বিশেষ প্রতিনিধি
কেসিনোকাণ্ডের পর সবচেয়ে আলোচিত নাম নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের বহিস্কৃত সাধারণ সম্পাদক শামিমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউ। মাদক, জোর করে পতিতাবৃত্তি করানো, অর্থ পাচারসহ নানা অপরাধে তাকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। তবে অপরাধ জগতে তার আগমন ঘটে স্বামী মফিজুর রহমান চৌধুরী সুমন ওরফে মতি সুমনের হাত ধরে।

শহর ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক মতি সুমনের হাত ধরে পাপিয়ার উত্থান হলেও একপর্যায়ে প্রভাব-প্রতিপত্তি আর ক্ষমতায় স্বামীকেও ছাড়িয়ে যান পাপিয়া। নিজেই গড়ে তোলেন বিশাল বাহিনী। গ্রেপ্তারের পর পাপিয়া ও তার স্বামীর ব্যাপারে বেরিয়ে আসছে অনেক চমকপ্রদ তথ্য। সমকাল’র এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে আসে।
এলাকাবাসী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র মতে, নরসিংদী সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন পাপিয়া। এ সময়ই তার সঙ্গে পরিচয় হয় মতি সুমনের। এরপর বন্ধু থেকে একপর্যায়ে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন তারা। মতি সুমনের হাত ধরে রঙিন দুনিয়ার সঙ্গে পরিচয় হতে থাকে পাপিয়ার। কলেজের সাধারণ ছাত্রী হয়েও মতি সুমনের মাধ্যমে নরসিংদীর রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে পরিচয় হয় পাপিয়ার। বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে স্থানীয় অনেক নেতা পাপিয়াকে তাদের কাজে ব্যবহার করতে শুরু করেন। আর এখান থেকেই পাপিয়ার বেপরোয়া জীবনের শুরু। নরসিংদীর প্রয়াত মেয়র লোকমান হোসেনের ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণে মতি সুমন ও পাপিয়াকে নিয়ে কেউ মুখ খুলার সাহস করতেন না।

স্থানীয় সূত্র মতে, ২০০৬ সালের দিকে নরসিংদী সরকারি কলেজে প্রথম ছাত্রী হোস্টেল উদ্বোধন হয়। ওই সময় হোস্টেলের একটি কক্ষ নিজেদের আস্তানা বানান পাপিয়া। সেখানে অনেক বহিরাগত ছাত্রীর যাতায়াত ছিলো। কোনো কোনো ছাত্রীকে প্রলোভন ও চাপ দিয়ে ওই সময় খারাপ কাজ করাতেন তিনি। তখনো স্থানীয় অনেকে পাপিয়ার এসব কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে অবগত ছিলেন।
নরসিংদী সরকারি কলেজের একজন প্রাক্তন ছাত্র জানান, সুমন ও পাপিয়া ছিলেন নরসিংদীর আলোচিত চরিত্র। একদিন পাপিয়া কলেজের ভেতরে সুমনকে বিয়ের জন্য চাপ দেন। এতে রাজি না হলে পাপিয়া তাকে গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দেন। এ নিয়ে পাপিয়া ও সুমনের গ্রুপের মধ্যে কলেজে মারামারি হয়। প্রেমের সম্পর্ক থাকলেও পাপিয়াকে শেষ পর্যন্ত বিয়ে করতে চাননি সুমন। পরে বাধ্য হয়ে পাপিয়াকে বিয়ে করেন সুমন। সুমনের বাবা অধ্যক্ষ মতিউর রহমান চৌধুরী। তিনি নরসিংদীর নজরুল একাডেমির প্রধান। তার দুই ছেলের মধ্যে সুমন ছোট। সুমন নামে একাধিক যুবক থাকায় বাবার নামের আদ্যাক্ষর মিলিয়ে অনেকে তাকে মতি সুমন নামে ডেকে থাকেন। সুমনের আরেক ভাই নামকরা গিটার বাদক। ছোটবেলা থেকে সুমনের বেপরোয়া জীবন-যাপনের কারণে তার পরিবারের সদস্যরা বিব্রত হতেন। সুমনের বিরুদ্ধে মানিক কমিশনার হত্যাসহ চারটি মামলা আছে।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, লোকমান হত্যার পর সুমন ও পাপিয়া লোকমানের ভাই বর্তমান মেয়র কামরুজ্জামানের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। তবে অতীত কর্মকাণ্ডের কারণে কামরুজ্জামান তাদের এড়িয়ে চলেন। এর মধ্যেই ২০১৩ সালে মতি সুমনের নরসিংদীর বাসায় সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। এতে পাপিয়া গুলিবিদ্ধ হন। ওই হামলার পর মতি তারা নরসিংদী ছেড়ে ঢাকায় আসেন। তবে মাঝে মাঝে তারা নরসিংদীতে যাতায়াত করতেন। এরপর নরসিংদী সদরের বর্তমান এমপি নজরুল ইসলাম হিরুর আস্থা-ভাজন হয়ে ওঠার চেষ্টা করেন তারা।
একাধিক সূত্র জানায়, নরসিংদীর তরুণ-যুব প্রজন্মকে বিপথে নিয়ে যাওয়ার জন্য নানা ধরনের কৌশল ছিলো মতি সুমন ও পাপিয়ার। প্রায়ই শহরের নানা জায়গায় ডিজে পার্টির আয়োজন করতেন তারা। যারা এই দম্পতির ঘনিষ্ঠ ছিল তারা ‘কেএমসি’ বাহিনী নামে পরিচিত। খাজা মঈনুদ্দীন চিশতির নামে এই বাহিনী গড়ে তোলেন সুমন ও পাপিয়া। মাদক, টেন্ডার, অস্ত্রবাজি, জমি দখল, চাকরি দেয়ার কথা বলে টাকা আদায় করা ছিল এই বাহিনীর কাজ। নরসিংদীতে দীর্ঘদিন মাদক বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তারা। মতি সুমন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মিঠুন সাহার মাধ্যমে এই মাদক বাণিজ্য চালাতেন। বিপদ আঁচ করতে পেরে সম্প্রতি মিঠুন দেশ ছাড়েন।

