Home জাতীয় ‘আমার তো সব শেষ, আর কারো এমন না হোক’

‘আমার তো সব শেষ, আর কারো এমন না হোক’

8

০ বিশেষ প্রতিনিধি

গোলাপী রংয়ের জামা। বাঁ-পায়ে কালো সুতার পায়েল। একের পর এক গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলে হাঁপিয়ে উঠেছে তরুণী কাজল (ছদ্মনাম)আমরাও তার আসল নাম প্রকাশ করতে চাই না। তবে কাজল নামেই তিনি পাচার হয়েছিলেন বেঙ্গালুরুতে। সৌভাগ্যক্রমে পালিয়ে ফিরতে পেরেছেন। দু’চোখ যেন ছলছল করছে। অনেক কিছু বলতে চায়। কেমন আছেন জানতে চাইলে উত্তরে কাজল বলেন, ভালো নেই। বড্ড ক্লান্ত লাগছে। খুব বেশি কথা বলতে পারবো না। আর কতো! নিজ থেকেই বললেন, দেশে ফিরেও যখন বুঝতে পারলাম ‘আমি তো শেষ! এরপর হয়তো অন্য কারো পালা। নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে আছি। তখন মনে মনে ঠিক করলাম, আর কেউ যেন প্রতারক হৃদয়ের নির্যাতন এবং প্রতারণার শিকার না হয়, তখন সাহস করে আমিই ভারতে নির্যাতনের শিকার তরুণীর ভিডিওটি ভাইরাল করি। তখন আমি সৌভাগ্যক্রমে দেশে আসার পর ভারতের বেঙ্গালুরে এক তরুণের মাধ্যমে বাংলাদেশি ওই তরুণীকে নির্যাতনের ভয়াবহ ভিডিওটি হাতে পাই। ইতিমধ্যে নির্ভয়ার বাবা বাদী হয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের হাতিরঝিল থানায় মামলা করেছেন। হাতিরঝিল থানা পুলিশের তত্ত্বাবধানে থাকা ভারত থেকে ফেরা নির্যাতিতা তরুণী তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া লোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন।

কাজল বলেন, ওই তরুণীর ওপর নির্যাতনের পুরো বিষয়টি আমি অনেক পরে জেনেছি। নির্যাতনের সময় ঘটনাস্থলে থাকা আরেক তরুণী আমাকে নির্যাতিতা তরুণীর দুটি ছবি পাঠায়। ছবি দুটি প্রথম দেখে আমি শিউরে উঠি। ভাবি, যারাই ওদের কথা শুনবে না এবং কোনোভাবে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে তাদের সঙ্গেও একই ঘটনা ঘটতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে পুরো ভিডিওটি দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারছিলাম না। দেশে ফিরে আসার অনেক দিন পর বেঙ্গালুরুতে অবস্থান করা এক বাংলাদেশি তরুণীর কাছ থেকে প্রথম জানতে পারি, যে তরুণী আমাদের পালাতে সহায়তা করেছিল তার ওপর সেখানে ভয়ঙ্কর নির্যাতন চালানো হয়েছে। এরপর তার কাছ থেকে সেই ভিডিওটি পাই। সময় আমার মনে হচ্ছিল, প্রতারক হৃদয়ের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া দরকার।

এরপর সিদ্ধান্ত নেই বাঁচবো, নয় মরবো। ভিডিওটি পরিচিত এক ভাইয়াকে ইমো অ্যাকাউন্টে পাঠানোর পরে অনুরোধ করে বলি, ভাই ভিডিওটি ভারত এবং বাংলাদেশ দু’দেশেই যেভাবে হোক ভাইরাল করতে হবে। তিনি আমার কথায় সাড়া দিয়ে প্রথমে তার ভারতীয় কিছু বন্ধুদের সঙ্গে ভিডিওটি শেয়ার করেন। পরবর্তীতে তারা বাংলাদেশে থাকা ফেসবুক বন্ধুদের কাছে ভিডিওটি শেয়ার করার পর পুরো ভিডিওটি ভাইরাল হয়। সেটি ভারত-বাংলাদেশ দুই দেশেই একসঙ্গে ভাইরাল হয়।

