Home জাতীয় বঙ্গবন্ধুর ঘাতক মাজেদের মৃত্যুপরোয়ানা জারি: রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন

বঙ্গবন্ধুর ঘাতক মাজেদের মৃত্যুপরোয়ানা জারি: রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন

12

ঢাকা অফিস:

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা মামলার গ্রেফতারকৃত ফাঁসির দ-প্রাপ্ত আসামি ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আবদুল মাজেদের মৃত্যুপরোয়ানা জারি করেছে আদালত। বুধবার ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ এম হেলাল চৌধুরী তাকে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে তার ফাঁসির পরোয়ানা জারি করেন। লাল সালুতে মোড়ানো মৃত্যুপরোয়ানা কারাগারে আব্দুল মাজেদকে পড়ে শোনানো হবে। ইতিমধ্যে তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করেছেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোশারফ হোসেন কাজল আদালতে মৃত্যুপরোয়ানা জারির আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত আব্দুল মাজেদের মৃত্যুপরোয়ানা জারি করেন।

এর আগে তাকে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আদালতে উপস্থিত করা হয়। এরপর বিচারক তার ফাঁসির পরোয়ানা জারি করেন। এ সময় বিচারক তার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু হত্যায় আনীত অভিযোগ ও মামলার রায় পড়ে শোনান। ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারী কৌঁসুলি খন্দকার আবদুল মান্নান সাংবাদিকদের বলেন, বঙ্গবন্ধুর খুনী আবদুল মাজেদের বিরুদ্ধে মৃত্যুপরোয়ানা জারির আদেশ দিয়েছে আদালত। আইন অনুযায়ী, এই মৃত্যুপরোয়ানা কারাগারে পাঠানো হবে। মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, লালকাপড়ে মোড়ানো এই মৃত্যুপরোয়ানা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া পরোয়ানার একটি কপি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ঢাকার জেলা প্রশাসকের দফতরেও পাঠানো হয়। এখন মৃত্যুপরোয়ানা কারাগারে খুনী মাজেদকে পড়ে শোনাবেন কারা কর্তৃপক্ষ। তবে এ ফাঁসির আসামি রাষ্ট্রপতি বরাবর প্রাণভিক্ষার সুযোগ পাবেন। কারা বিধিতে প্রাণভিক্ষার আবেদন করার জন্য ৭ থেকে ২১ দিন সময় বেঁধে দেয়া রয়েছে। অন্যদিকে মোশারফ হোসেন কাজল আরও বলেন, আপীল করার সুযোগ অনেক আগেই পার হয়ে গেছে। আপীল করতে বিলম্বের জন্য কোন যৌক্তিক কারণ মাজেদ দেখাতে পারবেন না। সুতরাং কোন সুযোগ তিনি পাচ্ছেন না। আগামী ২১ থেকে ২৮ দিনের মধ্যে যে কোন সময় রায় কাযর্কর হবে।

এদিকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, আদালত মৃত্যুপরোয়ানা জারি করেছে। এখন ঐ পরোয়ানা কারাগারে আসামি আব্দুল মাজেদকে পড়ে শোনানো হবে। তিনি মার্সি চান কিনা। চাইলে এক রকম না চাইলে অন্য রকম। এর আগের দিন আমি বলেছিলাম, খুনী মাজেদের দ- কার্যকর করার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। এটা তারই অংশ। এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই পড়ে। প্রক্রিয়া শেষ হলেই দন্ড কার্যকর করা হবে। খুনী মাজেদ বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্র ও হত্যাকান্ডে সরাসরি জড়িত ছিল। সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিচারিক আদালতে তার মৃত্যুদন্ড হয়েছে। পরবর্তীতে আপীল আদালতে এ দন্ড কনফার্ম হয়। অন্যদিকে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহম্মেদ জনকণ্ঠকে বলেছেন, খুনী মাজেদ যদি আপীল না করে তা হলে ফাঁসি কার্যকর করতে কোন বাধা নেই। আদালতের আদেশে যে কোন দিন তার ফাঁসি কার্যকর করতে পারবে সরকার। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন পরে মাজেদ গ্রেফতার হয়েছে। আপীলের সময় শেষ হয়েছে। এর আগে ৫ জনের দন্ড কার্যকর হয়েছে। তার মধ্যে চারজন রাষ্ট্রপতির নিকট আবেদন করেনি। শুধু ফারুক করেছিল কিন্তু দোষ স্বীকার করেনি। একই অপরাধের সঙ্গে জড়িত আব্দুল মাজেদ। তার কোন অনুকম্পা পাওয়ার সুযোগ নেই। তার কাছে এখন একটি মাত্র পথ আছে তা হলো রাষ্ট্রপতির নিকট প্রাণভিক্ষার আবেদন। কিন্তু অনুকম্পা করার মতো রাষ্ট্রপতির কিছু নেই। রাষ্ট্রপতি তার আবেদন প্রত্যাখ্যান করলে যে কোন সময় তার ফাঁসি কার্যকর হতে পারে। এ বিষয়টি নির্ভর করছে আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওপর। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর খুনীদের ফাঁসির রায় সম্পূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। দেশের সংবিধান ও প্রচলিত ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী ফাঁসির রায় কার্যকরের ক্ষেত্রে আইনগত কোন বাধা নেই।