স্বামীর হাত ধরে পাপের রাজ্যে আসা পাপিয়া একসময় নরসিংদীর স্থানীয় রাজনীতির বাইরেও কেন্দ্রীয় প্রভাব বাড়াতে থাকেন। স্থানীয় নেতাদের বিরোধিতার মুখেও মহিলা যুব লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের আনুকূল্য পেয়ে হঠাৎ নরসিংদী জেলা মহিলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ পেয়ে যান। ঢাকায় পাঁচতারকা হোটেলে গড়ে তোলেন বিরাট অপরাধ সাম্রাজ্য। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও ব্ল্যাকমেইল করে কোটি কোটি টাকা আয় করেন। অনৈতিক কার্যকলাপের ভিডিও ধারণ করে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়া ছিলো অন্যতম প্রধান পেশা। গুরুত্বপূর্ণ অনেক কর্মসূচিতে হাজির হয়ে সমাজের উঁচু স্তরের মানুষের সঙ্গে ছবিও তুলতেন তিনি। এমনকি সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি হচ্ছেন বলে এলাকায় প্রচারও চালাতেন তিনি।
গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে মতি সুমন জানান, একপর্যায়ে পাপিয়া তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যান। স্বামী হলেও তার চাওয়া-পাওয়ার মূল্য তিনি কমই দিতেন। পাপিয়ার ইচ্ছা অনুযায়ী সবকিছু চলতো। পাপিয়ার রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচি তিনি নিয়মিত ফেসবুকে প্রচার করতেন।
এ বিষয়ে সদর আসনের এমপি নজরুল ইসলাম হিরু গনমাধ্যমকে জানান, পাপিয়া তার রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না। ওদের মতো নোংরা ছেলেমেয়েকে তার আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার আগেই মেয়র লোকমানের ঘনিষ্ঠ ছিলেন পাপিয়ার স্বামী মতি সুমন। তার দেহরক্ষী ছিলেন সুমন। স্থানীয় মতামত উপেক্ষা করে পাপিয়াকে নরসিংদী জেলা মহিলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছিলো।
মেয়র লোকমানের ভাই নরসিংদী জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম নেওয়াজ জানান, লোকমানের সঙ্গে যখন সুমন চলতেন, তখন তার এত অপকর্মের খবর কারো জানা ছিলো না। পাপিয়াকেও আমরা চিনতাম না। হঠাৎ ২০১৪ সালে পাপিয়া যুব মহিলা লীগের নেত্রী হয়ে যান। তার আগে তিনি আওয়ামী লীগের কোনো অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। আর ২০১১ সালে সুমন পাপিয়াকে বিয়ে করার পর তাকে চিনতে পারি। উগ্র চলাফেরার কারণে সুমন ও পাপিয়াকে নরসিংদীর বর্তমান মেয়র কামরুজ্জামান কখনো তার কাছে ঘেঁষতে দেননি। কারা সুমন আর পাপিয়াকে প্রশ্রয় দেয় তা নরসিংদীর সবার জানা।
মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ডিবির উত্তর বিভাগের ডিসি মশিউর রহমান বলেন, ‘পাপিয়া-সুমন দম্পতি ও তাদের সহযোগীদের জিজ্ঞাসাবাদ করে সত্য তথ্য বের করে আনা হবে।’
প্রসঙ্গত, ২২ ফেব্রুয়ারি পাপিয়া ও তার স্বামী মতি সুমন এবং তাদের আরো দুই সহযোগী হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বহির্গমন গেট পার হওয়ার সময় র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হন। এ সময় তাদের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা, ইয়াবা, মদ ও জাল মুদ্রা উদ্ধার করা হয়। পরের দিন তাদের নিয়ে নরসিংদী ও ফার্মগেটের বাসায় অভিযান চালায় র্যাব। অভিযানে ফার্মগেটের বাসা থেকে নগদ ৫৮ লাখ টাকা, অবৈধ পিস্তল ও গুলি, বিদেশি মুদ্রা ও মদ জব্দ করা হয়। বর্তমানে সুমন ও পাপিয়া ১৫ দিনের রিমান্ডে।-বাংলা








































