বিশেষ প্রতিনিধি ।।
অত্যন্ত ব্যয়বহুল মাদক ক্রিস্টাল মেথ বা আইস। এর দাম অন্যান্য মাদকের চেয়ে বেশি হওয়ায় মাদক ব্যবসায়ীরা এখন ইয়াবার সংগে এই মাদকও বিক্রি শুরু করেছেন। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী দেশ মিয়ানমার থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়েই ইয়াবার চালানের সংগে আনা হচ্ছে এই ‘বিলাসবহুল’ মাদক। যার ক্রেতা রাজধানীর অভিজাত এলাকার উচ্চবিত্তের মাদকসেবীরা।
গোয়েন্দা পুলিশ বলছে, মাদকসেবীদের কাছে ক্রিস্টাল মেথ বা ডি মেথ নামে বেশি পরিচিত এই আইস। এটি একটি স্নায়ু উত্তেজক মাদক। আইস অত্যন্ত ভয়াবহ, মারাত্মক উত্তেজনাকর ও গুরুতর স্বাস্থ্য-ঝুঁকিপূর্ণ একটি ব্যয়বহুল মাদক। এটি গ্রহণে হরমোন উত্তেজনা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। ফলে শারীরিক ও মানসিকভাবে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হন গ্রহণকারীরা। এই কারণেই অন্যান্য নেশার চেয়ে মাদকসেবীরা এটির দিকে বেশি ঝুঁকছেন।
গোয়েন্দা পুলিশ বলছে, পাঁচ গ্রাম আইসের বাজারমূল্য প্রায় এক লাখ টাকা। যেকারণে এটিকে এখন ইয়াবার চেয়ে বেশি লাভজনক মনে করছেন মাদক ব্যবসায়ীরা। একদিকে মাদকসেবীদের মধ্যে এর চাহিদা, অন্যদিকে অল্প পরিমাণ বিক্রি করেই বেশি লাভ- তাই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে রাজধানীর অভিজাত এলাকার বিভিন্ন সীসাবারে আইস সরবরাহ করছে মাদক ব্যবসায়ীরা।
গত ১৮ জুন র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র্যাব) আইস সেবন ও ক্রয়-বিক্রয়কারী একটি চক্রের ছয় সদস্যকে গ্রেফতার করে। এই চক্রটি সরবরাহকারীদের কাছ থেকে সামান্য পরিমাণে আইস মোটা অংকের টাকায় কিনে সেগুলোতে ভেজাল দিতো। তারপর তা বিক্রি করতো। এই জন্য তারা একটি ল্যাবও গড়ে তুলেছিলো।
গ্রেফতারের পর তারা জানায়, মিয়ানমার থেকে একটি চক্র তাদেরকে সামান্য পরিমাণে আইস সরবরাহ করতো। এই সামান্য আইসে পাতন পদ্ধতিতে ভেজাল মিশিয়ে তারা আইসের পরিমাণ বাড়াতো। যারা তাদের কাছে আইস সরবরাহ করতো সেই চক্রে বড় একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। যারা রাজধানীর বিভিন্ন বারগুলোতেও এই আইস সরবরাহ করতো। এমন তথ্য পাওয়ার পর নজরদারি বৃদ্ধি করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, র্যাবের হাতে গ্রেফতার ওই চক্রের তথ্যগুলো আমলে নিয়ে রাজধানীর অভিজাত এলাকার বারগুলোতে নজরদারি বৃদ্ধি করেন তাঁরা। ওই নজরদারির কয়েকদিনের মধ্যে গোয়েন্দারা জানতে পারেন, বেশ কয়েকটি হাত বদল হয়ে ঢাকার বারগুলোতে আইস পৌঁছে। যার নেপথ্যে রয়েছেন মিয়ানমার সীমান্তের কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ী। এরপর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয় কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকায়। এরপরই গোয়েন্দাদের নজরে আসে, বড় একটি আইসের চালান কক্সবাজার সীমান্ত হয়ে আসবে রাজধানী ঢাকায়। সেটিও পূর্বের চালানগুলোর মতো হাত বদল হবে। তাই এবার প্রতিটি পয়েন্টে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গোয়েন্দা পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, র্যাবের হাতে গ্রেফতার হওয়া