খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ খননের স্থান থেকে বের হওয়া গ্যাসে জ্বলছে আগুন। মঙ্গলবার ভোরে শুরু হওয়া এ আগুন বুধবারও জ্বলতে দেখা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সময়ের সঙ্গে আগুনের তীব্রতা বাড়ছে।
বাপেক্সের বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক ধারণা, ভূগর্ভ থেকে উচ্চচাপে গ্যাস নির্গমনের কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে গ্যাসের সঠিক উপাদান ও উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হতে নমুনা বিশ্লেষণ প্রয়োজন। এদিকে ঝুঁকি এড়াতে ঘটনাস্থলের ২০০ মিটারের মধ্যে মানুষের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে জেলা প্রশাসন। আশপাশের বাড়িঘরের বাসিন্দাদেরও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল্লাহ প্রায় ১৫ দিন আগে ওই স্থানে নলকূপ খননের কাজ শুরু করেন। মঙ্গলবার ভোরে সেখান থেকে হঠাৎ গ্যাস বের হতে শুরু করে। পরে বৈদ্যুতিক তার থেকে আগুনের সূত্রপাত হয় বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। এরপর থেকে গ্যাসের নির্গমন অব্যাহত রয়েছে এবং আগুন জ্বলছে।
মঙ্গলবার রাতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বাপেক্সের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল। বুধবার দুপুরেও বাপেক্সের ব্যবস্থাপক ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের দলনেতা এস এম নাফিকুন আরহামের নেতৃত্বে দলটি আবার ঘটনাস্থলে যায়। এ সময় আশপাশের পাহাড়ি এলাকা পরিদর্শনের পাশাপাশি মাটি, পাথর ও পানির নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
এস এম নাফিকুন আরহাম বলেন, ঘটনাস্থল থেকে পাথর ও পানির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্যাসের নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, গ্যাস নির্গমন শুধু নলকূপ খননের স্থানেই সীমাবদ্ধ নেই; আশপাশের বিভিন্ন স্থান দিয়েও গ্যাস বের হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রায় এক হাজার ফুট গভীরতা পর্যন্ত বোরিং করা হয়েছিল। তবে খননের সময় এভাবে গ্যাসের উপস্থিতি বোঝা যায়নি। মঙ্গলবার ভোর থেকে গ্যাসের অস্তিত্ব অনুভূত হয় এবং পরে তা আগুনের শিখা আকারে জ্বলতে শুরু করে। ভূগর্ভস্থ গ্যাসের আধার থেকে এ গ্যাস বের হচ্ছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
গ্যাসের উপাদান সম্পর্কে বাপেক্সের এই কর্মকর্তা বলেন, প্রাকৃতিক গ্যাসে সাধারণত মিথেনের পাশাপাশি ইথেন, প্রোপেন, বিউটেন ও পেন্টেনের মতো হাইড্রোকার্বন থাকতে পারে। তবে এ গ্যাসের সঠিক উপাদান পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। আগুনের রং ও ধোঁয়ার ধরন দেখে উচ্চতর হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতি থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এটি কোনো নতুন গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান কি না, সে বিষয়ে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।
গ্যাসের আগুন নেভানোর বিষয়ে এস এম নাফিকুন আরহাম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে গ্যাস জ্বলতে দেওয়াই যুক্তিযুক্ত হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, গ্যাস নির্গমন অব্যাহত থাকলে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ‘রিলিফ ওয়েল’ খনন করে ভূগর্ভে সিমেন্ট পাম্প করার মাধ্যমে গ্যাসের প্রবাহ বিচ্ছিন্ন করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও সম্ভাব্য বিকল্পগুলো পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
বাপেক্সের এই কর্মকর্তা জানান, তাঁরা সাত দিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কথা বলেছেন। এরপর পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা সহজ হবে।
আগুনের ঘটনার পর মেরিন ড্রাইভের আশপাশের এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এতে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ গ্রাহক বা পরিবার বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে বিকল্প লাইন নির্মাণের কাজ করছে কক্সবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি।
সমিতির উখিয়া জোনাল অফিসের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) প্রকৌশলী কাইজার নুর বলেন, মঙ্গলবার সকাল ৬টা ১৪ মিনিট থেকে সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাপেক্সের প্রতিনিধিদলের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিকল্প ব্যবস্থায় প্রায় ২০০ মিটার বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। কাজ শেষ হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করা সম্ভব হবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা আজিজুল হক বলেন, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর থেকে তাঁরা ভোগান্তিতে রয়েছেন। এখনো বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়ায় দৈনন্দিন কাজকর্মে সমস্যা হচ্ছে। দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ চালুর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ চান তাঁরা।
আগুন দেখতে মঙ্গলবারের মতো বুধবারও সকাল থেকে ঘটনাস্থলে উৎসুক মানুষের ভিড় দেখা যায়। সড়কে ব্যারিকেড দেওয়া হলেও অনেকে তা অমান্য করে ঘটনাস্থলের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সিকদার বাজার এলাকার বাসিন্দা সিরাজুল হক বলেন, আগের দিনের তুলনায় বুধবার আগুনের তীব্রতা বেড়েছে বলে তাঁদের মনে হচ্ছে। সম্ভাব্য বিপদের আশঙ্কায় স্থানীয় বাসিন্দারা আতঙ্কে রয়েছেন।
আরেক বাসিন্দা মো. আব্দুল্লাহ জানান, তাঁরা পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছেন। তবে বাড়িতে থাকা মালামাল সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাঁর ভাষ্য, আগের দিনের তুলনায় আগুনের তীব্রতা বেড়েছে এবং বিভিন্ন স্থান দিয়ে গ্যাস বের হতে দেখা যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে তাঁরা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এমন ঘটনা দেখতে প্রতিদিনই অনেক মানুষ ঘটনাস্থলে ভিড় করছেন। কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ এলাকায় এ ধরনের ঘটনা আগে দেখেছেন বলে মনে পড়ে না তাঁর। তবে কৌতূহলবশত ঘটনাস্থলে ভিড় না করে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
ঝুঁকি এড়াতে ঘটনাস্থলের ২০০ মিটারের মধ্যে মানুষের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে জেলা প্রশাসন। আশপাশের সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং পাশের বাড়িঘরের বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, ঘটনাস্থল ঘিরে নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যাতে কেউ ২০০ মিটারের মধ্যে প্রবেশ করতে না পারেন। আগুন দেখতে অতিউৎসাহী হয়ে কেউ যেন ঘটনাস্থলে ভিড় না করেন, সে জন্য সবার প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।
জেলা প্রশাসক বলেন, আগুন কখন স্বাভাবিকভাবে নিভে আসে, তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরবর্তী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এদিকে গ্যাসের নির্গমন অব্যাহত থাকায় ঘটনাস্থলের নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরুদ্ধার এবং গ্যাসের উৎস ও প্রকৃতি নির্ধারণ-এই তিন বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।











































