স্টাফ রিপোর্টার।।
খুলনা নগরীর টুটপাড়া এলাকার এক গৃহিণীর কয়েক দিন ধরে জ্বর। গত বুধবার পরীক্ষায় তাঁর ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। পরিবারের সদস্যরা তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে একাধিক হাসপাতাল ঘুরেও ভর্তি করতে পারেননি। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) এক হাসপাতালে শয্যা খালি হলে তাঁকে ভর্তি নেওয়া হয়।
টুটপাড়ার ওই গৃহিণীর স্বামী একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘আগের দিন হাসপাতাল ঘুরে ঘুরে রোগী ভর্তি করতে পারিনি। গত বুধবার সকালে গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে শুনি, শয্যা ফাঁকা নেই। পরে সময় নষ্ট না করে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে যাই। সেখানে গিয়েও প্রথমে শুনি, শয্যা ফাঁকা নেই। পরে খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারি, এক রোগীকে ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর রোগীকে ভর্তির সুযোগ পাই।’ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত ছয় দিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে খুলনার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫০৬ জন। বাস্তবে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি।
কারণ টুটপাড়ার ওই গৃহিণীর মতো অনেকে একাধিক বেসরকারি হাসপাতাল ঘুরেও শয্যা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। অবশ্য সরকারি হাসপাতালে শয্যা খালি না থাকলেও রোগী নেওয়া হচ্ছে। রোগীর বাড়তি চাপ থাকায় মেঝে কিংবা বারান্দায় রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এই রোগীদের বেশির ভাগই অপেক্ষাকৃত নিম্ন আয়ের মানুষ। খুলনা স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা গেছে, গত জুলাই থেকেই ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছিল। আগস্টের শুরু থেকে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে থাকে। সরকারি হিসাবে, গত শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৫০৬ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এই সময়ে কারও মৃত্যু হয়নি।
সরকারিতে ভিড়, বেসরকারিতে শয্যা খালি নেই: খুলনা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রফিকুল ইসলাম গাজী জানান, হাসপাতালে মেডিসিন বিভাগের দুটি ওয়ার্ডে শয্যা ২৫টি। সেখানে শুধু ডেঙ্গু রোগীই ভর্তি হয়েছেন ৬১ জন। হাসপাতালের ১১০টি শয্যার বিপরীতে চিকিৎসা নিচ্ছেন ১৬২ জন। জায়গা না থাকায় অনেককে ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে। রফিকুল ইসলাম বলেন, বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা ৮০ ভাগই জ্বর নিয়ে আসছেন। ডেঙ্গু শনাক্তকরণ কিট ও চিকিৎসা সামগ্রীর পর্যাপ্ত মজুত আছে। যারা আসছেন, তারা সবাই চিকিৎসা পাচ্ছেন।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মেডিসিন ওয়ার্ডে শয্যা ৪০টি। গতকাল সেখানে শুধু ডেঙ্গু রোগীই ছিলেন ১১৩ জন। জায়গা না থাকায় পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ডেও রোগী রাখা হচ্ছে। হাসপাতালের বারান্দা, মেঝেতেও রোগী রাখা হচ্ছে। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আখতারুজ্জামান জানান, রোগী বেশি হলেও চিকিৎসায় কোনো ঘাটতি হচ্ছে না। ওষুধ, কিট পর্যাপ্ত। রোগীর চাপ আরও বাড়লে নিচতলায় জরুরি বিভাগে পৃথক ইউনিট খোলার প্রস্তুতি আছে।
সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তথ্য সংগ্রহে গেলে অনুসন্ধান কেন্দ্রে কথা হয় গোবরচাকা এলাকার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার দশম শ্রেণিপড়ুয়া মেয়ে দুই দিন ধরে জ্বরে আক্রান্ত। পরীক্ষার পর বুধবার ডেঙ্গু ধরা পড়েছে। ভর্তির জন্য এখানে এসে শুনি, শয্যা ফাঁকা নেই। কোন হাসপাতালে নিয়ে যাব, সেটাই ভাবছি। খুব চিন্তা হচ্ছে।’
