Home আঞ্চলিক সুন্দরবন//মাছ ও কাঁকড়া ধরা বন্ধ, জেলেরা ভীষণ কষ্টে

সুন্দরবন//মাছ ও কাঁকড়া ধরা বন্ধ, জেলেরা ভীষণ কষ্টে

12

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি।।
সুন্দরবনের নদ-নদীতে মাছ ও কাঁকড়া ধরা বন্ধে নিষেধাজ্ঞা চলছে। ফলে এর ওপর নির্ভরশীল প্রায় ৩১ হাজার জেলে বেকার হয়ে পড়েছেন। সরকারিভাবে তাঁদের খাদ্যসহায়তা দেওয়া কথা থাকলেও সে সহায়তা পেয়েছেন মাত্র দুই হাজার জেলে। ফলে সিংহভাগ জেলে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক এম এম হাসান জানান, মাছের প্রজনন মৌসুমের জন্য মন্ত্রিপরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১ জুন থেকে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনের নদ-নদীতে মাছ, কাঁকড়া ধরা ও পর্যটক ঢোকা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এই সময় ১০৪ দিন সুন্দরবনের নদ-নদীতে মাছ ও ৯২ দিন কাঁকড়া ধরা বন্ধ থাকবে। একইভাবে বঙ্গোপসাগরে গত ২০ মে থেকে আগামী ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৬৫ দিন সব প্রকার মাছ ধরা বন্ধ রাখার হয়েছে।

সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনসংলগ্ন শ্যামনগর উপজেলায় নিবন্ধনকৃত জেলের সংখ্যা ২৩ হাজার। আশাশুনি উপজেলায় নিবন্ধনকৃত জেলের সংখ্যা ৭ হাজার ৭০২। এই জেলেরা সারা বছর সুন্দরবনসংলগ্ন নদ-নদীতে মাছ ও কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন।

সুন্দরবন ট্রলার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল আলিম জানান, এ অঞ্চলে প্রতিবছর একাধিক ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানে। গত দুই বছরে ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও ইয়াসের আঘাতে এ দুই উপজেলার মানুষ যারপরনাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এখনো সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেননি তাঁরা। আশাশুনি ও শ্যামনগর—এই দুই উপজেলার সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার মানুষ সুন্দরবনের নদ-নদীতে মাছ ও কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে সুন্দরবনের সম্পদ আহরণ বন্ধ রাখা হয়। এরপর নদ-নদীতে কাঁকড়া ধরা বন্ধ করে দেওয়ায় সামনের দিনগুলো কীভাবে কাটবে, জানেন না তাঁরা। সরকারিভাবে সহায়তা ছাড়া তাঁরা পরিবার নিয়ে টিকে থাকতে পারবেন না।

সুন্দরবনসংলগ্ন দ্বীপ গ্রাম গোলাখালীর বাসিন্দা জমিরুল আলী বলেন, বাপ-দাদা চৌদ্দ পুরুষ সবাই সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। নদ-নদীতে মাছ ও কাঁকড়া ধরে চলে তাঁদের জীবন-জীবিকা। কিন্তু গত ২০ মে থেকে সুন্দরবনে মাছ ধরা বন্ধ করে দেওয়ায় তাঁরা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। কয়েক দিন যেতে না যেতেই তাঁরা চরম অভাবে পড়বেন। ছয় সদস্যের সংসার কীভাবে চালাবেন, তা তিনি জানেন না। দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরার খোলিসাবুনিয়া গ্রামের আবদুল রাজ্জাক গাজী বলেন, সুন্দরবনের নদ-নদীতে মাছ ও কাঁকড়া ধরা বন্ধ করে দেওয়ায় তিনি চরম আর্থিক কষ্টে পড়েছেন। কীভাবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত কাটবে, তা বুঝতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘কেউ ধারও দিতে চাচ্ছে না। বন্ধক রাখার মতো কিছু নেই। এলাকায় অন্য কোনো কাজও নেই। ছেলেমেয়ে নিয়ে এলাকা ছাড়া উপায় দেখতে পাচ্ছিনে।’ গাবুরা গ্রামের মাজিদা খাতুন বলেন, ‘বাড়ির লোকের কাজ নি। সুন্দরবনের বাইরির নদীতে জাল দোন দিতে গেলি বনের লোক টানতি দিতেছে না। তালি আমরা চলি কি কুরে, বাঁচি কী করে?’ গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম বলেন, মাছ ও কাঁকড়া ধরতে না পারলে এলাকার মানুষের মধ্যে হাহাকার পড়ে যায়। সাড়ে তিন মাস সুন্দরবনে নদ-নদীতে জেলেদের নামা বন্ধ করে দেওয়ায় এলাকার কর্মহীন মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শ্যামনগর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আনিসুর রহমান বলেন, সুন্দরবন এলাকার সাতক্ষীরা রেঞ্জে আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলার নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৩০ হাজার ৭০২। শ্যামনগরের ৮ হাজার ২২৩ জন ও আশাশুনির ৪ হাজার ৫৫৫ জনের তালিকা তৈরি করে খাদ্যসহায়তার জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু দুই উপজেলা মিলে ১ হাজার ৯৭৯ জন জেলের জন্য ৮৬ কেজি করে চালের বরাদ্দ এসেছে। অন্যদের বিষয় কী হবে, তা তিনি বলতে পারেন না।