ঢাকা অফিস।।
সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন, কক্সবাজারের দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, পাহাড়-হ্রদ, সিলেটের চা-বাগান, নদী-জলাভূমি কিংবা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রত্নতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্য-প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের এমন বৈচিত্র্য বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনাকে বহুমাত্রিক করে তুলেছে। দেশের পর্যটন তাই শুধু কয়েকটি পরিচিত গন্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; প্রায় প্রতিটি অঞ্চলেই রয়েছে নতুন সম্ভাবনা।
এই সম্ভাবনাকে পরিকল্পিত, টেকসই ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক পর্যটন শিল্পে রূপ দেওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখে শুরু হয়েছে ১৩তম এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ার ২০২৬।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর আন্তর্জাতিক কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পর্যটনকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।
একই সঙ্গে জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান বর্তমান প্রায় ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৮ থেকে ৯ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যের কথা জানানো হয়। এবারের এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ারে ১০টি দেশের দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে। প্রায় ৩০০টি স্টলে বিভিন্ন পর্যটন গন্তব্য, পর্যটন পণ্য ও সেবা তুলে ধরা হচ্ছে। পাশাপাশি রয়েছে বিনিয়োগের সম্ভাবনাও।
আয়োজকরা জানান, এবারের মেলা শুধু পর্যটন প্রদর্শনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বন্ধুত্ব, ব্যবসা, বিনিয়োগ, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও আঞ্চলিক সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও মেলাটিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মেলায় পর্যটন গন্তব্য ও পণ্য প্রদর্শনের পাশাপাশি বি-টু-বি সেশন, সেমিনার, প্যানেল আলোচনা ও বিনিয়োগসংক্রান্ত বিভিন্ন আয়োজন রয়েছে।
উদ্বোধনী বক্তব্যে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে এগোতে হবে।
সরকার দেশের পর্যটন সম্ভাবনাকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনতে ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন আকর্ষণ নিয়ে একটি সমন্বিত পর্যটন মহাপরিকল্পনার কাজ করছে। এতে ইকো-ট্যুরিজম, অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম, ধর্মীয় পর্যটন এবং সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটনকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা শুধু প্রচলিত কয়েকটি গন্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের প্রায় প্রতিটি এলাকারই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও গল্প রয়েছে। এসব সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে বাংলাদেশকে আরও পরিচিত করাই সরকারের লক্ষ্য।
কক্সবাজারকে আঞ্চলিক পর্যটন হাব করার পরিকল্পনা
দেশের পর্যটন উন্নয়নে কক্সবাজারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ গন্তব্যকে একটি আঞ্চলিক পর্যটন হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।
পর্যটন খাতের নতুন নীতিতে বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন মন্ত্রী। এর মাধ্যমে পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন ও নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সরকার পর্যটনকে শুধু বিনোদন বা ভ্রমণের খাত হিসেবে দেখছে না; অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নের সঙ্গেও এ খাতকে যুক্ত করা হচ্ছে।
জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান বর্তমানে প্রায় ৩ শতাংশ। তা ৮ থেকে ৯ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারি-বেসরকারি খাত ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে গুরুত্ব
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পর্যটন খাতের উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পর্যটন অবকাঠামো, বিনিয়োগ, গন্তব্য উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পর্যটনকে তুলে ধরতে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী বলেন, সরকারি ও বেসরকারি খাতের যৌথ অঙ্গীকার ছাড়া পর্যটন খাতের কাঙ্ক্ষিত বিকাশ সম্ভব নয়। বাংলাদেশের পর্যটনকে বৈশ্বিক বাজারে নিতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখনই শুরু করি, কাল নয়।’
দেশের জন্য নিজেদেরই কাজ করতে হবে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টদের দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
পর্যটন উন্নয়ন সরকারের অঙ্গীকার
উদ্বোধনী বক্তব্যে নির্বাচনী ইশতেহারের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, পর্যটনের উন্নয়ন শুধু প্রশাসনিক অগ্রাধিকার নয়, এটি সরকারের অঙ্গীকারও। সরকারের লক্ষ্য উচ্চাভিলাষী হলেও সরকারি খাত, বেসরকারি খাত ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী একসঙ্গে কাজ করলে এসব লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।
পর্যটনকে বৈশ্বিক বাজারে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, বিনিয়োগ এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ারের মতো আয়োজন এ ক্ষেত্রে যোগাযোগ ও ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করছে।
১০টি দেশের দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠান ও প্রায় ৩০০টি স্টলের অংশগ্রহণে এবারের মেলায় পর্যটন পণ্য ও গন্তব্য প্রদর্শনের পাশাপাশি ব্যবসা, বিনিয়োগ ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রকৃতি, ঐতিহ্য ও মানুষের আতিথেয়তাকে কেন্দ্র করে পর্যটনের যে সম্ভাবনা রয়েছে, সেটিকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখে এগোচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান ৮ থেকে ৯ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যও সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধি, পর্যটন শিল্পের প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী, বিনিয়োগকারী, গণমাধ্যমকর্মী ও আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।











