ভুক্তভোগী তরুণী বলেন, সময় হৃদয়ের চক্রের এক ছেলে আমাকে ভিডিওটি দেখিয়ে ভয় দেখায়। বলে, দলের যারাই কথা শুনবে না তাদেরকে একইরকম নির্যাতন সহ্য করতে হবে। এর আগে নির্যাতনের শিকার তরুণীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি। ফোনে তিনি বলেন, যেভাবে পারো তোমরা এখান থেকে পালিয়ে যাও। সময় আমার সঙ্গে আরো চারজন তরুণী এবং মাঝ বয়সী নারী ছিলেন। এরপর আমি সেখান থেকে পালিয়ে কেরালায় চলে যাই। দীর্ঘ এক মাস ১৮ দিন ভারতের নানা শহরের হোটেলে থেকেছেন এই তরুণী। সহ্য করতে হয়েছে অসংখ্যবার শারীরিক নির্যাতন। সেখান থেকে চেন্নাই হয়ে দেশের মাটিতে পা রাখেন এই তরুণী।

দেশে ফিরেছেন কীভাবে জানতে চাইলে তরুণী বলেন, সীমান্তে টাকার বিনিময়ে বর্ডার পার করে দেয় একদল ভারতীয় দালাল লাইনম্যান। তাদের একজনের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে ফোন দিয়ে জানাই, আমি দেশে ফিরতে চাই। সময় তিনি বলেন, দেশে ফিরতে হলে বর্ডার পার হওয়া থেকে শুরু করে ওপার পর্যন্ত যেতে মোট ৩০ হাজার রুপি খরচ হবে। মায়ের ফোন নম্বর আমার মুখস্থ ছিল। ফোন দিয়ে বলি, মা আমি ভারতে আছি। দেশে ফিরতে চাই। টাকা পাঠাও। সময় মা ওই নম্বরের বিকাশ অ্যাকাউন্টে পুরো টাকাটা পাঠালে বর্ডারের দালালদের সহায়তায় দেশে ফিরে আসি।

দেশে ফিরে আসার অনেক দিন পর বেঙ্গালুরুতে অবস্থান করা এক বাংলাদেশি তরুণীর কাছ থেকে প্রথম জানতে পারি, যে তরুণী আমাদের পালাতে সহায়তা করেছিল তার ওপর সেখানে ভয়ঙ্কর নির্যাতন চালানো হয়েছে। এরপর তার কাছ থেকে সেই ভিডিওটি পাই। সময় আমার মনে হচ্ছিল, প্রতারক হৃদয়ের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া দরকার।

ভাই-বোনদের মধ্যে সবার ছোট এই তরুণী বলেন, ছোট বেলা থেকেই আমি একটু চঞ্চল প্রকৃতির। ভাই-বোনদের মধ্যে সকলের ছোট হওয়ায় কেউ সেভাবে শাসন করতো না। বাবা-মায়ের বয়স হওয়াতে বড় ভাই তাদের দেখাশোনা করেন। দুই বোন তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঢাকার একটি এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন।

তিনি বলেন, নবম শ্রেণিতে পড়াকালীন একটি ছেলের সঙ্গে প্রেম হয়েছিল। তবে সেটা বেশিদিন স্থায়ী ছিল না। বর্তমানে পরিবারের সঙ্গে ঢাকার একটি ভাড়া বাসায় রয়েছেন তিনি।

করোনার কারণে এসএসসি পরীক্ষা না হওয়ায় দুই বছর পিছিয়ে যান। তরুণী বলেন, ২০১৯ সালের এক বান্ধবীর সঙ্গে ঘুরতে হাতিরঝিলের মধুবাগ ব্রিজে যান। সেখানে রিফাদুল ইসলাম হৃদয় ওরফে টিকটক হৃদয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়। এর কিছুদিন পর বসুন্ধরা সিটিতে বিক্রয়কর্মী হিসেবে চাকরির পরীক্ষা দিতে যান তিনি। সেখানে হৃদয়ের সঙ্গে দেখা হলে মোবাইল নম্বর ফেসবুক আইডি আদানপ্রদান করে তারা। ২০২০ সালে ওই তরুণী মৌচাকে একটি বুটিকশপে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ নেন। পরবর্তীতে হৃদয় তাকে প্রেমের প্রস্তাব দিলেও ম্যাসেঞ্জারে বন্ধু হিসেবে তাদের মধ্যে কথাবার্তা হতো। ওই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে হৃদয় ফতুল্লায় অ্যাডভেঞ্চার ল্যান্ডপার্কে ‘টিকটক হ্যাংআউট পার্টি’আয়োজন করে। ওই পার্টিতে যান তিনি। তখন হৃদয় তাকে বিদেশে ভালো বেতনে চাকরির প্রস্তাব দেয়।

