Home Lead পানি আছে, তবু তৃষ্ণা মেটে না

পানি আছে, তবু তৃষ্ণা মেটে না

4


সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
চারদিকে শুধু পানি। সামনে নদী, পেছনে খাল। আশপাশে বিস্তীর্ণ চিংড়িঘের। বর্ষায় বৃষ্টির পানিতে টইটম্বুর হয়ে ওঠে পুকুর। অথচ সেই পানির জনপদেই এক কলসি সুপেয় পানির জন্য ছুটতে হয় মাইলের পর মাইল।
কখনো এক কিলোমিটার, কখনো দুই-তিন কিলোমিটার। কাঁখে কলসি, হাতে জার নিয়ে ভোরেই বাড়ি থেকে বের হন নারীরা। কোনো একটি পানির উৎসে ভিড় বেশি হলে অপেক্ষা করতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সেখানে পানি না মিললে আবার ছুটতে হয় অন্য উৎসের সন্ধানে।

খুলনার কয়রা উপজেলার উপকূলঘেঁষা বহু গ্রামের নারীদের কাছে এ দৃশ্য নতুন নয়। সংসারের রান্না, সন্তান ও পরিবারের দেখাশোনার পাশাপাশি নিরাপদ খাবার পানির ব্যবস্থা করাও তাদের প্রতিদিনের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উপজেলা সদরের গোবরা গ্রামের নার্গিস সুলতানার অভিজ্ঞতা যেন পুরো এলাকার চিত্র তুলে ধরে। তার ভাষায়, বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি থাকায় কিছুটা স্বস্তি মেলে। কিন্তু বৃষ্টি থামার কয়েক মাস পরই আবার শুরু হয় পানির জন্য হাহাকার।

পানি আছে, মিঠাপানি নেই:

কয়রার সংকটের মূল কারণ লবণাক্ততা। উপকূলীয় এ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার পানির উৎসে দিন দিন লবণাক্ততা বাড়ছে। অগভীর নলকূপের পানি অনেক জায়গাতেই পানযোগ্য নয়। কোথাও আবার গভীর নলকূপেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত মিঠাপানি।

ফলে পুকুর, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ট্যাংক এবং হাতে গোনা কিছু মিঠা পানির উৎসই মানুষের ভরসা।

সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কয়রার পানীয় পানির ৫৫ দশমিক ৩ শতাংশ উৎসে লবণাক্ততা রয়েছে। অর্থাৎ, পানীয় পানির অর্ধেকেরও বেশি উৎস কোনো না কোনো মাত্রায় লবণাক্ত।

এই বাস্তবতায় ‘পানি আছে কি না’Ñকয়রার মানুষের কাছে সেটি মূল প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, যে পানি আছে, তা পান করার উপযোগী কি না।

এক কলসি পানির জন্য কয়েক কিলোমিটার:

মহেশ্বরীপুর, মহারাজপুর, কয়রা সদর, বাগালী ও উত্তর বেদকাশীসহ সুন্দরবনসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই মিঠা পানির সংকট রয়েছে।

কোনো কোনো এলাকায় একটি মাত্র নলকূপে মিঠাপানি পাওয়া যায়। আশপাশের বহু পরিবার তখন সেই একটি উৎসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে পানি পেতে যেমন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়, তেমনি উৎসের সামনে দীর্ঘ অপেক্ষাও করতে হয়।

গবেষণাভিত্তিক পানি-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়রার কিছু এলাকার নারীদের ২ থেকে ৩ কিলোমিটার দূরের পুকুর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। এ সংগ্রামের বড় অংশটাই নারীদের।

এক কলসি পানি ঘরে পৌঁছানোর পর তাদের কাজ শেষ হয় না। সেই পানি দিয়ে রান্না, পান করা, শিশুদের ব্যবহারসহ সংসারের নানা প্রয়োজন মেটাতে হয়। অর্থাৎ নিরাপদ পানির সংকট শুধু স্বাস্থ্য বা পরিবেশের সমস্যা নয়; এটি নারীর সময়, শ্রম ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

বর্ষার পানি যেন কয়েক মাসের সঞ্চয়: কয়রার অনেক পরিবারের কাছে বর্ষার বৃষ্টি মানেই স্বস্তি। বাড়ির ছাদ থেকে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা হয় ট্যাংকে। কেউ কেউ পুকুরেও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করেন। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় বর্ষা শেষ হলে।

