগ ও রাজনৈতিক প্রচার চলেছে, সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তার অবসান ঘটেছে।

সোনিয়া গান্ধী বলেছেন, ২০২৬ সালের ২৯ জুলাই ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অথচ উপেক্ষিত দিন হিসেবে থেকে যাবে। কারণ ওই দিনই সুপ্রিম কোর্ট কয়লা খনি বরাদ্দ মামলায় মনমোহন সিংহের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার মামলা বন্ধের প্রতিবেদন গ্রহণ করেছে। নিম্ন আদালত যে সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে মামলায় তলব করেছিল, সর্বোচ্চ আদালত সেটিও বাতিল করে দিয়েছে।

সোনিয়ার বক্তব্য, মনমোহন সিংহকে ঘিরে যে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তার পেছনে ছিল তাকে কলঙ্কিত করার একটি দীর্ঘ প্রচেষ্টা। তার দাবি, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সততা, জবাবদিহি ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আদালতের রায় সেই অভিযোগগুলোর ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

মনমোহন সিংহের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়েও সরব হয়েছেন সনিয়া। তার মতে, ইতিহাস তাকে একজন শান্ত, নম্র কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই মনে রাখবে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার ১০ বছরের সময়ে দেশের অর্থনীতি, সামাজিক সুরক্ষা ও সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

সোনিয়া গান্ধীর বক্তব্যে সরাসরি নিশানায় ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। মনমোহন সিংহকে নিয়ে মোদির পুরোনো মন্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে অতীতে যে ধরনের কটূক্তি করা হয়েছিল, তা ভারতীয় সংসদীয় রাজনীতির অন্যতম নিম্নমুখী অধ্যায়। বিশেষ করে ২০১৭ সালে রাজ্যসভায় মোদি মনমোহন সিংহকে লক্ষ্য করে যে মন্তব্য করেছিলেন, তারও সমালোচনা করেছেন সনিয়া।

এখানেই থামেননি কংগ্রেস নেত্রী। মোদি সরকারের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক চাপ তৈরির কাজে ব্যবহার করার অভিযোগও তুলেছেন তিনি। তার দাবি, বিরোধী দলের নেতাদের বিরুদ্ধে তদন্তকারী সংস্থার তৎপরতা চালানো হচ্ছে রাজনৈতিক চাপ তৈরির উদ্দেশ্যে। আবার রাজনৈতিক অবস্থান বদলে ক্ষমতাসীন দলে যোগ দিলে তাদের বিরুদ্ধে চলা অভিযোগের চিত্রও বদলে যাচ্ছে।

সনিয়ার অভিযোগ, বিরোধী শিবিরে থাকলে যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হয়, ক্ষমতাসীন দলে যোগ দেওয়ার পর তাদেরই অনেকে হঠাৎ স্বচ্ছ হয়ে যান। এই পরিস্থিতিকে তিনি রাজনৈতিক সুবিধাবাদ হিসেবে দেখিয়েছেন।

মনমোহন সিংহের প্রধানমন্ত্রীত্বের সময়কার অর্থনৈতিক সাফল্যের কথাও তুলে ধরেছেন সনিয়া। তার দাবি, সেই সময়ে দেশের অর্থনীতিতে দ্রুত প্রবৃদ্ধি ঘটেছিল, ব্যক্তিগত বিনিয়োগ ও ভোগব্যয় বেড়েছিল এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠে এসেছিলেন। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার সময়ও ভারত তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।

শুধু অর্থনীতি নয়, শিক্ষার অধিকার, বনবাসী ও আদিবাসীদের অধিকার, খাদ্যের অধিকার, তথ্য জানার অধিকার এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থানের মতো একাধিক সামাজিক আইন ও কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেছেন সনিয়া। তার মতে, মনমোহনের সরকারের সময়ে সাধারণ মানুষের অধিকারকে কেন্দ্র করে যে নীতিগুলো তৈরি হয়েছিল, সেগুলো দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে শক্তিশালী করেছিল।

মনমোহন সিংহের আমলে সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের স্বাধীনতা নিয়েও সনিয়া বক্তব্য দিয়েছেন। তার দাবি, তখন সাধারণ মানুষ ও ছাত্রছাত্রীরা সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সুযোগ পেতেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রীকেও প্রকাশ্যে প্রশ্ন করার পরিবেশ ছিল। বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সেই সময়ের তুলনা টেনে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে পরোক্ষভাবে আক্রমণ শানিয়েছেন।

কয়লা খনি বরাদ্দ মামলাটির সূত্র অবশ্য বহু পুরোনো। কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা তদন্তের পর মামলা বন্ধের প্রতিবেদন দিয়েছিল। কিন্তু বিশেষ আদালত সেই প্রতিবেদন গ্রহণ না করে ২০১৫ সালে মনমোহন সিংহসহ কয়েকজনকে মামলায় তলব করেছিল। সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যান মনমোহন সিংহ। পরে সর্বোচ্চ আদালত সেই সমন স্থগিত করে দেয়। এবার দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর মামলাটিরই অবসান ঘটল।

মনমোহন সিংহ ২০২৪ সালের ২৭ ডিসেম্বর মারা যান। তার মৃত্যুর পরও মামলাটির বিচারিক নিষ্পত্তি নিয়ে আগ্রহ ছিল। শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের ২৯ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দিল, বিশেষ আদালতের পক্ষে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার মামলা বন্ধের প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে মনমোহন সিংহের বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করার যথেষ্ট কারণ ছিল না।

সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের পর কংগ্রেসের রাজনৈতিক আক্রমণ যে আরও তীব্র হবে, সনিয়া গান্ধীর বক্তব্যে তারই ইঙ্গিত মিলেছে। একদিকে মনমোহন সিংহের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে সামনে আনা, অন্যদিকে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে তদন্তকারী সংস্থার অপব্যবহারের অভিযোগ তোলা—সব মিলিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে পুরোনো দুই রাজনৈতিক শিবিরের সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে।

সোনিয়ার বক্তব্যে স্পষ্ট, মনমোহন সিংহকে ঘিরে এত বছর ধরে যে রাজনৈতিক বিতর্ক চলে এসেছে, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর কংগ্রেস সেই অধ্যায়টি নতুন করে সামনে আনতে চাইছে। তার কথায়, আদালতের রায়ে মনমোহন সিংহের সততা ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। আর সেই সুযোগেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সরাসরি নিশানা করেছেন কংগ্রেসের এই প্রবীণ নেত্রী।