চলতি বছরের ১৯শে ফেব্রুয়ারি হৃদয় জানায়, কুষ্টিয়ায় লালনের মাজার দর্শন এবং টিকটক পার্টির আয়োজন করে হৃদয়। কুষ্টিয়ার কথা বলে সাতক্ষীরায় নিয়ে যায় তাকে। সেখানে ছবি তোলার কথা বলে জোরপূর্বক সীমান্তে নিয়ে মেহেদি হাসান বাবু মহিউদ্দিনের সহায়তায় ভারতে পাচার করে দেয়। সময় একটি বাসায় নিয়ে সর্বপ্রথম বকুল হৃদয় মিলে প্রথমে তরুণীর ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়। ভয় দেখাতো কথা না শুনলে পুলিশে ধরিয়ে দেবে। অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের দায়ে ২০ বছরের সাজা হবে। সেখান থেকে বেঙ্গালুরু হয়ে চেন্নাইয়ের অহিও হোটেলে পাঠানো হয়। চক্রের সদস্য হৃদয়, সাগর সবুজ। যেতে রাজি না হলে মেরে মাথা ফাটিয়ে দেয় তারা। বাসায় ডাক্তার এনে চারটি সেলাই দেয়া হয়। চলে শারীরিক নিপীড়ন এবং নগ্ন ভিডিও ধারণ।

তরুণী বলেন, সাতক্ষীরা সীমান্ত হয়ে ভারতের ওপারে যাওয়ার পরই আমাকে একটি কার্ড দেওয়া হয়। সেটি ‘আধারকার্ড’ নামে পরিচিত। সেখানে আমার নাম লেখা ছিল কাজল। এর পর থেকে হৃদয়ের পরিচিত যাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে, তারা ওই নামে আমাকে ডাকত। সীমান্তের ওপারে দুই রাত একজনের বাসায় রাখা হয়। বাসার ভেতর অন্ধকার। প্রথমে প্রচ- ভয় পেয়ে যাই। যার বাসায় রাখা হয়েছিল, হৃদয় তাকে বলছিল- আমার সঙ্গে যেন ‘খারাপ’ কিছু করা হয়। এর পর কান্নাকাটি শুরু করি আমি। তবে ওই লোকের মন গলেনি। তখন বুঝলাম, ওরা এখন থেকে যা চাইবে আমাকে তা-করতে হবে। যে বাসায় রাখা হয়েছিল, সেখানে আরও একটি মেয়ে ছিল। আমি যাওয়ার এক দিন পর ওকে বেঙ্গালুরুতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরদিন আমাকেও পাঠানো হলো। একটি পাঁচতলা বাড়ির তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটে থাকতাম। বাইরে থেকে দরজা সব সময় বন্ধ করা থাকে। ওই ফ্ল্যাটে আরও অনেক মেয়ে ছিল। কয়েক দিন পরপরই তাদের আলাদাভাবে চেন্নাই, কেরালাসহ অনেক রাজ্যে পাঠানো হতো। ‘কাজের জন্য’ যখন অন্য রাজ্যে হোটেলে থাকার ডাক পড়ত, তখন সব মেয়ের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিত। সাধারণত ১০ থেকে ১৪ দিনের জন্য নেওয়া হতো। বেঙ্গালুরুর বাসা থেকে বের হওয়ার পর হোটেলে পৌঁছা পর্যন্ত ওদের লোক পাহারায় থাকত। হোটেলে থাকার সময় ঠিকমতো তিনবেলা খাবারও দেওয়া হতো না।

এখন কি করবেন জানতে চাইলে এই তরুণী বলেন, আবার নতুন করে পড়ালেখা শুরু করবো। না হলে কোথাও কাজের চেষ্টা করবো। তবে কম বয়সী তরুণীদের উদ্দেশ্যে বলবো, আবেগের তাড়নায় এবং অল্প দিনের পরিচয়ে কারো কথায় বিশ্বাস করে কোথাও যাবেন না। তাহলে আমার মতো ভয়াবহ সর্বনাশ হয়তো অপেক্ষা করছে।

বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের এডিসি হাফিজ আল ফারুক বলেন, টিকটক হৃদয়ের সঙ্গে আর কোনো বাংলাদেশি টিকটকার জড়িত কিনা সে বিষয়ে আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি। তাছাড়া ভারতে থাকা আরও যে ভুক্তভোগীরা রয়েছেন তারা কীভাবে সেখানে গিয়েছেন, এক্ষেত্রে আরও কেউ জড়িত আছে কিনা পুরো বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত তিন আসামির পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত।