মিলি রহমান।।
উচ্চ রক্তচাপকে একসময় বয়স বাড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্যা বলেই মনে করা হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ধারণা বদলেছে। এখন কম বয়সীদের মধ্যেও রক্তচাপের সমস্যা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে তরুণীদের মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
অনিয়মিত জীবনযাপন, অস্বাস্থ্যকর খাবার, ওজন বেড়ে যাওয়া এবং নানা ধরনের নেশার অভ্যাস রক্তচাপের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সমস্যা হলো, উচ্চ রক্তচাপ অনেক সময় স্পষ্ট কোনো উপসর্গ ছাড়াই শরীরে ক্ষতি করতে থাকে। তাই কিছু শারীরিক পরিবর্তনকে হালকা করে না দেখে প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তচাপ পরীক্ষা করা জরুরি।
যে লক্ষণগুলো অবহেলা নয়
হঠাৎ বুক ধড়ফড় করা, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, চোখের সামনে অন্ধকার বা ঝাপসা দেখা কিংবা অস্বাভাবিক দুর্বলতা এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে সতর্ক হওয়া দরকার।
হাত-পায়ে অস্বস্তি বা পেশিতে টান ধরার মতো সমস্যাও বিভিন্ন কারণে হতে পারে। তাই শুধু এসব লক্ষণ দেখেই উচ্চ রক্তচাপ ধরে নেওয়া ঠিক নয়, প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বিশেষ করে বুকের ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, তীব্র মাথাব্যথা বা দৃষ্টির গুরুতর পরিবর্তনের মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
রক্তচাপের সমস্যা এক রকম নয়
উচ্চ রক্তচাপকে সাধারণভাবে প্রাইমারি বা এসেনশিয়াল এবং সেকেন্ডারি, এই দুই ধরনের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়। প্রাইমারি হাইপারটেনশনের পেছনে একক কোনো কারণ নাও থাকতে পারে। অন্যদিকে কিছু নির্দিষ্ট রোগ, ওষুধ বা শারীরিক অবস্থার কারণে সেকেন্ডারি হাইপারটেনশন হতে পারে।
রক্তচাপের মাত্রা নির্ধারণে শুধু একটি মাপের ওপর নির্ভর না করে একাধিকবার সঠিক পদ্ধতিতে মাপা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বয়স, শারীরিক অবস্থা ও অন্যান্য ঝুঁকির বিষয়ও বিবেচনায় রাখতে হয়।
ওজনের দিকে নজর দিন
ওজন বেড়ে গেলে উচ্চ রক্তচাপসহ নানা ধরনের শারীরিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। একইসঙ্গে ডায়াবেটিস, রক্তে কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। অতিরিক্ত লবণ, ভাজাভুজি, বেশি তেল-মসলাযুক্ত খাবার এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার কমিয়ে পুষ্টিকর খাবারে গুরুত্ব দেওয়া ভালো।
নিয়মিত শরীরচর্চা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
ব্যস্ততার কারণে অনেকেই নিয়মিত শরীরচর্চার সময় পান না। অথচ উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ও হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। হাঁটা, হালকা ব্যায়াম বা বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী অন্য কোনো ব্যায়াম দৈনন্দিন রুটিনে রাখা যেতে পারে। যাদের ইতোমধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা রয়েছে, তারা নতুন ব্যায়াম শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে ভালো।
গভীর শ্বাসের ব্যায়াম
মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমাতে ধীরে, গভীরভাবে শ্বাস নেওয়ার অনুশীলন অনেকের জন্য উপকারী হতে পারে। শান্ত জায়গায় বসে ধীরে শ্বাস নেওয়া এবং ধীরে ছাড়ার অভ্যাস শরীরকে কিছুটা শিথিল করতে সাহায্য করতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ হঠাৎ বেড়ে গেলে শুধু শ্বাসের ব্যায়ামের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। রক্তচাপ খুব বেশি হলে বা গুরুতর কোনো উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসা নেওয়াই জরুরি।
প্রাণমুদ্রা ও অপানমুদ্রা নিয়ে কী জানা দরকার?
যোগচর্চার অংশ হিসেবে প্রাণমুদ্রা ও অপানমুদ্রার মতো বিভিন্ন মুদ্রা অনুশীলন করেন অনেকে। এগুলো শান্তভাবে বসে মনোযোগ ও শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলনের সঙ্গে করা হয়। মানসিক প্রশান্তি বা শিথিলতার অনুভূতি দিতে পারে। এগুলোকে উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়। উচ্চ রক্তচাপ থাকলে নিয়মিত রক্তচাপ মাপা, জীবনযাপনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা এবং চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ থাকলে তা যথাযথভাবে গ্রহণ করাই গুরুত্বপূর্ণ।
সচেতনতাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা
উচ্চ রক্তচাপ অনেক সময় নীরবে শরীরে ক্ষতি করতে পারে। তাই বয়স কম বলে বিষয়টি অবহেলা করার সুযোগ নেই। স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা, ওজন নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তচাপ পরীক্ষা এই অভ্যাসগুলো দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। শরীরে অস্বাভাবিক কোনো উপসর্গ দেখা দিলে নিজে থেকে রোগ নির্ণয় না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।











































