Home Lead উগ্রবাদ কি আবার মাথাচাড়া দিচ্ছে?

উগ্রবাদ কি আবার মাথাচাড়া দিচ্ছে?

15

খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।


ঢাকার কেরানীগঞ্জ ও সাভারের বিভিন্ন এলাকায় তৈরি করা বিভিন্ন বোমার মধ্যে অন্তত ১০০টি ‘প্রেশার কুকার বোমা’ ছিল বলে দাবি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। এসব বোমার অধিকাংশই নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র।

পুলিশ বলছে, তাদের উদ্দেশ্য, একযোগে পুলিশ সদস্য কিংবা এমন কোনো প্রতিষ্ঠান অথবা জনবহুল স্থানে হামলা করা, যাতে দেশ ও সরকার বেকায়দায় পড়ে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রেশার কুকার বোমার বিষয়টি ঘিরে ঢাকা ও আশপাশের এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে খোদ পুলিশের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বোমাগুলো উদ্ধার করে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা না গেলে দেশের যেকোনো স্থানে বড় ধরনের নাশকতা ঘটতে পারে। কারণ এই প্রেশার কুকার বোমা দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়ে বড় ধরনের নাশকতা ঘটনা ঘটেছে।

এদিকে বুধবার (১২ আগস্ট) জঙ্গিবাদ দমন ও বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে সাভার মডেল থানায় করা মামলার তদন্ত চলে যাচ্ছে অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিও) এর হাতে। সিটিটিসির উদ্ধার করা আলামতসহ গ্রেপ্তার আরিফের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের বর্ণনাসহ এই মামলার সবকিছু যেকোনো সময় এটিওর কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছে সিটিটিসির দায়িত্বপ্রাপ্ত একটি সূত্র।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কারগার থেকে মুক্তি পাওয়া জঙ্গি সদস্যদের একছাতার নিচে আনতে নাজমুল হাসান মামুন ওরফে ‘বোমারু মামুন’ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করছিল। এ সময় তিনি ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকায় একটি মাদ্রাসায় আস্তানা গড়ে তোলেন। সেখানে অন্তত ৫৫টি বোমা তৈরি করেন। তার মধ্যে প্রেশার কুকার বোমা ছিল ২০টির মতো। গত ২৬ ডিসেম্বর ঢাকার কেরানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় বিস্ফোরণের ঘটনার পর তারা সাভারে আস্তানা গড়ে তোলেন। বড় ধরনের হামলার উদ্দেশ্যে সেখানে বসে তারা এসব বোমা তৈরি করেন।

সিটিটিসির এক উপ-পুলিশ কমিশনার বলেন, এখন পর্যন্ত সাভার ও আশুলিয়ায় পৃথক তিনটি এলাকা থেকে প্রেশার কুকার-সদৃশ দুটি শক্তিশালী বোমা এবং অন্তত ১৪টি পাইপ বোমা উদ্ধার করা হয়েছে। এ বোমা তৈরি হয়েছে এক হাতে। বিশেষ করে সাভারে বোমা নিষ্ক্রিয় করার পর অন্য রকম বার্তা লক্ষ করা যাচ্ছে। এই ধরনের বোমা তৈরির জন্য সামরিক প্রশিক্ষণ পাওয়া দক্ষ লোকের প্রয়োজন হয়। সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কেউ এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি।


তিনি আরও বলেন, বোমারু মামনু ১৭ বছর আগে থেকেই বোমা তৈরির দক্ষ কারিগর হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে আসে। এখন সাভারে বোমাটি নিষ্ক্রিয় করতে গিয়ে মনে হচ্ছে সে আরও দক্ষতা অর্জন করেছে। তার উদ্দেশ্য একযোগে পুলিশ সদস্য কিংবা এমন কোনো প্রতিষ্ঠান অথবা জনবহুল স্থানে হামলা করলে দেশ ও সরকার বেকায়দায় পড়ে।

গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, জঙ্গিরা দীর্ঘদিন ধরে গোপনে বিস্ফোরক তৈরির উপকরণ সংগ্রহ, বোমা তৈরির প্রস্তুতি এবং তা সংরক্ষণের কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। কেরানীগঞ্জ ও সাভারের বিভিন্ন এলাকায় এসব কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তাদের তৈরি করা বোমাগুলো সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। শুধু প্রেশার কুকার নয়, ফ্ল্যাক্স, স্টিলের জগসহ বিভিন্ন পাত্রে তারা বোমা তৈরি করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সিটিটিসির একটি সূত্র বলছে, পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বোমাগুলো বিভিন্ন স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আশুলিয়া ও সাভারে থাকা দুটি প্রেশার কুকার বোমার সন্ধান পাওয়ার পর তদন্তের পরিধি বাড়ানো হয়েছে। বাকি বোমাগুলো কোথায় রাখা হয়েছে এবং কার কার কাছে পৌঁছেছে, তা শনাক্তে কাজ করছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের এডিসি (ইনভেস্টিগেশন) মাঈন উদ্দীন চৌধুরী বলেন, শুধু বোমা উদ্ধারের বিষয়টি নয়, এগুলো কারা তৈরি করেছে, কোথায় তৈরি হয়েছে, কার নির্দেশনায় তৈরি করা হয়েছে এবং যাদের কাছে সরবরাহ করা হয়েছে, এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বোমাগুলো ব্যবহার করে কোনো নাশকতার পরিকল্পনা ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পুলিশের ফরওয়ার্ডিংয়ে নাশকতার পরিকল্পনার তথ্য

ঢাকার সাভারে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির সদস্যদের নাশকতার প্রস্তুতির অভিযোগে গ্রেপ্তার মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরানকে আদালতে পাঠিয়েছে পুলিশ। তার কাছ থেকে পাইপ বোমার ধ্বংসাবশেষ, বোমা তৈরির সরঞ্জাম, চাপাতি ও ছুরি উদ্ধারের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দক্ষিণ শ্যামপুরের একটি ভাড়া বাসায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ সন্দেহজনক রাসায়নিক পদার্থ, ডেটোনেটর, রিমোট-কন্ট্রোলার, বৈদ্যুতিক তারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। এসব ঘটনায় জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য আরিফকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে আদালতে রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে।

সাভার থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের করা মামলায় গ্রেপ্তার নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির সদস্য মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরানকে ছয় দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সোহাগ এই আদেশ দেন।

আদালতের সাভার জিআরও শাখার উপপরিদর্শক (এসআই) বাহাজ উদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, এদিন আদালতে তার পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। এর আগে তদন্ত কর্মকর্তা সাভার মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নুর মোহাম্মদ আসামিকে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের পুলিশ রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন।

পুলিশের ফরওয়ার্ডিং সূত্রে জানা গেছে, গত ১১ আগস্ট সন্ধ্যায় সিটিটিসির সাধারণ ডায়েরির সূত্র ধরে সাভার এলাকায় বিশেষ অভিযান চালানো হয়। ওই দিন সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টা ৫০ মিনিটে সাভার থানাধীন বাগবাড়ি থেকে ট্যানারীগামী রাস্তার শেষ মাথায় বিসিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্যানারি এস্টেটের পশ্চিম দেয়াল-সংলগ্ন বেড়িবাঁধে বটগাছের নিচে ১৩ থেকে ১৪ জনকে সন্দেহজনকভাবে অবস্থান করতে দেখা যায়।

পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তারা পালানোর চেষ্টা করে। এ সময় মোহাম্মদ আরিফকে আটক করা হয়। পুলিশের দাবি, অন্য ১২ থেকে ১৩ জন পালিয়ে যায়।

