Home আন্তর্জাতিক বিক্ষোভ দমনে দিল্লিতে ইন্টারনেট শাটডাউনে চরম ভোগান্তি

বিক্ষোভ দমনে দিল্লিতে ইন্টারনেট শাটডাউনে চরম ভোগান্তি

3


অনলাইন ডেস্ক।।

ভোটার তালিকায় অনিয়ম এবং বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় কারচুপির অভিযোগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ভারতের রাজধানীতে দিল্লিতে বিক্ষোভ করছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)।

দলটির ডাকা ‘যন্তর মন্তর ২.০’ বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিজুড়ে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি বন্ধ করে দেওয়া হয় মোবাইল ইন্টারনেট। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন মানুষ।

ওয়াইফাই সুবিধা থাকা রেস্তোরাঁ, দোকান ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ছাড়া দিল্লির বাকি সব জায়গায় ডিজিটাল লেনদেন প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।

অন্যদিকে বিক্ষোভকারীরা শহরের অন্যান্য প্রান্তে থাকা বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করতে হিমশিম খান। কোনো ছবি বা ভিডিও পাঠাতে পারছিলেন না তারা। শহরের প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্রের অন্যতম ব্যস্ত দুটি রাস্তা জনপথ ও কর্তব্য পথের মোড়কে কেন্দ্র করে ৪ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকায় ইন্টারনেট বন্ধের এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ভৌগোলিক বিস্তৃতির দিক থেকে এটি ছিল ২০১৯ সালের নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন-বিরোধী প্রতিবাদের পর দিল্লিতে সবচেয়ে বড় ইন্টারনেট শাটডাউন।

ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় দিল্লিতে গিগ কর্মীদের (যেমন রাইড শেয়ারিং বা ডেলিভারি কর্মী) কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। কারণ অর্ডার নিতে বা শাটডাউন দেওয়া এলাকায় কোনো ডেলিভারি বা রাইড শেষ করে ফের কাজ শুরু করতে তাদের অনেকেরই মোবাইল ডেটার প্রয়োজন ছিল।

শাটডাউনের প্রভাব পড়েছে গুগল ম্যাপসের ওপরও। ট্রাফিক বিধিনিষেধ বা যানজটের কোনো হালনাগাদ তথ্য এতে দেখা যাচ্ছিল না। কারণ এর রিয়েল-টাইম আপডেট মূলত ব্যবহারকারীদের দেওয়া তথ্যের (ক্রাউডসোর্সড ডেটা) ওপর নির্ভরশীল।

বিকেল পর্যন্ত টার্ন-বাই-টার্ন নেভিগেশনে দেখা যায়, রুটগুলো লুটিয়েন্স দিল্লির চারপাশ দিয়ে অনেক বেশি ঘুরে যাচ্ছে। কারণ পুলিশ যেসব জায়গা ফাঁকা করে দিয়েছিল, সেখানেও উঠে যাওয়া বিধিনিষেধের তথ্য দ্রুত আপডেট করা যায়নি। এসব বিধিনিষেধের প্রয়োগেও অসামঞ্জস্যতা দেখা গেছে। একটি টেলিকম অপারেটরের কিছু গ্রাহক জানিয়েছেন, বিকেল গড়ানো পর্যন্ত তাদের ফোনে ইন্টারনেট সংযোগ ছিল।

ইন্টারনেট শাটডাউনের পাশাপাশি অনলাইনে খুব সম্ভব এক ধরনের সেন্সরশিপও আরোপ করা হয়েছিল। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে এর মাত্রা নির্ধারণ করা কঠিন ছিল। কংগ্রেসের সেবা দল-এর অ্যাকাউন্ট এক্স-এ আটকে (উইথহোল্ড) দেওয়া হয়। সেবা দলের প্রধান সংগঠক বি. ভি. শ্রীনিবাসের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট ভারতে করে দেয় মেটা। শ্রীনিবাস জানান, অ্যাকাউন্ট ব্লক করার এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে তিনি দিল্লি হাইকোর্টে যাবেন।

