Home আঞ্চলিক যে গ্রামে শিশুরা থাকে দুধেভাতে

যে গ্রামে শিশুরা থাকে দুধেভাতে

4

ডুমুরিয়া (ডুমুরিয়া) প্রতিনিধি।।

কাকডাকা ভোরে সূর্য ওঠার আগেই গোয়ালঘরে শুরু হয় মানুষের কর্মযজ্ঞ। গাভি ধোয়ামোছা, খড়-ভুসি আর খৈলের খাবার জোগানো, তারপরই শুরু হয় টাটকা দুধ দোহন। এরপর সাইকেল ও ছোট যানবাহনে করে সেই দুধ পৌঁছে যায় স্থানীয় বাজার কিংবা নামীদামি ডেইরি প্রতিষ্ঠানের সংগ্রহ কেন্দ্রে। আর গৃহিণীদের তোলা চুলায় দুধের সুবাস ছড়ায়—যা পরিবারের ছোটদের পুষ্টি জোগায়, সহজ কথায় যাদের শিশুরা বড় হচ্ছে ‘দুধেভাতে’।

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার মাগুরাঘোনা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী গ্রাম ‘চণ্ডীপুর’ এবং এর সংলগ্ন সাতক্ষীরার তালা উপজেলার ‘জেয়ালা’—এই দুই গ্রাম এখন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এক অনন্য সম্ভাবনার নাম। প্রতিটি ঘরে ঘরে উন্নত জাতের গাভি লালন-পালন ও বিপুল পরিমাণ দুধ উৎপাদনের কারণে স্থানীয়ভাবে গ্রাম দুটি খ্যাতি পেয়েছে ‘দুধ গ্রাম’ নামে।

ঘোষ পরিবার থেকে সার্বজনীন পেশা:

একসময় ডেইরি বা গাভি পালনের কাজ মূলত ঐতিহ্যবাহী ঘোষ পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, দুধ বিক্রির লাভজনক হিসাব দেখে এখন অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষও এতে আত্মনিয়োগ করেছেন। চণ্ডীপুর ও জেয়ালার দুই অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ অন্তত দুই শতাধিক পরিবার এখন পুরোদমে গাভি পালনকে প্রধান জীবিকা হিসেবে বেছে নিয়েছে। তাদের সাফল্য দেখে পাশের নলতা, আঠারোই ও আরনগর গ্রামের বাসিন্দারাও ঝুঁকছেন এই লাভজনক পেশায়।

সংসারের চাকা ঘোরাচ্ছে ডেইরি খামার:

চণ্ডীপুরের খামারি রিপন ঘোষের খামারে রয়েছে ৬টি বিদেশি জাতের গাভি। প্রতিদিন ২৫-৩০ লিটার দুধ বিক্রি করে প্রতি লিটার ৪৫ টাকা দরে মাসে তাঁর আয় প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। খরচের পর যা থাকে, তা দিয়েই বেশ স্বচ্ছলভাবে চলে চার সদস্যের পরিবার। আবার জেয়ালা গ্রামের বিক্রম ঘোষ ও তাঁর বাবার খামারে ৪৫টি গাভি থেকে প্রতিদিন গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ লিটার দুধ উৎপাদিত হয়।

খামারিরা জানান, অল্প জায়গায় অল্প ঝুঁকিতে ধান বা পলিচাষের চেয়ে গাভি পালন অনেক বেশি লাভজনক। দুধের আয়ে অনেকের জীবনে এসেছে অর্থনৈতিক ভিত্তি—পাকা ঘর, আসবাবপত্র, ফ্রিজ-টিভি থেকে শুরু করে যাতায়াতের জন্য মোটরসাইকেল। পরিবারের সন্তানদের পাতে মিলছে পুষ্টিকর টাটকা দুধ।

প্রতিদিন উৎপাদিত হয় ৮ থেকে ১০ হাজার লিটার দুধ:

স্থানীয় তথ্যমতে, জেয়ালার ১৬০টি পরিবারে প্রায় ১,৬৮৯টি এবং চণ্ডীপুরের ৪০টি পরিবারে প্রায় ৪১০টি গাভি রয়েছে। দুই গ্রাম মিলিয়ে প্রতিদিন আনুমানিক ৮ থেকে ১০ হাজার লিটার দুধ উৎপাদিত হচ্ছে। সকালে ও বিকেলে দোহনকৃত এই দুধ সংগ্রহ করে আকিজ ডেইরি, ব্র্যাক ডেইরি এবং মিল্ক ভিটার ডুমুরিয়া ও সাতক্ষীরার বিভিন্ন সেন্টারে পাঠানো হয়। শুধু দুধই নয়, গোবর থেকে ঘুঁটে বানিয়ে ও বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট বসিয়ে বিকল্প জ্বালানি ও বাড়তি অর্থ উপার্জন করছেন স্থানীয় নারীরা।

ঘাটতি, ভোগান্তি ও যোগাযোগের প্রতিবন্ধকতা:

বিপুল সম্ভাবনার মাঝেও খামারিদের রয়েছে নানা আক্ষেপ। ডেইরি কোম্পানিগুলো সপ্তাহে ১-২ দিন দুধ কেনা বন্ধ রাখায় প্রায়ই কম দামে স্থানীয় মিষ্টির দোকানে দুধ বিক্রি করে লোকসান গুনতে হয়। সংরক্ষণের জন্য নেই কোনো স্থানীয় হিমাগার বা আধুনিক ব্যবস্থা। তাছাড়া সহজ শর্তে ব্যাংকঋণ না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

সবচেয়ে বড় সমস্যা কাঁচা যোগাযোগ ব্যবস্থা। পাকা রাস্তা না থাকায় দুধের ভারী পাত্র কিংবা গো-খাদ্য পরিবহনে ছোট যানবাহনে অতিরিক্ত অর্থ ও শ্রম ব্যয় হয়, বিশেষ করে বর্ষাকালে যাতায়াত নরকযন্ত্রনায় রূপ নেয়। প্রাণিসম্পদ দপ্তরের নিয়মিত চিকিৎসাসেবা না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে খামারিদের।

আশ্বাস ও আগামী দিনের প্রত্যাশা:

এ বিষয়ে ডুমুরিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আশরাফুল আলম জানান, সীমাবদ্ধতা ও জনবল সংকট সত্ত্বেও খামারিদের বিনামূল্যে কৃমিনাশক, সংক্রামক ব্যাধির প্রতিষেধক টিকা, ঘাস কাটার মেশিন ও আনুষঙ্গিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে স্থানীয় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী আসগার লবি জানিয়েছেন, খামারিদের পণ্য সহজে বাজারজাত করার সুবিধার্থে চণ্ডীপুর ও জেয়ালা গ্রামের কাঁচা সড়কগুলো দ্রুত পাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে খামারিদের সব ধরনের সরকারি সুবিধা নিশ্চিত করা হবে।

সব বাধা পেরিয়ে প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই দুধের ঘ্রাণে জেগে ওঠে চণ্ডীপুর আর জেয়ালা। গাভির ডাক, সাইকেলের বেল আর খামারিদের কর্মব্যস্ততায় প্রতিদিন নতুন এক সম্ভাবনার সূর্য উদিত হয় এই ‘দুধ গ্রামে’।