আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি প্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া সভিরিদেঙ্কোকে বরখাস্ত করার পর দেশটির পার্লামেন্টে নতুন সরকার গঠনের প্রস্তুতি চলছে। এ সপ্তাহেই এ বিষয়ে ভোট হওয়ার কথা রয়েছে।
জেলেনস্কি বলেছেন, সরকারের কাজে নতুন চিন্তা ও নতুন গতি আনতেই এই পরিবর্তন করা হচ্ছে। রবিবার (১২ জুলাই) এক ঘোষণায় তিনি জানান, মাত্র এক বছর দায়িত্ব পালনের পর সভিরিদেঙ্কোকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। তার এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের পর নতুন প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, তা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে।
তবে সমালোচকদের মতে, রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে এমন পরিবর্তন রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
এমন সময়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যখন ইউক্রেন রাশিয়ার আরো তীব্র হামলার মুখোমুখি হচ্ছে। সংসদ সদস্যরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া সভিরিদেঙ্কোর সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের মধ্যে রয়েছেন রাষ্ট্রায়ত্ত তেল ও গ্যাস কম্পানি নাফতোগাজের প্রধান সেরহি কোরেৎসকি, জ্বালানিমন্ত্রী দেনিস শ্মিহাল এবং বর্তমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভ। দেনিস শ্মিহাল এর আগে ছয় মাস প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এই তিনজনের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া সভিরিদেঙ্কোকে সরানোর ঘোষণা দেওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের সঙ্গে বৈঠকের ছবি প্রকাশ করেছেন। ইউক্রেনের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রী পদে একজনকে মনোনয়ন দেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার অধিকাংশ সদস্য নির্বাচন করেন। তবে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের সংসদের অনুমোদন পেতে হয়।
জেলেনস্কি বলেছেন, তিনি সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তন আনতে চান।
তার মতে, এর মাধ্যমে ইউক্রেন মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে আরো বেশি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাওয়ার প্রচেষ্টা জোরদার করতে পারবে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ অর্জনের লক্ষ্য এগিয়ে নিতে পারবে এবং আগামী শীতে রাশিয়ার সম্ভাব্য বিদ্যুৎ অবকাঠামো হামলার জন্য আরো ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে পারবে। ইউক্রেনের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল ও গ্যাস কম্পানি নাফতোগাজের প্রধান সেরহি কোরেৎস্কিকে অনেকেই নতুন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাব্য শীর্ষ প্রার্থী হিসেবে দেখছেন। তিনি নিয়োগ পেলে সরকারের নেতৃত্বে একজন অভিজ্ঞ প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসক আসবেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এতে রাশিয়ার হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত জ্বালানি অবকাঠামো পুনর্গঠন ও জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের ওপর আরো বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে। রুশ হামলায় ইউক্রেনের অনেক শহর ও জনপদ প্রায়ই বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
কিয়েভভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ভলোদিমির ফেসেঙ্কো বলেছেন, সরকার পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে সংকট মোকাবেলায় দক্ষ আরো কয়েকজন কর্মকর্তাও মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে পারেন। তাদের মধ্যে খারকিভের মেয়র ইহোর তেরেখভের নামও আলোচনায় রয়েছে। খারকিভ শহরটি নিয়মিত রুশ হামলার শিকার হয়।
বর্তমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভকেও প্রধানমন্ত্রীর জন্য শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি ইউক্রেনের যুদ্ধকালীন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তবে বিশ্লেষক ফেসেঙ্কোর মতে, ফেদোরভকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দিলে সেনাবাহিনীর চলমান গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। এ নিয়ে বিরোধী দলের কয়েকজন আইনপ্রণেতাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ইউক্রেন বর্তমানে দূরপাল্লার হামলা চালিয়ে রাশিয়ার তেল খাত ও সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভ জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সেনাবাহিনীর প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। জনবল সংকট মোকাবেলায় সেনা নিয়োগ ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।
বিরোধী দল হলোস পার্টির আইনপ্রণেতা ইন্না সোভসুন বলেছেন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনায় তিনি উদ্বিগ্ন।
ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘আগে দেনিস শ্মিহাল ছয় মাস মন্ত্রী ছিলেন। তিনি কিছু পরিকল্পনা শুরু করেছিলেন, কিন্তু পরে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। যদি মিখাইলো ফেদোরভের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে, তাহলে তা মোটেও ভালো হবে না।’
তার মতে, যুদ্ধ চলাকালে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে বারবার পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার ও সামরিক কার্যক্রমকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
যুদ্ধকালীন সরকারে নতুন রদবদলের পথে ইউক্রেন
ইউক্রেনে নতুন সরকার গঠনের জন্য সংসদীয় প্রক্রিয়া মঙ্গলবার থেকেই শুরু হতে পারে। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের ঘোষণা যুদ্ধ চলাকালে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে ধারাবাহিক রদবদলের সর্বশেষ উদাহরণ। এর আগে গত বছরের শেষ দিকে জেলেনস্কি দীর্ঘদিনের শীর্ষ কর্মকর্তা আন্দ্রি ইয়েরমাককে সরিয়ে জনপ্রিয় গোয়েন্দা সংস্থার এক প্রধানকে নিয়োগ দেন। ইয়েরমাক একটি বড় দুর্নীতি তদন্তের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার পর এই পরিবর্তন আনা হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের সময় সরকারে এসব পরিবর্তনের লক্ষ্য হলো প্রশাসনের কার্যকারিতা বাড়ানো এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নেতৃত্বকে আরো শক্তিশালী করা।
ইউক্রেনে চলমান তথাকথিত ‘মাইডাস’ দুর্নীতি তদন্তে বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নাম উঠে এসেছে। এই তদন্ত এখনো চলমান এবং তা প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
তবে কিয়েভ ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব সোসিওলজির তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে জেলেনস্কির প্রতি জনগণের আস্থা মোটামুটি স্থিতিশীল থেকেছে এবং তা প্রায় ৬০ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে। বর্তমানে ইউক্রেনে সামরিক আইন জারি থাকায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। ফলে নেতৃত্বে পরিবর্তন আনার জন্য মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন বা রদবদল জেলেনস্কির হাতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উপায়গুলোর একটি।
তবে বিরোধী দলের আইনপ্রণেতা ও সাবেক পার্লামেন্ট স্পিকার দিমিত্রো রাজুমকভ মনে করেন, এই পরিবর্তন বড় কোনো ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে না।
রয়টার্সকে তিনি বলেন, জেলেনস্কির প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই সীমিত সংখ্যক ঘনিষ্ঠ ও অনুগত ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে আসছে। তার মতে, বর্তমান রদবদলও মূলত একই ব্যক্তিদের মধ্যে পদ পরিবর্তনের ঘটনা।










































