Home বিনোদন প্রতিশোধ নাকি ক্ষমা, কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি সালমা

প্রতিশোধ নাকি ক্ষমা, কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি সালমা

2

বিনোদন ডেস্ক।।

কিছু ক্ষত শরীরে থাকে না, তবুও সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়। সময় তার ওপর প্রলেপ দেয়, স্মৃতিরা ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসে; কিন্তু হারানোর বেদনা আর প্রতিশোধের আগুন কখনও কখনও নিভে যায় না। বরং বছরের পর বছর নীরবে জ্বলতে থাকে মনের গহিনে। একদিন সেই অতীতই ফিরে আসে, দাঁড় করিয়ে দেয় পুরোনো ক্ষতের সামনে। তখন প্রশ্ন ওঠে— প্রতিশোধ কি সত্যিই যন্ত্রণা মুছে দিতে পারে, নাকি ক্ষমাই খুলে দিতে পারে মুক্তির দরজা? এমনই এক গভীর মানবিক দ্বন্দ্ব, ক্ষত ও মুক্তির গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে হলিউড সিনেমা ‘উইদাউট ব্লাড’।

ছবিটি পরিচালনা করেছেন প্রখ্যাত অভিনেত্রী ও নির্মাতা অ্যাঞ্জেলিনা জোলি। সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র নিনা। ছোটবেলার এক রক্তাক্ত অধ্যায় যার জীবনে রেখে গেছে গভীর ক্ষত। এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন মেক্সিকান অভিনেত্রী সালমা হায়েক। ইতালীয় লেখক আলেসান্দ্রো বারিকোর উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত সিনেমাটিতে কোনো নির্দিষ্ট সময় বা স্থান দেখানো হয়নি।

ছবির শুরুতেই দেখা যায়, প্রত্যন্ত এক এলাকায় চিকিৎসক ম্যানুয়েল রোকার বাড়িতে হামলা চালায় কয়েকজন সশস্ত্র ব্যক্তি। প্রতিশোধের নেশায় তারা হত্যা করে চিকিৎসক ও তাঁর পুত্রসন্তানকে। চিকিৎসকের ছোট্ট মেয়ে নিনা (সালমা হায়েক) মেঝের কাঠের তক্তার নিচে লুকিয়ে থাকার কারণে বেঁচে যায়। খুনিদের একজন টিটো মেয়েটিকে দেখেও তাকে ছেড়ে দেয়। অনেক বছর পর মধ্যবয়স্ক নিনা সেই টিটোকে (ডেমিয়ান বিচির) খুঁজে বের করে একটি রেস্তোরাঁয় মুখোমুখি বসেন। প্রতিশোধের জন্য আসা নিনা কি শেষ পর্যন্ত প্রতিশোধ নেবেন? নাকি দীর্ঘদিনের রক্তাক্ত স্মৃতিকে অন্যভাবে দেখার সুযোগ তৈরি হবে? সিনেমাটি সরাসরি কোনো সহজ উত্তর দেয় না। বরং প্রশ্ন তোলে– সহিংসতার প্রতিশোধ কি নতুন সহিংসতার জন্ম দেয়? একজন মানুষ কি নিজের অতীতের বন্দিদশা থেকে কখনও মুক্ত হতে পারেন?

‘উইদাউট ব্লাড’ সিনেমায় সালমা হায়েকের অভিনয় এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত বাণিজ্যিক সিনেমায় তাঁর প্রাণবন্ত ও শক্তিশালী উপস্থিতিই বেশি আলোচিত হয়। সিনেমায় নিনাকে খুব বেশি সংলাপনির্ভর না করে অভিব্যক্তি, শরীরী ভাষা ও নীরবতার মধ্য দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। চায়ের কাপ নাড়ানো, ধূমপান কিংবা দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকার মতো ছোট ছোট মুহূর্তেও অনুভব করা যায় তাঁর অতীতের ভার। তাই তো সমালোচকরাও সালমা হায়েকের অভিনয়ের দারুণ প্রশংসা করেছেন। অথচ সিনেমাটির শুরুতে সালমা এ চরিত্রে অভিনয় করতেই চাননি।

তাঁর ভাষায়, ‘আমি নিনা হতে চাইনি। আমি সেই আবেগের জায়গাগুলোয় যেতে চাইনি, যেখানে সে গিয়েছিল। এটা খুব কষ্টের। সিনেমায় অভিনয়ের পর আমার জীবনকে আবার আনন্দের জায়গায় নিয়ে আসতে অনেকটা সময় লেগেছে।’

