খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে কৌশলগত দূরত্ব দৃশ্যমান হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও অন্যায়ের বিচারের দাবিতে দল দুটির মধ্যে কিছুটা ঐকমত্য থাকলেও আসন্ন স্থানীয় সরকার ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন, রাজনৈতিক কৌশল এবং রাজপথের ভূমিকার পার্থক্যকে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষের সম্পর্কে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতের একক লংমার্চ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে এনসিপির শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতি দেখা যায়নি, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গুঞ্জন রয়েছে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে অবস্থান তৈরি করার সিদ্ধান্ত এবং ক্ষেত্রবিশেষে নিজস্ব প্রভাব বিস্তারের মানসিকতাই এই দূরত্বের অন্যতম কারণ।
তবে এখনই কোনো আনুষ্ঠানিক দূরত্ব বা বিরোধের কথা মানতে নারাজ এনসিপি নেতারা। তাদের ভাষ্য, ফ্যাসিবাদের পতন, গণহত্যার বিচার এবং মৌলিক সংস্কার ইস্যুতে নীতিগত সংহতি থাকলেও এনসিপি একটি স্বতন্ত্র ও তরুণদের প্রতিনিধিত্বকারী দল হিসেবে নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করতে চায়।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক এবং এর অঙ্গ সংগঠন ‘জাতীয় নারীশক্তি’-র কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন বা ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে সমঝোতা নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক জোট বা আসন ভাগাভাগির চুক্তি হয়নি। জামায়াত তাদের মতো প্রস্তুতি নিচ্ছে, আর এনসিপি নিজেদের মতো এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে আসন সমঝোতা বা ছাড় দেওয়া-না দেওয়া নিয়ে জোটে ফাটল ধরার কথাটি সঠিক নয়।
তিনি আরও জানান, এনসিপিকে দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েই নেতাকর্মীরা মাঠে কাজ করছেন। সে জন্য সাংগঠনিক বিস্তার ও নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান নিশ্চিত করাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, এনসিপির সদস্য সচিব নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী সম্প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বিমুখী অবস্থান নিয়ে কথা বলেন। তার মতে, রাজপথের রাজনৈতিক বক্তব্য এবং বাস্তব কৌশলের মধ্যে অনেক সময় মিল খুঁজে পাওয়া যায় না।
তিনি বলেন, রাজপথের আন্দোলন এবং সংসদের কার্যক্রমের মধ্যে রাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। লংমার্চ কিংবা দলীয় কর্মসূচিতে সরকারবিরোধী কঠোর বক্তব্য দেওয়া হলেও সংসদে বিরোধীদলের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে নরম মনে হচ্ছে।
নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী আরো বলেন, রাজপথের বক্তব্যের সঙ্গে সংসদের কার্যক্রমের মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বাংলাদেশের জোট রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা তোষামোদি বা ‘জ্বি হুজুর’ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে চায় এনসিপি। জনগণের প্রত্যাশার প্রতি দায়বদ্ধ থেকে প্রয়োজনে জোটের শরিকদের ভুলও ধরিয়ে দিতে চায় দলটি।
এনসিপির এ নেতা আরও বলেন, এনসিপি একসময় মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। মাঝখানে সেই জায়গায় কিছুটা ঘাটতি তৈরি হলেও নতুন করে সেই অবস্থান ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। এক্ষেত্রে নিজেদের রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখা এবং জনগণের প্রত্যাশার প্রতি দায়বদ্ধ থাকাই এনসিপির মূল লক্ষ্য।
তবে জামায়াতের পক্ষ থেকে সম্পর্কের টানাপোড়েনের কথা উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বা প্ল্যাটফর্ম আলাদাভাবে অংশ নেওয়াটা স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। আলাদা প্রস্তুতি বা নিজস্ব কৌশল অবলম্বন করা কোনো বিরোধের লক্ষণ নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. সাব্বির আহমেদের মতে, এনসিপির মধ্যে নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যত বেশি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সম্ভব হবে, তত বেশি দলটির নেতাকর্মীদের জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। ফলে নির্বাচনে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করতে এনসিপি দরকষাকষি করবে, এটাই স্বাভাবিক। আর দরকষাকষি থেকেই দুই দলের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, জামায়াতের পক্ষেও বড় ধরনের ছাড় দেওয়া সহজ নয়। কারণ, দলটিরও নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তি, নেতাকর্মী ও নির্বাচনী প্রত্যাশা রয়েছে। তাদেরও স্থানীয় সরকার কাঠামোতে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। ফলে দুই দলের মধ্যে সমঝোতার ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।
সব মিলিয়ে জামায়াত ও এনসিপির সম্পর্ক এখন এক ধরনের রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি। সংসদ ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যুতে একসঙ্গে থাকলেও নির্বাচনী মাঠে নিজেদের শক্তি বাড়ানোর প্রশ্নে দুই দলের কৌশল ভিন্ন। প্রকাশ্যে কেউ জোটে ভাঙনের কথা স্বীকার না করলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে আসন সমঝোতা, নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা এবং রাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্য ভবিষ্যতে সম্পর্কের ওপর কতটা প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।











