ছোট ধারণক্ষমতার ট্যাংকে পুরো শুষ্ক মৌসুমের পানি ধরে রাখা সম্ভব হয় না। আবার যেসব পরিবারের ট্যাংক নেই, তাদের জন্য বৃষ্টির পানি ধরে রাখার সুযোগ আরও সীমিত।

পানি নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর গবেষণাতেও উঠে এসেছে, বড় ধারণক্ষমতার বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে কয়রার মানুষের সারা বছরের পানির সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব। তবে সেখানেও রয়েছে খরচ, রক্ষণাবেক্ষণ ও পর্যাপ্ত বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীলতার মতো চ্যালেঞ্জ।

পুকুর আছে, কিন্তু নিরাপদ নয়: কয়রায় পুকুরভিত্তিক পানি সরবরাহের ব্যবস্থাও রয়েছে। কোথাও পুকুরের পানি ফিল্টার করে মানুষের ব্যবহারের উপযোগী করা হয়। কিন্তু সব পুকুর নিরাপদ নয়।

লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়া, দূষণ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক পুকুরের পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। কোথাও পুকুর স্যান্ড ফিল্টার স্থাপন করা হলেও পরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলো অকেজো হয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এখানেই সামনে আসে বড় প্রশ্নÑঅবকাঠামো তৈরি হলেই কি পানির সংকটের সমাধান হয়?

একটি ফিল্টার বসানো, একটি ট্যাংক দেওয়া কিংবা একটি পুকুর খনন করাই শেষ কথা নয়। সেটি কে রক্ষণাবেক্ষণ করবে, কতদিন করবে এবং নষ্ট হলে মেরামতের অর্থ কোথা থেকে আসবেÑএসব প্রশ্নের উত্তর না থাকলে প্রকল্প একসময় কার্যকারিতা হারায়।

লবণাক্ত পানিতে স্বাস্থ্যঝুঁকি: পানির লবণাক্ততা শুধু তৃষ্ণা মেটানোর সমস্যা তৈরি করছে না, এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও।

উপকূলীয় বাংলাদেশের পানীয় জলে লবণাক্ততা ও উচ্চ সোডিয়ামের উপস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চলছে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় উপকূলীয় নারীদের পানীয় জলের সোডিয়াম মাত্রা ও রক্তচাপের মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

গবেষণায় ১ হাজার মিলিগ্রাম/লিটারের বেশি সোডিয়ামযুক্ত পানি পানকারী নারীদের ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে।

এর আগে উপকূলীয় বাংলাদেশে পরিচালিত গবেষণাগুলোতেও পানীয় জলের লবণাক্ততা ও উচ্চ রক্তচাপের সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি ব্যবহারের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ ও প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়ার ঝুঁকির সম্পর্কও গবেষণায় উঠে এসেছে।

তবে কয়রার স্থানীয় মানুষের মধ্যে পানির লবণাক্ততার সঙ্গে নির্দিষ্ট রোগের সরাসরি সম্পর্ক নির্ণয় করতে নিয়মিত পানি পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যতথ্যের সমন্বিত জরিপ প্রয়োজন।

সরকারি উদ্যোগ আছে, কিন্তু সংকটও আছে: সুপেয় পানির সংকট মোকাবিলায় সরকারি উদ্যোগে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ট্যাংক বিতরণ, পুকুর খনন ও সংরক্ষণ এবং বিভিন্ন পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লবণাক্ততার কারণে কয়রার অনেক এলাকায় গভীর নলকূপও কার্যকর নয়। তাই ভূ-উপরিস্থ পানি ও বৃষ্টির পানি ব্যবহারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তবে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ত পানির প্রবেশের কারণে মিঠাপানির উৎস নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।

একটি ট্যাংক কিংবা একটি পুকুর দিয়ে তাই এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সমাধান করা কঠিন।

