Home কলাম পাবলিক টয়লেট: শতভাগ স্যানিটেশনে পূর্বশর্ত

পাবলিক টয়লেট: শতভাগ স্যানিটেশনে পূর্বশর্ত

136

-জিনাত আরা আহমেদ

অসংখ্য উন্নয়নের রূপকার জননেত্রী শেখ হাসিনা। এই উন্নয়নের রূপরেখায় নতুন মাত্রা দিয়েছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, যাকে বলে Sustainable Development Goal (এসডিজি)। রাষ্ট্রীয় নীতির সাথে এসডিজি’র সমন্বয়ে উন্নয়নের ধারা এগিয়ে চলেছে। এসডিজি’র ১৭টি গোলের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা অন্যতম। এসডিজির ৬ নম্বর অভীষ্টে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের কথা বলা আছে। এটা বলা বাহুল্য স্যানিটেশন হল সুস্বাস্থ্যের পূর্বশর্ত। আর স্যানিটেশন শতভাগ সফল করতে স্বাস্থ্যসম্মত পাবলিক টয়লেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের জন্য বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং পরিচ্ছন্ন পয়ঃনিষ্কাশন খুবই জরুরি বিষয়। স্যানিটেশনের ক্ষেত্রে খাবার আগে হাত ধোয়া এবং স্বাস্থ্যসম্মতভাবে খাবার গ্রহণ অর্থাৎ খাবার তৈরি ও পরিবেশনে সতর্কতা যেমন জরুরী তেমনি ব্যক্তিগত পয়ঃনিষ্কাশনে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার মাধ্যমেই স্বাস্থ্যবিধি পূর্ণতা পায়। মূলতঃ স্যানিটেশন হল প্রাণীর মলমূত্র, ময়লা পানি, এবং আবর্জনা পরিস্কার করার সঠিক উপায়। এর জন্য স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট জরুরি বিষয় । বাসাবাড়িতে টয়লেট ব্যবহারে যেমন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হয়, তেমনি কর্মক্ষেত্রে কিংবা মার্কেটে বা প্রয়োজনে বাইরে বের হলে দরকার স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট।

উন্মুক্ত জায়গায় মলত্যাগ বন্ধে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে স্বাস্থ্যকর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখনও চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। বাংলাদেশে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে ৫৫ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ। পয়ঃনিষ্কাশনের সঙ্গে শিশুর ডায়রিয়া ও খর্বকায়ত্বের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। অনুন্নত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে প্রদাহ ও কৃমির মতো সমস্যা দেখা দেয়। পানি, স্যানিটেশন ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা অস্বাস্থ্যকর হলে তা মানবদেহে বিভিন্ন ধরনের জীবাণুর সংক্রমণ ও ডায়রিয়ার ঝুঁকি তৈরি করে, যা পুষ্টিহীনতার জন্য দায়ী। বাংলাদেশে শতকরা ৮৪ ভাগ বিদ্যালয়ে টয়লেট থাকলেও সেগুলোর মাত্র ২৪ ভাগ উন্নত, ব্যবহারোপযোগী ও পরিচ্ছন্ন। তাছাড়া প্রতিবন্ধী শিশুদের ব্যবহার উপযোগী পয়ঃনিষ্কাশনে অবকাঠামোর অভাব রয়েছে।

মানুষের সুস্বাস্থ্য রক্ষায় বিশেষ করে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তির স্বাস্থ্যের জন্য পাবলিক টয়লেট অত্যন্ত জরুরি। পাবলিক টয়লেটের অপর্যাপ্ততার কারণে প্রতিনিয়ত মানুষ বিভিন্ন রকম স্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় ভুগছে।  দেশের মানুষের আর্থিক অবস্থার সাথে মিল রেখে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করা সরকারের প্রধান লক্ষ্য। ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ স্যানিটেশন নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। এই লক্ষ্য পূরণে বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। এসডিজি-৬ বাস্তবায়নে সরকার যেসব নীতি ও আইন অনুমোদন করেছে-এসবের মধ্যে রয়েছে পানিসম্পদ বিষয়ক জাতীয় নীতি ও কর্মপরিকল্পনা, পানি সরবরাহ ও প্রয়োজনীয় নর্দমা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ও পানি আইন।

বর্তমান শতাব্দীতে এসে  স্যানিটেশন বিপ্লব শুরু হয় এবং অল্পদিনের মধ্যেই পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। আমরা জাতি হিসেবে একটা বিষয়ে গর্ব করতে পারি সেটা হল, কোন বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তা পুরো জাতীয় চেতনাকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়- পোলিও নির্মূল কর্মসূচি, দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন, ডিজিটালাইজেশন-এরকম অসংখ্য উদ্যোগ আর সাফল্যের কথা। সরকারি নির্দেশনায় বিভিন্ন সেক্টরের সার্বিক সমন্বয়ের মাধ্যমে এমনটা সম্ভব হয়েছে।

