Home আঞ্চলিক ভবদহের অভিশাপ: চার দশকে ২১ প্রকল্প ও হাজার কোটি টাকার শ্রাদ্ধ, তবু...

ভবদহের অভিশাপ: চার দশকে ২১ প্রকল্প ও হাজার কোটি টাকার শ্রাদ্ধ, তবু মিলেনি স্থায়ী সুফল

4

যশোর অফিস।।

বৃষ্টি নামলেই চারদিকে থইথই পানি। ঘরের উঠান, রান্নাঘর কিংবা গোয়ালঘর—সবই গ্রাস করে নেয় নিচু এলাকার আগ্রাসী জলাবদ্ধতা। কোথাও হাঁটু তো কোথাও কোমরসমান পানি, গবাদিপশু আর সন্তানদের নিয়ে মানবেতর জীবন কাটিয়ে মানুষের ঠাঁই হয় উঁচু পাকা সড়কে। যশোরের দুঃখখ্যাত ঐতিহ্যবাহী ভবদহ অঞ্চলের মানুষের এই দুর্বিষহ চিত্র চার দশকের পুরোনো। অভিযোগ উঠেছে, বিগত ৪০ বছরে ২১টি প্রকল্পে হাজার কোটি টাকারও বেশি সরকারি অর্থ পানির মতো খরচ করা হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি; মেলেনি কোনো স্থায়ী সুফল।

চলতি বর্ষায় অকার্যকর দেড়শ কোটি টাকার প্রকল্প:

যশোরের অভয়নগর, মণিরামপুর, কেশবপুর এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার ৫৪টি বিল নিয়ে গঠিত ভবদহ অববাহিকা। আগস্টের শুরুতেই ভারী বর্ষণে সেখানকার প্রায় অর্ধশত গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়ে পড়ে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে হরিহর, হরি-তেলিগাতি, আপার ভদ্রা, টেকা ও শ্রী নদীর ৮১.৫ কিলোমিটার পুনঃখনন কাজ শুরু হলেও তা বাস্তবে ভবদহবাসীদের ভোগান্তি কমানোর ক্ষেত্রে ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। স্লুইসগেটে বসানো পাওয়ার পাম্প ও কপাটগুলোর সঠিক কার্যকারিতা না থাকায় উপচে পড়া পানি সরছে না।

আমডাঙ্গা খালের ধীরগতি ও অপরিকল্পিত বাঁধ:

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নদী খননের সুবিধার্থে খর্ণিয়া ব্রিজের কাছে ভদ্রা নদীতে দেওয়া আড়বাঁধ এবং জমতে থাকা পলি যথাসময়ে অপসারণ না করায় ভাটিতে নদী ভরাট হয়ে পানি নিষ্কাশন পথ পুরোপুরি অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে ভবদহ এলাকার ২৫ শতাংশ পানি নিষ্কাশনের মূল পথ ‘আমডাঙ্গা খাল’ সংস্কারের কার্যাদেশ দুই বছর আগে দেওয়া সত্ত্বেও তা বাস্তবায়নে চরম ধীরগতি বজায় রয়েছে।

অভয়নগরের ডুমুরতলা গ্রামের শিক্ষক সমরেশ বৈরাগী কিংবা সুজাতপুরের বিথী রাণীদের মতো হাজার হাজার দুর্গত মানুষ এখন সাপের উপদ্রব আর জলাবদ্ধতার আতঙ্কে রাত কাটাচ্ছেন। টানা বৃষ্টি নামলেই এলাকাটি রূপ নেয় এক মানবিক বিপর্যয়ে।

সঠিক সমাধান না মেলার কারণ:

ভবদহ পানিনিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির নেতৃবৃন্দ এবং বিশেষজ্ঞরা ভবদহের এই করুণ দশার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন:

> অপরিকল্পিত পরিকল্পনা ও নদ-নদীর নাব্যসংকট: মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদীর তলদেশ পলি জমে ভরাট হয়ে ২০০-৩০০ ফুটের নদী সংকুচিত হয়ে কোথাও ১৫-২৫ ফুটে ঠেকেছে।

>টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) চালু না থাকা: ২০১৩ সালের পর কোনো বিলে প্রাকৃতিক জোয়ারাধার বা টিআরএম চালু না রাখায় নদ-নদীতে দ্রুত পলি জমা শুরু হয়।

>স্লুইসগেটের সীমাবদ্ধতা: প্রয়োজনের তুলনায় স্লুইসগেটগুলো ছোট ও অপরিকল্পিত।

>স্থানী জনমতের তোয়াক্কা না করা: দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য শুধু নদী খনন না করে জনমতের ভিত্তিতে টিআরএম ও নদী প্রবাহ স্বাভাবিক রাখার সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণে ব্যর্থতা।

যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী জানান, খর্ণিয়া সেতুর প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করে তিনটি স্লুইসগেট খুলে দেওয়া হয়েছে এবং অন্যান্য কাজও চলছে।

তবে ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন—প্রকল্পের নামে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার হরিলুট বা শ্রাদ্ধ হলেও, হাজার কোটি টাকা খরচের পর শেষ পর্যন্ত ভবদহের কপালে স্থায়ী মুক্তি জুটবে কবে?