শুধু মানসিক কষ্টই নয়, চরিত্রটির অভিনয় কৌশলগতভাবেও ছিল চ্যালেঞ্জিং। সালমা বলেন, ‘পুরো সিনেমায় নিনাকে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে থাকতে হবে কিন্তু কখনোই ভেঙে পড়া যাবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘যখন আমি বুঝতে পারলাম, চরিত্রের পরিস্থিতি আমার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হলেও আমি আসলে কোনো ব্যক্তিগত ট্রমার ভয় পাচ্ছিলাম। আসলে আমাদের নারীদের নানা ধরনের ট্রমা কাজ করে।’

পরিচালক হিসেবে অ্যাঞ্জেলিনা জোলির যুদ্ধ ও তাঁর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে কাজ করার আগ্রহ নতুন নয়। ‘ইন দ্য ল্যান্ড অব ব্লাড অ্যান্ড হানি’, ‘আনব্রোকেন’ ও ‘ফার্স্ট দে কিলড মাই ফাদার’-এর পর ‘উইদাউট ব্লাড’-এও তিনি ফিরে এসেছেন যুদ্ধের মানবিক পরিণতির গল্পে। তবে এবার যুদ্ধক্ষেত্রের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে যুদ্ধের পর মানুষের ভেতরে থেকে যাওয়া ক্ষত।

জোলি ও হায়েকের এটি অবশ্য প্রথম একসঙ্গে কাজ নয়। এর আগে মার্ভেল সিনেমা ইউনিভার্সের ‘ইটারনালস’ সিনেমায় দেখা গেছে দুজনকে। সেখানে তারা ছিলেন সহশিল্পী। ‘উইদাউট ব্লাড’-এ তাদের সম্পর্ক একেবারেই ভিন্ন। এবার একজন পরিচালক, অন্যজন তাঁর ছবির কেন্দ্রীয় অভিনেত্রী। ফলে ক্যামেরার সামনে অভিনয়ের পাশাপাশি ক্যামেরার পেছনেও তৈরি হয়েছে এক ভিন্ন ধরনের বোঝাপড়া।

এ ছবিতে হায়েকের চরিত্র নিনাকে পর্দায় বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে জোলির নির্দেশনা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। চরিত্রটির ভেতরের যন্ত্রণা, দীর্ঘদিনের ক্ষত ও প্রতিশোধের অনুভূতি প্রকাশে হায়েককে শুধু সংলাপের ওপর নির্ভর করতে হয়নি; বরং নীরবতা, চোখের দৃষ্টি, শরীরী ভাষা ও সূক্ষ্ম অভিব্যক্তির মধ্য দিয়ে আবেগ প্রকাশ করতে হয়েছে। এ জায়গাতেই পরিচালক হিসেবে জোলির সঙ্গে তাঁর সৃজনশীল বোঝাপড়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের জায়গা থেকেও জোলির ওপর আস্থা তৈরি হয়েছিল হায়েকের। কঠিন ও আবেগঘন দৃশ্যগুলো করতে গিয়ে যখন চরিত্রের মানসিক ভার তাঁকে চাপে ফেলেছে, তখন জোলির কাছ থেকে পাওয়া সমর্থনের কথাও বলেছেন তিনি। ফলে ‘উইদাউট ব্লাড’ তাদের আগের সহশিল্পী সম্পর্ককে যেন নতুন এক মাত্রা দিয়েছে। ‘ইটারনালস’-এ তারা ছিলেন একই গল্পের দুই অভিনেত্রী আর ‘উইদাউট ব্লাড’-এ তারা হয়ে উঠেছেন একজন নির্মাতা ও তাঁর অভিনেত্রীর সৃজনশীল সঙ্গী।

জোলির ভাষায়, নিনার চরিত্রে হায়েকের অভিনয় ছিল সাহসী ও রূপান্তরকারী। হায়েকের অভিজ্ঞতা বলছে, জোলির পরিচালনায় কাজ করার ক্ষেত্রে তিনি এমন এক স্বাধীনতা পেয়েছেন, যা তাঁকে চরিত্রের গভীরে যেতে সাহায্য করেছে। তাদের এ সহযোগিতা তাই শুধু একটি সিনেমা নির্মাণের সম্পর্ক নয়; বরং দীর্ঘদিনের পরিচয় ও পারস্পরিক আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি হওয়া এক সৃজনশীল যাত্রা।

