মিলি রহমান।।
শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, বুক থেকে শোঁ শোঁ শব্দ হচ্ছে কিংবা দীর্ঘদিন ধরে কাশি এ ধরনের উপসর্গকে অনেকেই সরাসরি অ্যাজমার সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। কিন্তু সব সময় এর কারণ অ্যাজমা নয়।
কখনো কখনো এসব উপসর্গের পেছনে থাকতে পারে হার্টের বা ফেইলিউর। হৃদযন্ত্র ঠিকভাবে রক্ত পাম্প করতে না পারলে ফুসফুসে তরল জমতে পারে। এর ফলে শ্বাসকষ্ট, কাশি ও শোঁ শোঁ শব্দের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এই অবস্থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে অনেক সময় ‘কার্ডিয়াক অ্যাজমা’ বলা হয়।
তবে এটি প্রকৃত অর্থে অ্যাজমা নয়। কার্ডিওলজিস্ট ডা. বিনয় কুমার জানিয়েছেন, হৃদযন্ত্রের সমস্যার কারণে হওয়া এসব উপসর্গকে সাধারণ অ্যাজমা ভেবে ভুল করা বিপজ্জনক হতে পারে।
ডা. বিনয় কুমারের মতে, কার্ডিয়াক অ্যাজমা কোনো আলাদা ধরনের অ্যাজমা নয়। বরং হার্ট ফেইলিউরের কারণে তৈরি হওয়া শ্বাসকষ্টের একটি অবস্থা। বিশেষ করে হৃদযন্ত্রের বাম পাশ দুর্বল হয়ে গেলে ফুসফুসে রক্ত ও তরল জমতে শুরু করতে পারে। রাতে শুয়ে পড়লে এই সমস্যা আরও বেড়ে যেতে পারে। ফলে রোগীর শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, কাশি হয় এবং বুক থেকে শোঁ শোঁ শব্দ শোনা যেতে পারে। অর্থাৎ, উপসর্গগুলো দেখতে অ্যাজমার মতো হলেও মূল সমস্যা হতে পারে হৃদযন্ত্রে।
সাধারণ অ্যাজমা থেকে কিভাবে আলাদা
সাধারণ অ্যাজমার ক্ষেত্রে শ্বাসনালিতে সংকোচন বা স্প্যাজম তৈরি হয়।
ফলে বাতাস চলাচলের পথ সরু হয়ে যায় এবং শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার সময় শোঁ শোঁ শব্দ হতে পারে। অ্যালার্জি, পরাগরেণু, বায়ুদূষণ, ঋতু পরিবর্তন বা আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে অ্যাজমার সমস্যা বাড়তে পারে। আবার কিছু মানুষের ক্ষেত্রে কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াও শ্বাসনালি মাঝে মাঝে সংকুচিত হতে পারে। অন্যদিকে, কার্ডিয়াক অ্যাজমার মূল কারণ হলো হার্ট ফেইলিউর এবং ফুসফুসে তরল জমা হওয়া।
কার্ডিয়াক অ্যাজমার লক্ষণ
কার্ডিয়াক অ্যাজমার উপসর্গ সাধারণ অ্যাজমার সঙ্গে অনেকটাই মিলে যেতে পারে। ফলে অনেক সময় এটি সহজে শনাক্ত করা যায় না। লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া।
- বুক থেকে শোঁ শোঁ শব্দ হওয়া।
- দ্রুত শ্বাস নেয়া।
- দীর্ঘস্থায়ী কাশি।
- রক্ত মেশানো বা ফেনাযুক্ত কফ।
- শ্বাস নেওয়ার সময় অস্বাভাবিক শব্দ হওয়া।
- শুয়ে পড়লে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়া।
- রাতে ঘুম থেকে উঠে হাঁসফাঁস করে শ্বাস নেয়া।
- ফুসফুসে অস্বাভাবিক শব্দ শোনা
বিশেষ করে শ্বাসকষ্টের সঙ্গে পা ফুলে যাওয়া, বুকে অস্বস্তি বা ব্যথা কিংবা হৃদস্পন্দনের অনিয়ম থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। ডা. কুমারের পরামর্শ, এমন উপসর্গ থাকলে শুধু অ্যাজমা ধরে না নিয়ে হৃদযন্ত্র ঠিকভাবে কাজ করছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা উচিত।
কারা বেশি ঝুঁকিতে : যাদের হৃদরোগ বা হার্ট ফেইলিউরের ঝুঁকি বেশি, তাদের মধ্যে কার্ডিয়াক অ্যাজমার সম্ভাবনাও বেশি হতে পারে। ঝুঁকির কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- উচ্চ রক্তচাপ।
- ডায়াবেটিস।
- হৃদ্স্পন্দনের অনিয়ম।
- হাইপোথাইরয়েডিজম।
- অন্যান্য হৃদযন্ত্রের রোগ
সাবধানতা : কার্ডিয়াক অ্যাজমা যেহেতু হার্ট ফেইলিউরের সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখা গুরুত্বপূর্ণ। ডা. বিনয় কুমার হার্ট ভালো রাখতে যেসব পরামর্শ দিয়েছেন:
- রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা।
- নিয়মিত শরীরচর্চা করুন এবং সুষম খাবার খান।
- চিকিৎসকের দেয়া হৃদযন্ত্রের ওষুধ নিয়মিত সেবন করুন।
- নিজের ইচ্ছায় ডাইইউরেটিক, রক্তচাপের ওষুধ বা অন্য কোনো হার্টের ওষুধ বন্ধ করবেন না।
- হার্ট ফেইলিউর বা শরীরে পানি জমার সমস্যা থাকলে অতিরিক্ত লবণ এড়িয়ে চলুন।
- ধূমপান ও পরোক্ষ ধূমপান থেকে দূরে থাকুন।
- চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন।
- শ্বাসকষ্টকে হালকাভাবে নয়।
- শ্বাসকষ্ট, কাশি বা বুক থেকে শোঁ শোঁ শব্দ হলেই যে অ্যাজমা এমনটা ধরে নেয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে এসব উপসর্গের সঙ্গে পা ফুলে যাওয়া, বুকে ব্যথা বা অস্বস্তি, হৃদস্পন্দনের অনিয়ম কিংবা শুয়ে পড়লে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যা থাকলে হৃদযন্ত্রের পরীক্ষা করানো জরুরি। এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে সঠিক কারণ জানতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।











