বুধবার ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আব্দুল মান্নান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা রাষ্ট্রপক্ষ থেকে মাজেদকে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানোর জন্য আবেদন করি। আদালত তাকে আজ (বুধবার) আদালতে উপস্থিত করার জন্য দিন ধার্য করে। ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তাকে আদালতে উপস্থিত করা হয়। এ সময় বিচারক তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ও মামলার রায় পড়ে শোনান। এরপর বিচারক তাকে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে সাজার পরোয়ানা জারি করেন। আসামি রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করতে পারবে কিনা, এমন প্রশ্নের উত্তরে পিপি বলেন, ‘তিনি দীর্ঘদিন ধরে পলাতক ছিলেন। আমার জানামতে, তিনি আপীল করার সুযোগ পাবেন না।’

এদিকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আব্দুল মাজেদের বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নিতে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বুধবারের ছুটি বাতিল করেছে সুপ্রীমকোর্ট প্রশাসন। সুপ্রীমকোর্টের মুখপাত্র ও হাইকোর্ট বিভাগের স্পেশাল অফিসার মোহাম্মদ সাইফুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেছেন, ঢাকা জেলা ও দায়রা আদালত ছুটিতে থাকায় ধানম-ি থানার মামলা নং ১০ তারিখ ২-১০-১৯৯৬ যার দায়রা মামলা নং ৩১৯/১৯৯৭ এ গ্রেফতারকৃত সাজাপ্রাপ্ত আসামি ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আব্দুল মাজেদের বিষয়ে আশু ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছিল না। এ বিষয়ে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ কর্তৃক বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্টে দৃষ্টি আকর্ষণপূর্বক আবেদন জানালে বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্ট প্রযোজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নিমিত্তে কেবল ৮ এপ্রিল ঢাকার জেলা ও দায়রা জজের আদালত এবং অফিসের ছুটি বাতিল করে।

এর আগে মঙ্গলবার ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম জুলফিকার হায়াৎ তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এরপর বেলা ১টা ৫ মিনিটের দিকে তাকে প্রিজনভ্যানে কেরানীগঞ্জে অবস্থিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টায় মিরপুর সাড়ে ১১ নম্বর থেকে গ্রেফতার করা হয় বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনী মাজেদকে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে পলাতক ছিলেন। ২০০৯ সালে ইন্টারপোলের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে রেড এ্যালার্ট জারি করে বাংলাদেশ পুলিশ।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানম-ি ৩২ নম্বরের বাসায় সপরিবারে হত্যার শিকার হন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানা দেশের বাইরে থাকায় বেঁচে যান। নির্মম সেই হত্যাকা-ের অন্যতম আসামি আবদুল মাজেদ। মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ১৯৯৬ সালের ১৪ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার তিন প্রধান আসামি লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী তাহের উদ্দিন ঠাকুরকে গ্রেফতার করা হয়। একই বছরের ২ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুর একান্ত সহকারী (পিএস) এ এফ এম মোহিতুল ইসলাম ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সংঘটিত নারকীয় হত্যাকান্ডের ঘটনায় ধানম-ি থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। ১৯৯৬ সালের ১৪ নবেম্বর খুনীদের বিচারের হাতে ন্যস্ত করতে পার্লামেন্টে ইনডেমনিটি আইন বাতিল করা হয়। ১৯৯৭ সালের ১৫ জানুয়ারি সিআইডি এই মামলায় ২০ জনকে অভিযুক্ত করে মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে চার্জশীট দাখিল করে। একই বছরের ১২ মার্চ ছয় আসামির উপস্থিতিতে আদালতে বিচার শুরু হয়।

১৯৯৭ সালের ১৯ জুন পর্যন্ত বিচারক বিব্রত হওয়াসহ নানা কারণে আটবার বিচার কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। এভাবে দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ১৯৯৮ সালের ৮ নবেম্বর মামলার রায়ে বিচারক কাজী গোলাম রসুল ১৫ জন সাবেক সেনা কর্মকর্তার মৃত্যুদ-াদেশ দেন। ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর হাইকোর্ট বেঞ্চ ২৪ দিনের শুনানি শেষে বিভক্ত রায় দেয়। বিচারক এম রুহুল আমিন অভিযুক্ত ১৫ আসামির মধ্যে ১০ জনের মৃত্যুদ-াদেশ বজায় রাখেন কিন্তু অপর বিচারক এ বি এম খায়রুল হক অভিযুক্ত ১৫ জনকেই সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডাদেশ দেন। পরে হাইকোর্টের তৃতীয় বেঞ্চে ১২ আসামির মৃত্যুদন্ডাদেশ বহাল থাকে। পরবর্তীতে ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে বিচার কাজ বন্ধ থাকে। দীর্ঘ ছয় বছর পর ২০০৭ সালের ২৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষের মুখ্য আইনজীবী বর্তমান সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সুপ্রীমকোর্টের সংক্ষিপ্ত বিবৃতি প্রদান করেন এবং ২৩ সেপ্টেম্বর আপীল বিভাগের তিন সদস্যের একটি বেঞ্চ ২৭ দিনের শুনানি শেষে পাঁচ আসামিকে নিয়মিত আপীল করার অনুমতিদানের লিভ টু আপীল মঞ্জুর করেন। ২০০৯ সালের ১২ নবেম্বর চূড়ান্ত শুনানি শেষ হয় এবং আদালত ১৯ নবেম্বর রায়ের তারিখ নির্ধারণ করে। ওইদিন (১৯ নবেম্বর) বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্টেও আপীল বিভাগের পাঁঁচ সদস্যের বেঞ্চে হাইকোর্টের দেয়া রায় বহাল রেখে মৃত্যুদ-াদেশ পাঁচ আসামির দায়ের করা আপীল আবেদন খারিজ করা হয়। পরে ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি আপীলের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের রিভিউ খারিজ হলে ২৮ জানুয়ারি ৫ আসামির ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়।