নড়াইল প্রতিনিধি।।
‘আমি বড় হয়ে ডাক্তার হতে চাই। চিকিৎসক হয়ে গরিব মানুষের সেবা করার পাশাপাশি আমার মতো অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে চাই। তবে বাবা-মা আমাকে মেডিক্যাল পড়াতে পারবেন কি না, জানি না। তাদের পক্ষে এত খরচ বহন করা কঠিন। তবু পরিশ্রম, শিক্ষকদের সহযোগিতা আর নিজের চেষ্টাতেই আজ এই ফল অর্জন করেছি।’ কথাগুলো বলছিল নড়াইলের মেধাবী শিক্ষার্থী পূজা বিশ্বাস (১৬)। চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় যশোর বোর্ডের অধীনে নড়াইল সদর উপজেলার কৃষ্ণলতা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে ১২৫০ নম্বরের মধ্যে ১২১০ পেয়ে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে সে। এটি এ বছর নড়াইল জেলার সর্বোচ্চ নম্বর।
পূজার বাড়ি নড়াইল সদর উপজেলার কলোড়া ইউনিয়নের নলদিচর গ্রামে। বাবা নৃত্য গোপাল বিশ্বাস পেশায় একজন কৃষক, মা দীপ্তি রানী বিশ্বাস গৃহিণী। ৫ শতাংশ জমির ওপর ছোট একটি বসতভিটাই পরিবারের একমাত্র সম্বল। কৃষিকাজ করেই চলে সাত সদস্যের সংসার। বছরের অধিকাংশ সময় অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করতে হয় পরিবারটিকে। সেই চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও থমকে যায়নি পূজার পড়াশোনা। তিন ভাই-বোনের মধ্যে পূজা সবার বড়। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি তার ছিল প্রবল আগ্রহ। বিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থী হওয়ার পাশাপাশি বাড়িতে সুযোগ পেলেই বই নিয়ে বসত সে। বিদ্যুৎ চলে গেলে কখনো চার্জলাইট, আবার কখনো কেরোসিনের বাতির আলোয় পড়েছে। শিক্ষক ও পরিবারের উৎসাহই তাকে এত দূর এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে।
এসএসসিতে জেলা সেরা ফল করলেও সামনে কলেজ, ভর্তি কোচিং এবং পরবর্তীতে মেডিক্যাল পড়াশোনার ব্যয় নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় পড়েছে পরিবারটি। পূজার বাবা নৃত্য গোপাল বিশ্বাস বলেন, ‘মেয়েটার মেডিক্যাল পড়ার খুব ইচ্ছে, আমিও তার স্বপ্ন পূরণ করতে চাই। কিন্তু এত খরচ মেটানো আমার পক্ষে অসম্ভব। সমাজের বিত্তবান মানুষ বা কোনো প্রতিষ্ঠান যদি পাশে দাঁড়ায়, তবেই হয়তো মেয়েটার স্বপ্ন সত্যি হতে পারে।’
মা দীপ্তি রানী বিশ্বাস বলেন, ‘অভাবের সংসার হলেও মেয়েকে কখনো পড়াশোনা ছাড়তে বলিনি। ও অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করেছে। এখন শুধু চাই, ও যেন লেখাপড়া চালিয়ে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারে।’ বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই প্রতিটি শ্রেণিতে সেরা ফল করে আসছিল পূজা। শিক্ষকদের পরামর্শ মেনে চলা ও নিয়মিত পড়াশোনার কারণে তাকে ঘিরে শুরু থেকেই শিক্ষকদের বড় প্রত্যাশা ছিল। কৃষ্ণলতা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সমীর গোলদার বলেন, ‘পূজা ১২৫০ নম্বরের মধ্যে ১২১০ পেয়েছে, যা পুরো জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ। আমাদের বিদ্যালয়টি প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত এবং পরিচালনা কমিটির সভাপতি বিদ্যালয়টি সম্পূর্ণ অবৈতনিক ঘোষণা করায় পূজার মতো গ্রামের অসচ্ছল মেয়েরা এখানে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। তার অদম্য চেষ্টা ও শিক্ষকদের আন্তরিকতার কারণেই আজ এই ঐতিহাসিক সাফল্য এসেছে।’ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি বিদ্যুৎ কুমার স্যার্নাল বলেন, ‘একটি প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকার বিদ্যালয় থেকেও যে কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে ঈর্ষণীয় ফলাফল অর্জন করা সম্ভব, পূজা বিশ্বাসের এই সাফল্য তারই প্রমাণ।’উল্লেখ্য, যশোর শিক্ষা বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, এ বছর নড়াইল জেলা থেকে মোট ৮ হাজার ২৬২ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে মোট ৪০৪ জন। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ৩৭০ জন, মাদ্রাসা বোর্ডে ১৬ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ১৮ জন জিপিএ ৫ অর্জন করেছে।











































