Home কলাম খাদ্য নিরাপত্তার জন্য চাই বহুমাত্রিক প্রয়াস

খাদ্য নিরাপত্তার জন্য চাই বহুমাত্রিক প্রয়াস

12

ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী

বাংলাদেশে করোনা মোকাবেলায় যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ায় দেশের সকল মানুষ এবং পাশাপাশি বিদেশেও দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভূয়সী প্রশংসিত হচ্ছেন। মার্কিন সাময়িকী ফোবার্সে কানাডীয় লেখক অভিভাহ ভিটেনবার্গ কক্স আটটি দেশের নারী নেতৃত্বের যে প্রশংসা করেন, তাতে যোগ্যতা গুণে দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায়, একজন বাঙালী হিসেবে এবং বাংলাদেশী নাগরিক হিসেবে অভিনন্দন জানাচ্ছি। প্রথম থেকেই অত্যন্ত বিচণক্ষতার সঙ্গে জননেত্রী কোভিড-১৯ মোকাবেলায় ধীর-স্থির চিত্তে, গভীর বিশ্বাসে একের পর এক সিদ্ধান্ত দিয়ে আসছেন। এ সিদ্ধান্তগুলো যাতে বাস্তবায়িত হয় সে জন্য তিনি সকল স্তরে তদারকির ব্যবস্থা রেখেছেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে চেনা শত্রু ছিল, ছিল পাকিস্তানী হায়েনার দল, আর তাদের পা-চাটা রাজাকার-আলবদর-আলশামস। কিন্তু বর্তমানে ভাইরাস আতঙ্ক কখন কাকে কিভাবে আক্রমণ করবে, তাতে সারা বিশ্বে মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত। কেবল মৃত্যুহানি নয় বরং লকডাউনের কারণে দারিদ্র্য সমগ্র বিশ্বে বেড়ে চলেছে। এ ধরনের জ্বালা আজ উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই অনুভূত হচ্ছে। বাংলাদেশে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ধাপে ধাপে বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়েছে। এ কর্মসূচীর মাধ্যমে যাতে কোন মানুষই অভুক্ত না থাকেন, সে জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়াস নেয়া হয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা পাঁচটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে থাকেÑ প্রাপ্যতা, অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা, ব্যবহার করার সুযোগ, স্থিতিশীলতা এবং বণ্টন ব্যবস্থায় সামঞ্জস্য। যাতে বোরো ধান সময়মতো কাটা যায় এবং মাড়াই করে কৃষকের গোলায় তোলা যায় সে জন্য সরকারের নির্দেশ ছিল। এক্ষেত্রে আচরণগত অর্থনীতির প্রায়োগিক কৌশলের বাস্তবায়ন দরকার। সেটি পালন করার ক্ষেত্রে কৃষকরা যাতে ধান কাটার লাগসই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে এবং নিজস্ব স্থানে কর্মহীন লোকবল ব্যবহার করতে পারে সে জন্য প্রয়াস নেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকায় ছাত্রলীগ, যুবলীগ এমনকি পুলিশ বাহিনীর সদস্যরাও অনেক ক্ষেত্রে ধান কাটায় সাহায্যের হাত প্রসারিত করেছেন। সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ৮ লাখ মেট্রিক টন ধান এবং ১০ লাখ টন চাল ক্রয়ের কথা বলেছেন কৃষিমন্ত্রী। এটি একটি সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত। তবে কৃষি ক্ষেত্রে অন্যান্য পচনশীল দ্রব্য শাক-সবজি এ অস্থির সময়ে যাতে প্রত্যন্ত গ্রামীণ অঞ্চল থেকে বিভিন্ন শহরাঞ্চলে যায় সে জন্যও সরবরাহজনিত ব্যবস্থাপনার মান সঠিক রাখতে হবে। কেননা সারাবিশ্বে সরবরাহজনিত ব্যবস্থাপনার সমস্যা দেখা দিয়েছে। হিসাব করা দরকার কোন্ স্থানে কোন্ পণ্যের কতটুকু চাহিদা আছে। ভুট্টা যাতে নষ্ট না হয়, গম, সয়াবিন, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, হলুদ নষ্ট না হয় সেদিকেও কৃষি মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি কৃষি ব্যাংক ও রাকাবকে কাজ করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ের এনজিওসমূহকেও এ কাজে যুক্ত হতে হবে। কৃষি ব্যাংক ও রাকাবকে তথাকথিত বাধাধরা নিয়মকানুন থেকে বেরিয়ে এসে কৃষকের বন্ধু হিসেবে কাজ করতে হবে। দেশের পণ্য বিপণন ও বাজারজাতকরণে এগিয়ে আসতে হবে। ধান উৎপাদন ও সংগ্রহে সরকার যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে তা প্রশংসনীয়। প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি জমিতে এবং খালি জায়গাতে চাষাবাদের নির্দেশ দিয়েছেন। তার এ নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা দরকার। অনেক আগেই বরেণ্য অর্থনৈতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ কোভিড-১৯ এ লকডাউন শুরুর পর পরই কৃষিকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা নিতে বলেছিলেন। তার সে পরামর্শ কৃষিমন্ত্রী গ্রহণ করেছেন বলেই প্রতীয়মান হয়। আউশ এবং আমনের ফলন এবং কাটা ও সংগ্রহ ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে সংগ্রহের ব্যবস্থাও করতে হবে। অভ্যন্তরীণ পুঁজি স্থানীয় পর্যায়েই ব্যবহৃত হতে হবে।

