রাজধানীর বঙ্গবাজার পোশাকের অন্যতম পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়কেন্দ্র। এখান থেকে পোশাক সরবরাহ করা হয় বিভিন্ন জেলায়। আবার প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশের ক্রেতারাও এখান থেকে পোশাক কিনে নিয়ে যান নিজ দেশের বাজারে বিক্রির জন্য। এই ব্যবসায়কেন্দ্র গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে গড়ে ওঠে। সেই বঙ্গবাজারে আবারো ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে গত মঙ্গলবার। এই মার্কেটে এর আগেও কমপে তিনবার বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এর মধ্যে ১৯৯৫ সালে একবার আগুনে পুরো মার্কেটটি পুড়ে যায়। এ ছাড়া ২০১৮ সালে একবার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড হয়।
ব্যবসায়ীদের প্রাথমিক হিসাবে, এবারের আগুনে পাঁচ হাজারের মতো দোকান পুড়েছে। তির পরিমাণ হাজার কোটি টাকার বেশি। আগুনে প্রাণহানি হয়নি বটে তবে আগুন নেভাতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের আট কর্মীসহ অন্তত ১১ জন আহত হয়েছেন।
বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সটি কাঠ ও টিন দিয়ে তৈরি; তিনতলা। এ কমপ্লেক্সে চারটি বিপণিবিতান রয়েছে, বঙ্গবাজার, গুলিস্তান, মহানগরী ও আদর্শ মার্কেট। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের হিসাবে, বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সে দুই হাজার ৯৬১টি দোকান রয়েছে। বাস্তবে দোকানের সংখ্যা ছিল প্রায় দ্বিগুণ। আবার করপোরেশনের কাগজপত্রে বিপণিবিতানটি দোতলা। কিন্তু এর কিছু অংশ তিনতলা। এ বিপণিবিতানের মালিক সমিতির নেতারা যে যার সুবিধামতো দোকান বাড়িয়ে নেন।
বিপণিবিতানগুলোর ভেতরটা ঘিঞ্জি। সরু গলি ও ছোট ছোট দোকানে কেনাবেচা হতো। এমন পরিস্থিতিতে বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স চার বছর আগে ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে ঘোষণা করে ফায়ার সার্ভিস। তখন সংস্থাটি থেকে বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সে বেশ কিছু ব্যানারও টাঙানো হয়েছিল। আর জায়গাটির মালিক ঢাকা দণি সিটি করপোরেশন।
প্রশ্ন হলো, সবাই জানতেন এ কমপ্লেক্স বড় ধরনের অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে। কিন্তু এরপর সরকারের কোনো সংস্থা কিংবা বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের দোকানমালিকরা অগ্নিঝুঁকি প্রতিরোধে কোনো ব্যবস্থা নেননি কেন? মঙ্গলবারের আগুনে সব দোকান পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার পর সরকারের কোনো সংস্থাই এখন আর দায় নিতে চাইছে না।
গণমাধ্যমের খবর বলছে, বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স নিয়ন্ত্রণ করতেন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কিছু ব্যবসায়ী। সব দলের নেতারা মিলেমিশে এর নিয়ন্ত্রণ করতেন। মূলত দোকান মালিক সমিতির কিছু নেতার ব্যক্তিগত স্বার্থ ও সুবিধা নেয়ার মানসিকতায় হাজার পরিবার আজ পথে বসল। তবে এর জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনও দায় এড়াতে পারে না। বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স ঝুঁঁকিপূর্ণ, এটি বিবেচনায় নিয়ে সেখানে আধুনিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা কেন বাস্তবায়ন করা হলো না, এ প্রশ্নের কোনো জবাব নেই। ঢাকা দণি সিটি করপোরেশন কী কারণে এতদিন আইনি ও রাজনৈতিকভাবে বিষয়টি মোকাবেলা করেনি তা-ও অস্পষ্ট। তবে এটি সত্যি, যারা নতুন ভবন নির্মাণ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়ান, তারা সবাই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত। কাজটি তারা করেছিলেন শুধুই ব্যক্তিগত স্বার্থে।
ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও বঙ্গবাজারে অবৈধভাবে ব্যবসায় করতে যাওয়ার পরিণতি কী হতে পারে আমরা এখন দেখছি। বহু মানুষ নিঃস্ব হলো, হাজার কোটি টাকার সম্পদ পুড়ে গেল। অন্তত ১৫ হাজার মানুষ কাজ হারাল। তাদের পরিবারসহ জীবিকা অনিশ্চয়তায় পড়ে গেল।
বঙ্গবাজারে আগুনের কারণ ও তি সম্পর্কে জানতে তিনটি কমিটি গঠিত হয়েছে। এসব কমিটি তদন্ত করে সুপারিশ ও প্রতিবেদন জমা দেবে কিন্তু তা বাস্তবায়ন হবে কি-না সে বিষয়ে সন্দেহ থেকে যায়। অতীতের তদন্ত কমিটির সুপারিশ ও প্রতিবেদনের যে দশা হয়েছে সে জন্যই এই সংশয়।
আমরা মনে করি, একের পর এক অগ্নিকাণ্ডে জীবন ও সম্পদহানির দায় কার, সেটি খুঁজে বের করতে হবে, তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তবে সবার আগে দরকার আগুনে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা ও পুনর্বাসনে দ্রুত উদ্যোগ নেয়া।










































