আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
স্পেনে দুই দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন নিহত হয়েছেন। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় আন্দালুসিয়া অঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী মাদ্রিদকে যুক্ত করা রেলপথে এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে এটি দ্বিতীয় প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানিয়েছে। আজ বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ৯টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে বার্তাসংস্থা রয়টার্স।
কাস্তিয়া-লা মাঞ্চা অঞ্চলের টেলিভিশনে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা গেছে, লাইনচ্যুত একটি ট্রেনের কয়েকটি বগি উঁচু রেলপথের ওপর ঝুলে রয়েছে। রেললাইনের নিচের ঢালে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে দুমড়েমুচড়ে যাওয়া ধাতব অংশ, ভাঙা প্যানেল ও ট্রেনের ধ্বংসাবশেষ।
দুর্ঘটনার সময় ট্রেনের পেছনের বগিতে কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে ভ্রমণ করছিলেন মিগুয়েল নামের এক যাত্রী। তিনি কোপে রেডিওকে বলেন, দুর্ঘটনার মুহূর্তে তারা প্রচণ্ড শব্দ শুনতে পান।
মিগুয়েল বলেন, ‘আমরা প্রচণ্ড গর্জনের মতো শব্দ শুনেছিলাম। প্রায় ১০ সেকেন্ড ধরে খুব জোরে ধাক্কার শব্দ হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, ট্রেনটি লাইনচ্যুত হতে যাচ্ছে। ডান পাশের জানালা দিয়ে আমরা একটি বিধ্বস্ত ট্রেন দেখতে পাই।’
দুর্ঘটনা সম্পর্কে অবহিত এক ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, স্পেনের রেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ইরিওর একটি দ্রুতগতির ট্রেন সংকেতসংক্রান্ত ত্রুটির কারণে তোলেদো এলাকার কাছে থেমে ছিল। রেল অবকাঠামো পরিচালনাকারী সংস্থা আদিফের নির্দেশে ট্রেনটি থামানো হয়েছিল। এ সময় পেছন থেকে আরেকটি দ্রুতগতির ট্রেন সেটিকে ধাক্কা দেয়।
ওই ব্যক্তি জানান, রেনফে পরিচালিত একটি ট্রেন উচ্চগতিতে এসে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনটিকে ধাক্কা দিলে উভয় ট্রেনের কয়েকটি বগি লাইনচ্যুত হয়। এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্য চেয়ে পাঠানো অনুরোধের তাৎক্ষণিক কোনো জবাব দেয়নি ইরিও বা রেনফে।
কাস্তিয়া-লা মাঞ্চা আঞ্চলিক সরকার জানিয়েছে, দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা প্রথমে ১০ জন বলে জানানো হলেও পরে তা বেড়ে ৩০ জনে দাঁড়িয়েছে। এর আগে কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছিল, নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
কাছের শহর লস ইয়েবেনেসের মেয়র হেসুস পেরেজ মার্তিন বলেন, পরিস্থিতি ভয়াবহ এবং এটি একটি বড় ধরনের বিপর্যয়। তিনি আরটিভিইকে বলেন, ‘অঙ্গহানি ও অত্যন্ত গুরুতর আহত হওয়ার খবর আমাকে জানানো হচ্ছে।’
স্পেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোনিকা গার্সিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মানুষকে রক্তদানে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
ইরিওর ট্রেনে থাকা এদুয়ার্দা নামের এক যাত্রী কাদেনা সের রেডিওকে বলেন, তিনি প্রচণ্ড ধাক্কা অনুভব করেছিলেন। এতে তিনি সামনের দিকে ছিটকে পড়েন। প্রথমে তার মনে হয়েছিল, ট্রেনটি জরুরি ভিত্তিতে থেমে গেছে।
আহত ব্যক্তিদের দেখতে পাওয়ার পর এবং ট্রেন থেকে নেমে যাওয়ার নির্দেশ পাওয়ার পরই তিনি দুর্ঘটনার ভয়াবহতা বুঝতে পারেন। পরে তিনি একটি ঢাল বেয়ে নিচে নেমে নিরাপদ স্থানে পৌঁছান। সেখানে তিনি ট্রেনের একটি অংশ ঢালের নিচের দিকে ঝুলে থাকতে এবং একটি বগিতে আগুন জ্বলতে দেখেন।
এদুয়ার্দা জানান, প্রায় ২০ মিনিটের মধ্যে হেলিকপ্টার, পুলিশ ও অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তিনি বলেন, ‘আমি মৃত মানুষ দেখেছি।’
কাস্তিয়া-লা মাঞ্চা অঞ্চলের মুখপাত্র এস্তের পাদিয়া জানিয়েছেন, ইরিওর ট্রেনে ১৪৭ জন এবং রেনফের ট্রেনে ৩৯৭ জন যাত্রী ছিলেন।
এর মাত্র নয় মাস আগে, একই রেলপথে একই দুই প্রতিষ্ঠানের পরিচালিত দ্রুতগতির ট্রেনের মধ্যে আরেকটি দুর্ঘটনায় ৪৬ জন নিহত হয়েছিলেন। ওই দুর্ঘটনা ঘটেছিল জানুয়ারিতে, কর্দোবা প্রদেশের আদামুজের কাছে। সে সময় একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা আরেকটি ট্রেনের সঙ্গে ধাক্কা খায়।