প্রকল্প আছে, টেকসই ব্যবস্থাপনা কোথায়: কয়রায় পানি সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন এনজিও ও উন্নয়ন সংস্থাও দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ট্যাংক, কমিউনিটি পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, পুকুর স্যান্ড ফিল্টার এবং পানি ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এনজিও ফোরামের ২০২৪-২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপকূলীয় খুলনা ও সাতক্ষীরায় জলবায়ুজনিত লবণাক্ততার প্রভাব মোকাবিলায় শত শত কমিউনিটি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা স্থাপন এবং নারী-নেতৃত্বাধীন পানি ব্যবহারকারী দল গঠন করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ পানি সংগ্রহে নারীদের সময় ও শারীরিক শ্রম কমাতে সহায়তা করেছে।

কিন্তু প্রকল্প শেষ হওয়ার পর কী হচ্ছে: সরেজমিনে কয়রা উপজেলা সদরের মদিনাবাদ ও দেয়াড়া এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, এনজিওগুলোর দেওয়া কয়েকটি পানি সরবরাহ প্রকল্প রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অচল হয়ে পড়ে আছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প চালুর সময় যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়, পরে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের ক্ষেত্রে ততটা নজর থাকে না। ফলে একসময় কার্যকর থাকা অনেক কমিউনিটি পানি প্রকল্প ধীরে ধীরে অচল হয়ে পড়ে।

এতে স্পষ্ট, পানি সংকট মোকাবিলায় শুধু প্রকল্প নয়, প্রয়োজন প্রকল্প-পরবর্তী ব্যবস্থাপনাও।

সমাধান কি শুধু নতুন প্রকল্প: কয়রার পানির সংকটের স্থায়ী সমাধান কোনো একক প্রযুক্তি বা একটি প্রকল্পের মাধ্যমে সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমুখী পানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা।

প্রথমত, ইউনিয়নভিত্তিকভাবে পানির লবণাক্ততার মাত্রা, মিঠাপানির উৎস, সারা বছর ব্যবহারযোগ্য পুকুর এবং ভূগর্ভস্থ পানির সম্ভাবনা নিয়ে নিয়মিত বৈজ্ঞানিক মানচিত্র তৈরি করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, প্রতিটি গ্রামে বড় ধারণক্ষমতার বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শুধু বর্ষার পানি ধরে রাখলেই হবে না; শুষ্ক মৌসুম পর্যন্ত তা নিরাপদে সংরক্ষণের সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, যেসব পুকুরে মিঠাপানি সংরক্ষণ সম্ভব, সেগুলোকে কমিউনিটি নিরাপদ পানির উৎস হিসেবে সংরক্ষণ করতে হবে। পাশাপাশি পুকুর স্যান্ড ফিল্টারের নিয়মিত পরিষ্কার, মেরামত ও পানির মান পরীক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।

চতুর্থত, পানি সংগ্রহের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব যেহেতু নারীদের ওপর পড়ে, তাই পানি প্রকল্পের পরিকল্পনা থেকে শুরু করে ব্যবস্থাপনাÑসব পর্যায়ে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

সবশেষে সরকারি সংস্থা, স্থানীয় সরকার, এনজিও এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। কারণ কয়রার পানির সংকট শুধু পানি সরবরাহের সমস্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জলবায়ু পরিবর্তন, জনস্বাস্থ্য, নারী শ্রম, অর্থনীতি এবং মানবিক মর্যাদা।

শেষ কথা: কয়রায় পানির অভাব নেই। নদী আছে, খাল আছে, পুকুর আছে, বৃষ্টি আছে। অভাব শুধু নিরাপদ মিঠাপানির।

আর সেই পানির জন্য প্রতিদিন সবচেয়ে বেশি পথ হাঁটছেন নারীরাই। মাথায় বা কাঁখে এক কলসি পানি নিয়ে ফিরে আসার সেই পথ হয়তো কয়েক কিলোমিটারের। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বছরের পর বছর ধরে চলা এক সংগ্রাম।

সমুদ্রের লবণাক্ত পানি যতই উপকূলের ভেতরে ঢুকে পড়ুক, মানুষের পানির অধিকার যেন তার সঙ্গে হারিয়ে না যায়। কয়রার নারীদের হাতে শুধু কলসি নয়, ঘরের কাছেই নিরাপদ পানির কল পৌঁছে দেওয়াই হতে পারে এই সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে মানবিক শুরু।