অ্যাঞ্জেলিনা জোলির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সালমা হায়েক বলেন, ‘আমি কখনও শুটিং সেটে এতটা মূল্যায়িত বোধ করিনি।’ তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জোলি তাঁকে বলেছিলেন, ‘আমি তোমাকে তোমার চেহারার জন্য বাছাই করিনি; বাছাই করেছি তোমার অভিনয় ক্ষমতার জন্য।’

সালমা আরও জানান, এ সিনেমা করতে গিয়ে অনেক সময় তিনি হতাশ হয়ে পড়তেন। এমনও হয়েছে হতাশার কারণে মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে যেত। তখন উপায় না দেখে তিনি জোলিকে ফোন করতেন। তাঁর ভাষায়, ‘মাঝেমধ্যে এমনও হতো, আমি জোলিকে রাত ৩টার সময়ও ফোন করেছি। তখন জোলি আমার মানসিক অবস্থা বুঝতে পেরে কাছে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরত, আমায় সঙ্গ দিত।’

সিনেমাটি নিয়ে সালমা আরও বলেন, ‘‘উইদাউট ব্লাড’ দর্শকদের ভাবতে শেখাবে। কে ভালো, কে মন্দ– এটা প্রমাণের চেষ্টা না করে সত্যিকারভাবে সমাধানের দিকে মনোযোগ দিতে শেখাবে।”

২০২৪ সালের টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটির বিশ্ব প্রিমিয়ার হয়। উৎসবে ছবিটি নিয়ে সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া ছিল মিশ্র। কেউ কেউ সিনেমার বিষয়বস্তু ও দুই অভিনয়শিল্পীর পারফরম্যান্সের প্রশংসা করেছেন। আবার কারও মতে, যুদ্ধ, প্রতিশোধ ও ক্ষমার মতো বিষয়কে সিনেমাটি পুরোপুরি গভীরতায় নিয়ে যেতে পারেনি। তবে ‘উইদাউট ব্লাড’ সিনেমার মূল শক্তি হয়তো এর প্রশ্নেই যুদ্ধের শেষ কোথায়? বন্দুকের শব্দ থামার সঙ্গে কি যুদ্ধ শেষ হয়, নাকি মানুষের স্মৃতিতে তার আরেকটি অধ্যায় শুরু হয়?

৬০ বছরে পা দেওয়া সালমা হায়েক ২০২৬ সালে অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনা ও প্রযোজনাতেও ব্যস্ত সময় পার করছেন। দীর্ঘ অভিনয় ক্যারিয়ারে এবারই প্রথম বড় পর্দার চলচ্চিত্র পরিচালনা করতে যাচ্ছেন তিনি।

‘এরিনা’ নামের ছবির গল্পও তিনি নিজেই লিখেছেন এবং এতে অভিনয়ও করবেন। সিনেমাটির নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে যুক্ত হয়েছেন অ্যাঞ্জেলিনা জোলি। সিনেমাটিকে ‘মহাকাব্যিক রোমান্টিক অ্যাডভেঞ্চার’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এর গল্প আবর্তিত হয়েছে একটি নিষিদ্ধ প্রেম এবং ভালোবাসা ও কামনার শক্তিকে ঘিরে। সালমার ভাষায়, ‘এটি একটি নিষিদ্ধ প্রেমের গল্প এবং অন্য কাউকে গভীরভাবে জানার এক অন্তরঙ্গ যাত্রা। সিনেমার গল্পে মানুষের আবেগ ও অনুভূতির সঙ্গে প্রকৃতিরও গভীর সংযোগ দেখানো হবে।’ হলিউডের একাধিক গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, মেক্সিকোর কুইন্টানা রু ও ভেরাক্রুজ অঞ্চলে এর দৃশ্যধারণ হয়েছে। ফলে সিনেমার দৃশ্যপটেও প্রকৃতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

একদিকে অ্যাঞ্জেলিনা জোলির সিনেমায় অতীতের ক্ষত, প্রতিশোধ ও ক্ষমার গল্প; অন্যদিকে নিজের পরিচালানয় নিষিদ্ধ প্রেম, আকাঙ্ক্ষা ও নতুন অভিজ্ঞতার অনুসন্ধান। সালমা হায়েকের সাম্প্রতিক কাজের পরিধি যেন তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারের আরেকটি নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।