ধান ওঠার পরবর্তীতে জমির অবস্থা বুঝে যে ধরনের পণ্যাদি লাগানো যায় সে জন্য স্থানীয় কৃষি অধিদফতরকে কৃষকদের প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা ও পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করতে হবে। মহামারীর কারণে অনেক স্থানেই মৎস্য খামারিরা সমস্যায় পড়েছে। তাদের ক্ষেত্রেও সাহায্য-সহযোগিতার হাত মৎস্য অধিদফরত ও কৃষি ব্যাংককে গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় এনজিওসমূহকে কাজে লাগাতে হবে। বায়োফাক টেকনোলজি ব্যবহার করতে পারে। হ্যাচারির সঙ্গে বায়োফাকের চক্রাকার সংযুক্তি করা যেতে পারে। মুরগির ক্ষেত্রেও মিনি হ্যাচারি স্থাপন করে একদিনের বাচ্চা নিয়ে কর্মহীনরা লালন করতে পারে। সেখান থেকে দশটা মুরগি ও একটি মোরগের মাধ্যমে মডেল তৈরি করতে পারে যা হ্যাচিংয়ের জন্য উপযুক্ত। দুগ্ধ খামারিদের জন্যও পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। ঘরে ঘরে দুগ্ধ খামারিরা অবিক্রীত দুধ সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেবেন। অনেক জায়গায় উদ্বৃত্ত দুধকে বাজারজাতকরণ ও বিপণনের ব্যবস্থা করতে হবে। সমগ্র বাংলাদেশে পণ্য বাজারজাতকরণে ও বিপণনের জন্য জেলা-উপজেলায় লিঙ্কেজ করা যেতে পারে উৎপাদনকারীরা যাতে ন্যায্যমূল্য পায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এ সমস্ত কাজ করতে হলে অর্থায়ন লাগবে এবং উৎপাদিত দ্রব্য বিক্রির পর অর্থ পরেশোধ করবেÑ এ নিয়ম মেনে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাকাব এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক বাংকসমূহ কর্তৃক বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করতঃ উদ্যোগী হতে হবে। যারা পোশাক শিল্প খাতসহ নানা রফতানিমূলক কর্মসূচী থেকে বেকার হয়ে যাচ্ছেন, তাদের স্থানীয় পর্যায়ে সক্রিয়ভাবে কর্মসংস্থানের উদ্যোগ সংশ্লিষ্ট অধিদফর নিতে পারে। কৃষি ব্যাংক ও রাকাবের পাশাপাশি বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহকেও এনজিওর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রশিক্ষণ, ঋণ বিতরণ করতে হবে। কিন্তু এনজিওদের অধিকাংশই ঋণ দেয়ার দু’সপ্তাহ পরেই ঋণ আদায়ে ব্যস্ত হয়। এক্ষেত্রে এটি সম্ভব নয় বিধায় বিশেষায়িত ব্যাংক এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহকে কাজ করতে হবে।

প্রয়োজনে স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সততার সঙ্গে কাজ করে দেখাবেন যে, তারা এ যুুদ্ধে আর্তমানবতার সেবায় আছেন। বাংলাদেশ ব্যাংককে উদ্ভাবনিমূলক ব্যাংকিং ব্যবস্থা গ্রহণ করে দেশে দক্ষ মানব সম্পদকে কাজে লাগাতে ব্যাংকিং সেক্টরে বিশেষত নতুন ও কর্মহীন অথচ কর্মইচ্ছুকদের উদ্যোক্তা হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। একটি সমন্বিত এবং বহুমাত্রিক কর্মসূচীর বাস্তবায়ন করা দরকার। যেমন- চাল, ডাল, তরিতরকারি, মৎস্য, ফল, গম, ভুট্টা- জমি এবং স্থান ও সময় অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন, বিতরণ এবং স্থিতিশীল করতে হবে। সরকারের গৃহীত প্রকল্প ও কর্মসূচী বাস্তবায়ন হলে দেশে কোন দুর্ভিক্ষ হবে না। এ জন্য প্রত্যেকের আজ যুদ্ধকালীন প্রস্তুতিতে সামনে থেকে কাজ করতে হবে। কৃষকরা তাদের কাজে সরাসরি বিশেষ প্রণোদনা যাতে পায় সে জন্য প্রয়োজনে আইন পরিবর্তন করে সরাসরি কাজ করতে হবে। পোল্ট্রি শিল্প থেকে আরম্ভ করে মৎস্য, গবাদিপশু লালন পালন, এমনকি দুগ্ধ খামারি সর্বক্ষেত্রেই ডিসরাপটিভ ইনোভেশনের সঙ্গে কাজ করতে হবে। এখন ব্যবসা নয়- বরং প্রত্যেকের অন্ন সংস্থানে সবাইকে মানবিকতার সঙ্গে কাজ করে যার যার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক : ম্যাক্রো ও ফিন্যান্সিয়াল ইকোনমিস্ট ও প্রফেসর