সেই দুর্ঘটনার পর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রেলপথের রক্ষণাবেক্ষণে বিনিয়োগের পরিমাণ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়।
কাস্তিয়া-লা মাঞ্চা অঞ্চলের একজন মুখপাত্র জানান, বুধবার সকাল ৯টার কিছু পর রেনফে ও ইরিওর ট্রেন দুটির মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। এতে ইরিওর দুটি বগি লাইনচ্যুত হয়। দুর্ঘটনার কারণ তখনও স্পষ্ট হয়নি।
রেনফে জানিয়েছে, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারের সদস্যদের জন্য তারা একটি বিশেষ যোগাযোগব্যবস্থা চালু করেছে এবং শোক প্রকাশ করেছে। ইরিও জানিয়েছে, তারা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার কার্যক্রম শুরু করেছে।
আগামী ২৯ নভেম্বর স্পেনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। দুর্ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত দিনের কর্মসূচি বাতিল করা হয়। বিরোধী দল পিপলস পার্টিও তাদের সব নির্বাচনী প্রচার কর্মসূচি বাতিল করেছে বলে দলের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে সানচেজ লিখেছেন, ‘তোলেদোতে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় আমি মর্মাহত। সব ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের প্রতি আমার সহমর্মিতা, সংহতি ও সমর্থন রয়েছে।’
কাছের শহর উর্দার মেয়র ম্যানুয়েল গালান কাদেনা সেরকে জানান, যাত্রী ও আহত ব্যক্তিদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য জরুরি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে একটি ক্রীড়া হল প্রস্তুত রাখতে স্থানীয় প্রশাসনকে অনুরোধ করেছে উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো।
স্পেনের রেল নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে লাইনচ্যুতি ও সংঘর্ষসহ রেল দুর্ঘটনার সংখ্যা ২০১৬ সালে ৪৫টি থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ৫৭টি এবং গত বছর ৬৯টিতে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে রেললাইনের অবনতি ও ভাঙনের মতো সমস্যাও নথিভুক্ত হয়েছে। এসব সমস্যার সংখ্যা একপর্যায়ে যথাক্রমে ৪৯৪ ও ৬৬৭ ছিল, যা ২০২৪ সালে নথিভুক্ত ৭১৬টির চেয়ে কম।
রয়টার্সের স্পেনের প্রতিযোগিতা কর্তৃপক্ষের তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশটিতে প্রায় আড়াই কোটি যাত্রী দ্রুতগতির ট্রেনে ভ্রমণ করেছেন। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় ১৪ শতাংশ কম।
ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি থাকলেও প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দ্রুতগতির রেলপথের রক্ষণাবেক্ষণে স্পেনের বিনিয়োগ ইউরোপের বড় দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।
২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত স্পেন দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্কে বছরে গড়ে প্রায় ১৫০ কোটি ইউরো ব্যয় করেছে, যা ইউরোপের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি। তবে এই অর্থের সিংহভাগ ব্যয় হয়েছে নতুন অবকাঠামো নির্মাণে। রক্ষণাবেক্ষণ, নবায়ন ও উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র প্রায় ১৬ শতাংশ।
চলতি বছরের দুর্ঘটনাগুলোর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ট্রেন দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার সবচেয়ে কম থাকা দেশগুলোর মধ্যে ছিল স্পেন। ২০২৪ সালের সর্বশেষ উপলব্ধ ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি এক হাজার কিলোমিটার রেলপথে সেখানে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল এক বা তার কম।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের রেলওয়ে সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, স্পেনের ৯০ শতাংশের বেশি রেল নেটওয়ার্কে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সর্বোচ্চ স্তরের নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা রয়েছে। বেলজিয়াম ও সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে স্পেনের রেল নেটওয়ার্কেও ইউরোপজুড়ে ব্যবহৃত সংকেতব্যবস্থার আওতায় থাকা রেলপথের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য।











