এম ডি জি”র ৮টি গোলের মধ্যে স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন নিশ্চিত করা ছিল বর্তমান সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। এখন আমরা গ্রামে-গঞ্জে সবখানেই স্যানিটারি ল্যাট্রিন দেখতে পাই। এমডিজি-কে লক্ষ্যমাত্রা ধরে স্যানিটেশন বাস্তবায়নে প্রাথমিক অগ্রগতি মানসিকতায় বিপ্লব ঘটিয়েছে। এখন কেউই খোলামাঠে মলত্যাগের সেই আগের যুগে ফিরে যেতে চাইবে না । কিন্তু শহরে এবং গ্রামে উভয় জায়গাতে এখনও রাস্তার পাশে এবং খোলা জায়গাতে মূত্রত্যাগের অপ্রীতিকর দৃশ্য সভ্য সমাজের জন্য লজ্জাকর। তাই একথা বলা যায়, স্যানিটেশন পরিপূর্ণভাবে সফল হয়নি।

সার্বিকভাবে স্যানিটেশন সফল করে তোলার ক্ষেত্রে পাবলিক টয়লেটের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ করা সভ্য সমাজের পরিপন্থী। উন্নত দেশের পরিচয়  সুন্দর পরিবেশ এবং পরিচ্ছন্ন জীবাণুমুক্ত টয়লেট। আমাদের দেশে রাজধানী ঢাকাসহ নির্দিষ্ট কিছু শহরে এবং আধুনিক শপিংমলগুলোতে উন্নতমানের পাবলিক টয়লেটের ব্যবস্থা লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু এর বাইরে কোথাও তেমন ব্যবস্থা নেই। অথচ দূষণমুক্ত পরিবেশ সুস্বাস্থ্যের পূর্বশর্ত। এটাকে গুরুত্ব দেয়ার সময় এসেছে। জাতীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যাপকহারে পাবলিক টয়লেট স্থাপন এখন সময়ের দাবী।

শহরে, বানিজ্যিক কেন্দ্রে, বিপনিবিতানসহ  জনসমাগমের স্থানসমূহে এবং হাইওয়ের পাশে নির্দিষ্ট দুরত্বে স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট স্থাপন করা হলে দূষণমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। পাবলিক টয়লেটের ব্যবহার বিধি সব জনগনের মাঝে প্রচার করতে হবে। স্কুলের টয়লেট ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় কর্মী নিয়োগ করতে হবে। এক্ষেত্রে মূল্যায়ন হবে শিশুদের মতামতের ভিত্তিতে। শৈশব থেকে শিশু পরিচ্ছন্ন পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে উঠলে তা একসময় জাতীয় চেতনায় প্রতিফলিত হবে। তবে এটা স্থাপনের সাথে কিছু শর্ত দেয়া যেতে পারে। যেমন যত্রতত্র মূত্রত্যাগে জরিমানা আদায় এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, এক্ষেত্রে সিসিটিভি’র মাধ্যমে নজরদারী। তারপর টয়লেট ব্যবস্থাপনায় নামমাত্র মূল্য ধার্য করা, যা পরিচ্ছন্নতা কর্মী পাবেন। টয়লেট ব্যবহারের পর তিন ক্যাটাগরীতে মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকলে তা পরিচ্ছন্নতা কর্মীকে সবসময়ের জন্য দায়িত্বশীল রাখবে। ঢাকায় পাবলিক টয়লেট সমস্যার সমাধানে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু অত্যাধুনিক পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করা হয়েছে। এসব পাবলিক টয়লেট পরিবেশবান্ধব। ঢাকায় এমন পাবলিক টয়লেট খুঁজে দিতে দেশীয় প্রতিষ্ঠান প্রেনিউরল্যাব ও ওয়াটার এইড উদ্ভাবন করেছে ‘’ঢাকা পাবলিক টয়লেট অ্যাপ”। অ্যাপটির সাহায্যে যে কোন ব্যক্তি তার আশেপাশে থাকা টয়লেটের সন্ধান করতে পারবেন। অ্যাপটির সাহায্যে একজন ব্যবহারকারী পাবলিক টয়লেটের অবস্থান, অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবেন। সেখানে পরিচ্ছন্নতার অবস্থা, নারীদের উপযোগী কিনা, কয়টি রুম আছে, লাগেজ রাখার ব্যবস্থা আছে কিনা , খাবার পানির ব্যবস্থা, ব্যবহারের চার্জসহ প্রতিটি টয়লেটের প্রায় ১৯ ধরনের তথ্য জানতে পারবেন।

সাম্প্রতিক সময়ে করোনার বিস্তারে পরিচ্ছন্নতা যেন বেঁচে থাকার মূলমন্ত্র। সর্বস্তরের মানুষকে এটা ভাবতে বাধ্য করেছে স্যানিটেশনের বিকল্প নেই। করোনা পরিস্থিতি আমাদের সাবান দিয়ে হাত ধোয়া শিখিয়েছে, দূষণ থেকে রেহাই পেতে সবাই একযোগে মাস্ক ব্যবহার করছেন। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতায় মানুষ ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে।  স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ উপহার দিতে সর্বত্র পাবলিক টয়লেট স্থাপনের মাধ্যমে শতভাগ স্যানিটেশন নিশ্চিত করার তাই এটাই মোক্ষম সময়।

পিআইডি ফিচার ( লেখক : উপপ্রধান তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, খুলনা। সেল : ০১৬৭১৬০৮০৪১)