আইনি বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও ইন্টারনেট বন্ধের আদেশটি জনসমক্ষে প্রকাশ না করায় ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (আইএফএফ) এই শাটডাউনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। আইএফএফ বলেছে, ‘[সংবাদ সংস্থা] এএনআইয়ের শেয়ার করা বিজ্ঞপ্তিতে এই বিধিমালার ৩ নম্বর নিয়মের উল্লেখ করা হয়েছে। এই একই নিয়মে আদেশটি প্রকাশ করার কথাও বলা আছে। তবুও একে “টপ সিক্রেট” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা ভারত সরকারের ব্যবহৃত সর্বোচ্চ নিরাপত্তার শ্রেণিবিভাগ।’

আইএফএফ আরও বলেছে, ‘ইন্টারনেট বন্ধ করলে যে কোনো প্রতিবাদ নিরাপদ হয়ে যায়, তার কোনো প্রমাণ সরকার জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারেনি। বিদ্যমান গবেষণাগুলো এর বিপরীত কথাই বলে। স্ট্যানফোর্ডের গ্লোবাল ডিজিটাল পলিসি ইনকিউবেটরের তৎকালীন গবেষক ইয়ান রিদজাক ২০১৯ সালে ভারতে ইন্টারনেট বন্ধ ও প্রতিবাদ নিয়ে একটি গবেষণা করেন। সেখানে দেখা গেছে, অহিংস সমাবেশের চেয়ে সহিংস গণ-আন্দোলন বৃদ্ধির পেছনে ইন্টারনেট শাটডাউনের অনেক বেশি জোরালো সম্পর্ক রয়েছে।’

শনিবার সন্ধ্যা নাগাদ অন্তত আংশিকভাবে এই বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হয় এবং মধ্য দিল্লির কিছু অংশে ডেটা বা ইন্টারনেট সংযোগ পুনরায় চালু হয়।

এদিকে, বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে ব্যাপক ধরপাকড় চালায় পুলিশ। গতকাল শনিবার দিনভর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে সাত হাজারের বেশি আন্দোলনকারী ও বিরোধী দলের নেতা-কর্মীকে আটক করা হয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া তাদের এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে। বিক্ষোভের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে।

দ্য টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিরাপত্তাকর্মী ও পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি এবং হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে পৃথক এফআইআর করার প্রস্তুতি নিচ্ছে দিল্লি পুলিশ।

ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেস-এর নেতা রাহুল গান্ধী এই ধরপাকড়কে “কাপুরুষোচিত” পদক্ষেপ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত, সিইসি জ্ঞানেশ কুমার এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালকে এই ঘটনার “খলনায়ক” হিসেবে অভিহিত করেছেন।

কংগ্রেসের এমপি প্রিয়াঙ্কা গান্ধী সামাজিক মাধ্যমে অভিযোগ করে লিখেছেন, ‘ভারতে আর গণতন্ত্র নেই। এটি নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহ পরিচালিত একটি স্বৈরতন্ত্রে পরিণত হয়েছে।’

শনিবারের দমনপীড়নের পরেও বিক্ষোভ চালিেয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সিজেপি। সরকারের কঠোর নিষেধাজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ করে রবিবার (১১ অক্টোবর) ফের যন্তর মন্তর অভিমুখে যাত্রার ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।

সিজেপি জানিয়েছে, তাদের নেতা ও সমর্থকদের আটক করা হলেও তারা নির্ধারিত বিক্ষোভ কর্মসূচি চালিয়ে যাবে।

‘এক্স’ প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সিজেপি জানিয়েছে, অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা আটক থাকা পর্যন্ত দলের মুখ্য সংগঠক আজিঙ্কে শিন্ডে জন্তর মন্তরে ডাকা বিক্ষোভ কর্মসূচির নেতৃত্ব দেবেন।

এছাড়া সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির রাজপথ দখলের ডাক দিয়েছে বিরোধী দলগুলোর জোট ‘ইন্ডিয়া’।

‘সিইসি জ্ঞানেশ কুমারকে সরাতেই হবে এবং এ নিয়ে আপসের কোনো সুযোগ নেই’ জানিয়ে সোমবার (১২ অক্টোবর) দিল্লির রাজপথে বিশাল ‘প্রতিবাদ পদযাত্রা’র ডাক দিয়েছে কংগ্রেস ও মিত্র দলগুলো। একই সঙ্গে নির্বাচনী জালিয়াতি রুখতে দেশের সর্বোচ্চ আদালত অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির হস্তক্ষেপ চেয়ে স্মারকলিপি জমা দেয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।