চক্রের তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর অভিজাত এলাকার বারগুলোতে আইস সরবরাহ করে এমন কয়েকজন মাদক বিক্রেতার সন্ধান পাই আমরা। কিন্তু সমস্যা হলো, যাদের সন্ধান আমরা পেয়েছিলাম তারা ছিলো খুচরা বিক্রেতার মতো। অর্থাৎ তাদের কাছে আইস থাকতো সামান্য পরিমাণে। তাই আমরা আরও সময় নিয়ে তাদেরকে কারা এসব আইস সরবরাহ করে সেই চক্রের সন্ধানে নামি। সন্ধানে নেমে আমরা আরও কয়েকটি চক্রের সন্ধান পাই। তারাও বিভিন্ন হাত বদল হওয়ার পর এই আইস ঢাকার বিক্রেতাদের কাছে সরবরাহ করতো। যেকারণে তাদের কয়েকজনকে নজরদারিতে রেখে সন্ধান চলতে থাকে। এক পর্যায়ে এমন একটি চক্রের সন্ধান মেলে যারা সীমান্ত থেকে এই আইস ঢাকায় পৌঁছাতে বিভিন্ন কৌশলে হাত বদল করে।
তিনি বলেন, অনুসন্ধানে আমরা জানতে পারি, ওই চক্রটি বড় একটি চালান নিয়ে কক্সবাজার থেকে ঢাকার উদ্দেশ্য রওনা দিয়েছে। পরে তারা চালানটি নিয়ে ঢাকায় এলে তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়। এই চক্রের মোট নয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় পৃথক পৃথক অভিযান চালিয়ে তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়।
অভিযানে মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে মো. নাজিম উদ্দিন, মো. আব্বাস উদ্দিন, মো. নাছির উদ্দিন, মোছা. শিউলি আক্তার, কোহিনুর বেগম, সানজিত দাস ও মো. হোসেন আলীকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের গুলশান বিভাগ। অভিযানে ৫০০ গ্রাম আইস ও ৬৩ হাজার পিস ইয়াবা এবং একটি প্রাইভেটকার জব্দ করা হয়।
একইভাবে যাত্রাবাড়ীর শনির আখড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে রাশিদা বেগম ও মৌসুমী আক্তারকে গ্রেফতার করে মিরপুর গোয়েন্দা বিভাগ। অভিযানে তাদের কাছ থেকে ২৫ হাজার পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়। তারা সবাই একই চক্রের সদস্য।
এই বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে জব্দকৃত ৫০০ গ্রাম আইসের আজার মূল্য প্রায় ১ কোটি টাকা। এসব আইস রাজধানীর অভিজাত সীসা বারগুলোতে সরবরাহ করার কথা ছিলো চক্রটির। তবে গোয়েন্দা পুলিশের কড়া নজরদারিতে তার আগেই তারা ধরা পড়েছে। এসব আইস উচ্চবিত্তের বখে যাওয়া মাদকসেবীরাই কিনতো। তাদের ধারণা, অন্যান্য মাদকের চেয়ে আইস নেশায় বেশি কার্যকর।
তিনি বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি এই আইস মাদকসেবীরা বিভিন্ন বারের সীসা লাউঞ্জে সেবন করতো। কলকির মতো করে টেনে সেবন করা হয় এটি। এছাড়াও অন্য কোনোভাবে এটি ব্যবহার হয় কি-না এবং এই চক্রে আর কারা রয়েছে সে বিষয়ে আমাদের অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। এই জন্য তাদেরকে আমরা রিমান্ডে এনেছি। আশা করছি রিমান্ডে তারা বিস্তারিত জানাবে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের গোয়েন্দা তথ্য বলছে, ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, বসুন্ধরাসহ রাজধানীর অভিজাত এলাকায় এই মাদক সেবনের পরিমাণ বেশি। তাই এসব এলাকায় আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি এবং অভিযান অব্যাহত রয়েছে।










































