স্টাফ রিপোর্টার
নাব্য সংকট, ভাঙা ঘাট, নিরাপদ জেটির অভাব ও অবকাঠামোগত দুর্বলতায় দিন দিন কার্যক্ষমতা হারাচ্ছে খুলনা অঞ্চলের নদীবন্দরগুলো। খুলনা ও নওয়াপাড়া নদীবন্দরে কমে গেছে পণ্যবাহী জাহাজের আগমন, অর্ধেকে নেমে এসেছে পণ্য খালাস। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ঘাটশ্রমিক, ব্যবসায়ী ও নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে। দ্রুত ড্রেজিং, ঘাট সংস্কার ও আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন বন্দর ব্যবহারকারীরা।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান মাধ্যম নদীপথ। মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ভৈরব নদী হয়ে সার, কয়লা, পাথর, চালসহ বিভিন্ন পণ্য লাইটারেজ জাহাজে খুলনা ও নওয়াপাড়া নদীবন্দরে আনা হয়। এরপর সেখান থেকে এসব পণ্য খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। কিন্তু খুলনা নদীবন্দর এলাকার বিভিন্ন ঘাটে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ ভাঙন। কোথাও ঘাট ধসে পড়েছে, কোথাও জাহাজ ভেড়ানো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এরসঙ্গে রয়েছে পর্যাপ্ত জেটির অভাব, ওপেন ইয়ার্ডের সংকট এবং নদীর নাব্য কমে যাওয়ার সমস্যা। ফলে বড় পণ্যবাহী জাহাজ নিরাপদে ভিড়তে পারছে না। একই চিত্র নওয়াপাড়া নদীবন্দরেও। সেখানে অনেক জাহাজকে ঘাটের অপেক্ষায় ১০ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত নদীতে অবস্থান করতে হচ্ছে। ভাটার সময় পানির উচ্চতা কমে গেলে অনেক জাহাজ নদীর তলদেশে আটকে পড়ার ঘটনাও ঘটছে।
খুলনা বিভাগীয় নৌ-পরিবহন মালিক সমিতির পরিচালক আসিফ আহমেদ বলেন, ‘শুধু অবকাঠামোগত সংকটই নয়, মোংলা বন্দরে আমদানি কমে যাওয়ার প্রভাবও পড়েছে খুলনা অঞ্চলের নদীবন্দরগুলোতে।
গত দুই বছরে জাহাজ আগমন ও পণ্য খালাস প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে ব্যবসায়ীদের পরিবহন ব্যয় বেড়েছে এবং পণ্য খালাসে সময় বেশি লাগায় আর্থিক ঝুঁকিও বাড়ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘জাহাজ কমে যাওয়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে ঘাটশ্রমিকদের জীবনে। একসময় খুলনা ও নওয়াপাড়ার বিভিন্ন ঘাটে দুই হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে ৫০০ এর নিচে নেমে এসেছে। যাদের কাজ রয়েছে, তাদেরও মাসের অর্ধেক সময় কাটছে কর্মহীন অবস্থায় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। খুলনা নদীবন্দরের শ্রমিক মো. আলমগীর হোসেন বলেন, ‘ঘাটের অবস্থা খারাপ থাকায় এখানে এখন আগের মতো জাহাজ আসে না। গত দুই বছর ধরে এই অবস্থা চলছে। আগে প্রায় প্রতিদিনই জাহাজ আসত। এখন সপ্তাহ পার হয়ে যায়, কাজ মেলে না। পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে আছি।’ আরেক শ্রমিক মো. রুবেল শেখ বলেন, ‘আগে যে আয় হতো, এখন তার অর্ধেকও হয় না। অনেক সহকর্মী কাজ না পেয়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। আমরাও অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি।’
খুলনা অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন মালিক গ্রুপের মহাসচিব মফিজুর রহমান বলেন, ‘নদীপথে পণ্য পরিবহনের ওপর রাজস্ব বেড়েছে। অন্যদিকে ঘাট ও নদীর সক্ষমতা কমেছে। দ্রুত ড্রেজিং, নিরাপদ জেটি নির্মাণ, ঘাট সংস্কার এবং আধুনিক কার্গো হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ তবে খুলনা নদীবন্দর কর্তৃপক্ষের উপ-পরিচালক মো. মাসুদ পারভেজ বলেন, ‘নদীর নাব্য উন্নয়ন, অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং বন্দরের আধুনিকায়নে বিভিন্ন প্রকল্প ও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এসব বাস্তবায়িত হলে বন্দরের সক্ষমতা বাড়বে এবং জাহাজ চলাচল ও পণ্য খালাস কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে বলে আশা করা হচ্ছে।’
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ অর্থবছরে খুলনা নদীবন্দর থেকে প্রায় সাড়ে ১২ কোটি টাকা এবং নওয়াপাড়া নদীবন্দর থেকে ৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সংকট দ্রুত সমাধান না হলে নদীবন্দরগুলোর কার্যক্রম আরও সংকুচিত হবে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে।










































