স্পোর্টস ডেস্ক।।
দিদিয়ের দেশম ফুটবল ঈশ্বরের সেই বরপুত্র, যিনি কিনা খেলোয়াড় ও কোচ দুই ভূমিকায় জিতেছেন বিশ্বকাপ। ফ্রান্সের প্রথম প্রেম তিনি। দেশটির ফুটবলে বৈশ্বিক বেশির ভাগ অর্জনের সঙ্গে জড়িয়ে দেশম। তাঁর নেতৃত্বেই প্রথম বিশ্বকাপ জেতে ফ্রান্স ১৯৯৮ সালে। কোচের ভূমিকায় ছিলেন দ্বিতীয় শিরোপা জয়ে। বিশ্বকাপ ও মহাদেশীয় সাফল্যে মোড়া তাঁর কোচিং ক্যারিয়ার। লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে মাঠের কিংবদন্তি হলে দেশম ম্যানেজার রোলে ডাগআউটের রাজা। কোচিং ক্যারিয়ারের ১৪ বছরে চারটি বিশ্বকাপে ফ্রান্সের ডাগআউটে তিনি।
সেমিফাইনাল খেলছেন তিন বিশ্বকাপে। স্পেনকে হারিয়ে ফাইনালে উন্নীত হলেই রেকর্ডের বরপুত্র হিসেবে ফুটবলের ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে তাঁর নাম। তাই তো এই বিশ্বকাপে কিলিয়ান এমবাপ্পেদের একটাই লক্ষ্য– শিরোপা জিতে কোচের রাজকীয় বিদায় দেওয়া।
দেশমের ৫৭ আর এমবাপ্পে ২৭ বছরের হলেও সম্পর্কটা বন্ধুর মতোই। কিছুটা পিতা-পুত্রের টানও। ঠিক ১০ বছর আগে কিশোর এমবাপ্পেকে লিগের মাঠ থেকে তুলে এনেছিলেন দেশম। সেদিনের সেই কিশোরকে স্নেহের পরশ দিয়ে জাতীয় দলের জার্সিতে পরিচিতির মঞ্চ দেন। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ নেন এমবাপ্পে।
স্বাভাবিকভাবেই তাঁর কাছে পিতৃতুল্য হবেন দেশম। ১০টি বছর পিতার মতো ছাতা হয়ে ছায়া দিয়ে এমবাপ্পেকে লালন করা দেশমের সর্বোচ্চ সম্মাননা প্রাপ্য। ফ্রান্সের এই দলটি হয়তো কোচের জন্যই জিততে চাইছে বিশ্বকাপের মুকুট। আর দুটি ম্যাচ জিতলেই হবে সে লক্ষ্য অর্জন। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের খেলা চলাকালে মাকে হারান দেশম। মায়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে এসেছিলেন নকআউট ম্যাচের আগে। উসমান দেম্বেলের হ্যাটট্রিকে গ্রুপের শেষ ম্যাচটি ৪-১ গোলে নরওয়েকে হারিয়ে কোচকে উৎসর্গ করেছিলেন খেলোয়াড়রা। সেরা ৩২-এ সুইডেনকে ৩-০ গোলে হারায় ফ্রান্স।
এমবাপ্পে প্রথম গোল করে ডাগআউটে ছুটে গিয়ে আলিঙ্গন করেছিলেন কোচকে। জোড়া গোল করা অধিনায়ককে সেদিন টুপিখোলা অভিবাদন জানান দেশম। গুরু-শিষ্যের মধুর সম্পর্কের চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটেছিল সেদিন। প্রিয় কোচের উদ্দেশে ফ্রান্স অধিনায়ক বলেন, ‘যা-ই ঘটুক না কেন, সবাই একসঙ্গে থাকা এবং কোচের পাশে থাকাটা এই দলের ডিএনএর অংশ। আমরা তাঁকে এটি বোঝাতে চেয়েছিলাম যে তিনি একা নন।’
দেশম প্রতিনিয়তই প্রমাণ করে চলেছেন কেন তিনি রেকর্ডের বরপুত্র। এই ১৪ বছরের কোচিং ক্যারিয়ারে চার বিশ্বকাপের ২৫টি ম্যাচে অলংকৃত করেছেন ডাগআউট। এই রেকর্ডের শীর্ষে থাকা জার্মানির হেলমুট শনকে ছুঁয়েছেন তিনি। স্পেনের বিপক্ষে সেমিফাইনাল ম্যাচের ডাগআউটে দাঁড়ালেই ২৬টি ম্যাচ পরিচালনার একক কৃতিত্ব হবে তাঁর। বিশ্বকাপে ম্যাচ জয়ের সাফল্যের দিক থেকে সেরা তিনি। ২৫ ম্যাচে জিতেছেন ২০টিতেই। ব্রাজিলের মারিও জাগালো আর জার্মানির ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের পর তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে খেলোয়াড় ও কোচ দুই ভূমিকায় বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ড গড়া দেশম।
উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে ইতিহাস লেখা হবে নতুন আঙ্গিকে। টানা তিন বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলা বা দুই বিশ্বকাপ জেতা প্রথম কোচ হবেন তিনি। আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হলেও লিওনেল স্কালোনির রেকর্ড হবে জোড়া বিশ্বকাপ জয়ের।
তবে রেকর্ডের কথা ভাবনায় নেই দেশমের, ‘এই মুহূর্তে আমরা কেবল সেমিফাইনালে আছি। আমাদের আরও এক ধাপ যেতে হবে এবং এটি নিঃসন্দেহে খুব কঠিন হবে।’ গেল ২৮ বছরে সাফল্যে মোড়া ফ্রান্স আধুনিক ফুটবলের পরাশক্তি। এই সাফল্যের কারণ জানতে চাওয়া হলে কোচ বলেন, ‘আমি জানি না, আমার ধারণা, খুব ভালো খেলোয়াড় থাকাটাই এর কারণ।’
এ বছর জানুয়ারিতেই দেশম ঘোষণা দিয়েছেন ফ্রান্স জাতীয় দলের সঙ্গে এটি শেষ বিশ্বকাপ তাঁর। শিরোপা জিতে রাজকীয় বিদায়ের কথা ভাবছেন না তিনি, ‘আমি জাঁকজমকের সঙ্গে সামনের দরজা দিয়ে বিদায় নেওয়ার কথা ভাবছি না। দলীয় স্বার্থই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’ এ কারণেই বোধ হয় বিশ্বসেরা কোচ তিনি।









