পুলিশের নথিতে বলা হয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আরিফ নিজেকে এবং পলাতক কয়েকজনকে নিষিদ্ধ ঘোষিত নব্য জেএমবির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে দাবি করেন। দেশকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে কথিত নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্যে তারা সেখানে সমবেত হয়েছিলেন বলেও তিনি তথ্য দিয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আরিফ বোমারু মামুনের সঙ্গে থেকে এ বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেছেন বলেও উল্লেখ করা হয়।

পুলিশের নথিতে আরিফের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নব্য জেএমবির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে মো. নাজমুল হাসান মামুন (৩২), মো. আব্বাস আলী (৩০), কামাল হোসেন ডাক্তার (৪৫), বাপ্পী (৩০) ও রাকিবের (৩০) নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে আরও কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির সম্পৃক্ততার কথাও বলা হয়েছে।

প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ দাবি করছে, গ্রেপ্তার আরিফ ও পলাতক ব্যক্তিরা নিষিদ্ধ ঘোষিত নব্য জেএমবির আদর্শ ও কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে কথিত নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতি বা পরিকল্পনার উদ্দেশ্যে সমবেত হয়েছিল। তবে এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে অধিকতর তদন্ত, জব্দ করা আলামতের বৈজ্ঞানিক ও ফরেনসিক পরীক্ষা এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।

এ ঘটনায় গ্রেপ্তার আরিফ, পলাতক এজাহারনামীয় আসামি এবং অজ্ঞাতনামা অন্যদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ (সংশোধনী-২০১৩)-এর ৬(২)/৮/৯/১৩ ধারায় মামলা করার প্রক্রিয়া নেওয়া হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

প্রেশার কুকার বোমা কী, কেন তা ভয়ংকর

প্রেশার কুকার বোমা একধরনের ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি), যা অতীতে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও একক হামলাকারীরা ব্যবহার করেছে। সাধারণ গৃহস্থালি সামগ্রী দিয়ে তৈরি করা সম্ভব হওয়ায় এগুলো শনাক্ত করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য দুরূহ হয়ে উঠেছে।

উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ঘটনার দিকে তাকালে প্রেশার কুকার বোমার ভয়াবহতার বিষয়ে জানা যায়—

২০০৬ সালে মুম্বাই ট্রেনে হামলা: ব্যস্ত সময়ে ধারাবাহিক প্রেশার কুকার বিস্ফোরণে ২০০ জনেরও বেশি নিহত হয় এবং ৭০০ জনেরও বেশি আহত হয়।

২০১১ সালে মারাকেশে হামলা: একটি ক্যাফেতে প্রেশার কুকার বোমা বিস্ফোরণে ১৭ জন নিহত হয় এবং ২৫ জন আহত হয়।

২০১৩ সালে বোস্টন ম্যারাথনে হামলা: দুটি প্রেশার কুকার বোমা বিস্ফোরণে ৩ জন নিহত হয় এবং ২৬০ জনেরও বেশি আহত হয়।

২০১৬ সালে নিউইয়র্কে হামলা: চেলসি এলাকায় প্রেশার কুকার বোমার বিস্ফোরণে ২৯ জন আহত হয়।

কেন এত প্রাণঘাতী

প্রেশার কুকার বোমার ঝুঁকি মূলত বিস্ফোরণের চাপ ও ধাতব টুকরা ছিটকে পড়ার কারণে হতাহত বেড়ে যায়। বিস্ফোরণের ফলে কুকারের ধাতব অংশ ও ভেতরে থাকা বিভিন্ন বস্তু দ্রুতগতিতে ছিটকে গিয়ে আশপাশের মানুষের গুরুতর আঘাতের কারণ হতে পারে। একই সঙ্গে সাধারণ রান্নার সামগ্রী হওয়ায় এগুলো সহজে আড়াল বা পরিবহন করা সম্ভব—যা নিরাপত্তার দিক থেকে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।

  • সু: এশিয়া পোস্ট