আক্রান্তের সরকারি তথ্য ও বাস্তবের মিল নেই: স্বাস্থ্য বিভাগের গতকালের প্রতিবেদনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে খুলনার সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ১৪১ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি পাঁচটি হাসপাতাল ঘুরে ১৮৯ জন রোগীকে চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে। গণনার বাইরে রয়েছে আরও অর্ধশত হাসপাতাল। এর মধ্যে শুধু খুলনা জেনারেল হাসপাতালেই ৬১ জন রোগী ভর্তি দেখা গেছে।
বেসরকারি সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে কোনো শয্যা ফাঁকা নেই। হাসপাতালের ২৫০ শয্যার প্রতিটিতেই রোগী। এর মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ৩৪ জন।
গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২০৪টি শয্যার সবই রোগীতে পূর্ণ। সেখানে ডেঙ্গু রোগী ছিলেন ৩৭ জন। ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের ৮০টি শয্যার একটিও ফাঁকা নেই। সেখানে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ২১ জন চিকিৎসাধীন। আদ্দ্বীন আকিজ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত ৩৫ জন চিকিৎসাধীন। অন্যান্য হাসপাতালেও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেশি। সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোস্তফা কামাল জানান, ডেঙ্গু ওয়ার্ডের ১৫টি শয্যার সব পূর্ণ। রোগীর চাপ বাড়ায় ১৯টি কেবিনে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি করা হয়েছে। এরপর শয্যা খালি না থাকায় প্রায় ১০ জন ফিরে গেছেন।
ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোকাররম বিল্লাহ আনসারী জানান, শয্যা খালি থাকলে কোনো রোগীই ফেরত দেওয়া হয় না। কিন্তু শয্যা ফাঁকা না হওয়ায় অনেক রোগী ফেরত যাচ্ছেন।
মশক নিধনে তৎপর কেসিসি: ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় বুধবার বিকেলে খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) নগর ভবনে জরুরি সভা হয়। সভায় মশক নিধন কাজ তদারকিতে তিনটি টিম গঠন করা হয়। নিয়মিত কর্মসূচির পাশাপাশি ক্রাশ প্রোগ্রাম চালু, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল এবং অপরিচ্ছন্ন বাড়ি ও স্থাপনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়।
এ ছাড়া জনসচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ, মাইকিংয়ের মাধ্যমে প্রচার, প্রতিদিন সকালে ও বিকেলে মশক নিয়ন্ত্রণ ওষুধ স্প্রে ও ফগিং করা, ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করা, কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে নিজ নিজ ওয়ার্ড এলাকার মশার প্রজনন স্থান চিহ্নিত ও ধ্বংসে জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ইমাম, পুরোহিত ও ফাদারদের মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কেসিসির প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ‘বুধবার কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরে পরিস্থিতির ভয়াবহতা দেখে আমরা আঁতকে উঠেছি। মেডিকেল কলেজ ছাড়া কোনো হাসপাতালে শয্যা ফাঁকা নেই। তাই বৃহস্পতিবার থেকে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা সর্বশক্তি নিয়োগ করেছি। এই কাজে আমরা নগরবাসী ও সরকারের সহযোগিতা চাই।’
সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি: নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় ডেঙ্গুর উপদ্রব বেড়েছে। মৌসুম আসার আগেই আমরা বারবার মশক নিধনে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি তুলেছিলাম। কিন্তু গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। যেটুকু মশক নিধন অভিযান চালানো হয়েছে, সেটিরও সুফল দেখা যাচ্ছে না।’
বাবুল হাওলাদার বলেন, কেন মশার ওষুধ কার্যকর হচ্ছে না, সেটি আগে খুঁজে বের করা দরকার। সেই সঙ্গে নিয়মিত নালা পরিষ্কার না করেই ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে কেসিসিকে নতুন করে পরিকল্পনা সাজানো প্রয়োজন।










































