আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
ঘূর্ণিঝড় ‘বাভি’ শনিবার (১১ জুলাই) গভীর রাতে পূর্ব চীনের উপকূলীয় শহর তাইঝৌতে আঘাত হেনেছে। এর আগে এটি জাপানের দক্ষিণের সাকিশিমা দ্বীপপুঞ্জে তাণ্ডব চালিয়ে উত্তর তাইওয়ানের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে।
ঝড়টি চীনের উপকূলে পৌঁছানোর আগেই ব্যাপক প্রস্তুতি নেয় কর্তৃপক্ষ। শুধু তাইঝৌ এলাকাতেই প্রায় ২০ লাখ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। চীনের জাতীয় আবহাওয়াকেন্দ্র জানিয়েছে, স্থানীয় সময় শনিবার রাত প্রায় ১১টা ২০ মিনিটে ঘূর্ণিঝড়টি তাইঝৌতে আঘাত হানে। তখন ঝড়টির সর্বোচ্চ স্থায়ী বাতাসের গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ১৪৪ কিলোমিটার।
এই গতিকে সাফির-সিম্পসন স্কেলে প্রথম শ্রেণির হারিকেনের সমান ধরা হয়। আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, উত্তর-পশ্চিম দিকে এগোতে গিয়ে বাভির গতি কিছুটা কমছে এবং এটি ধীরে ধীরে দুর্বল হচ্ছে। তবে ঝড়টি এখনো বড় ধরনের হুমকি হয়ে রয়েছে। কারণ এর সঙ্গে থাকা বিশাল বৃষ্টির মেঘে বিপুলপরিমাণ জলীয় বাষ্প রয়েছে।
বৃষ্টির এই বিস্তৃত এলাকা প্রায় পুরো ফ্রান্সের সমান বড়। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, তাইঝৌ যে ঝেজিয়াং প্রদেশে অবস্থিত, সেখানে ১৭ লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পাশের ফুজিয়ান প্রদেশে এক লাখের বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বেইজিং থেকেও এক লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সাংহাই থেকে প্রায় ৩৪ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ঝড়ের আগে ওয়েনঝৌ শহরের ৫০ বছর বয়সী বাসিন্দা হুয়াং শিংহুয়ান একটি ঐতিহ্যবাহী কাঁচাবাজারে গিয়ে পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনে রাখেন। তিনি বলেন, কিছুটা উদ্বেগ থাকলেও তিনি বিশ্বাস করেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে। অতীতেও তারা একাধিক ঘূর্ণিঝড়ের মুখোমুখি হয়েছেন এবং এবারও তা মোকাবেলা করতে পারবেন। হুয়াং জানান, তার পরিবার দুই থেকে তিন দিনের জন্য পর্যাপ্ত খাবার ও পানির ব্যবস্থা করেছে। তার মতে, আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত খাবার বা অন্য জিনিস মজুদ করার কোনো প্রয়োজন নেই।
এদিকে এখন পর্যন্ত জাপান ও তাইওয়ানে ঘূর্ণিঝড় বাভির কারণে কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। তবে ঝড়ের প্রভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠা দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বৃষ্টিতে ফিলিপাইনে অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাইওয়ানের দমকল বিভাগ জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সেখানে অন্তত ১১৩ জন আহত হয়েছেন। আহতদের বেশির ভাগই প্রবল বাতাসে মোটরসাইকেল বা সাইকেল থেকে পড়ে গেছেন। এ ছাড়া গাছের ডাল বা উড়ে আসা বিভিন্ন বস্তু আঘাত করেও অনেকে আহত হয়েছেন। ঘূর্ণিঝড়টি তাইওয়ানের উত্তর দিক দিয়ে অতিক্রম করায় পুরো দ্বীপজুড়ে স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। পাহাড়ি এলাকাগুলো থেকে ১৪ হাজারের বেশি মানুষকে আগেই নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। যদিও বাভি সরাসরি তাইওয়ানে আঘাত হানেনি, তবুও কিছু এলাকায় এক মিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা থাকায় সরকার আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া মানুষের বেশির ভাগই উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দা। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে ৯২০টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এতে রাজধানী তাইপের বাইরে অবস্থিত তাওইউয়ান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। পাশাপাশি দেশের সব ২৮২টি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটও বাতিল করা হয়। শনিবার তাইওয়ানের প্রায় সব শহর ও কাউন্টিতে ঘূর্ণিঝড়ের ছুটি ঘোষণা করা হয়। এর ফলে সরকারি অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সপ্তাহান্তে খোলা থাকার কথা ছিল এমন অনেক সরকারি সেবাকেন্দ্র বন্ধ রাখা হয়। তবে রাজধানী তাইপেতে কিছু রেস্তোরাঁ ও পণ্যের দোকান খোলা ছিল। দেশটির উত্তর-দক্ষিণ উচ্চগতির রেল চলাচল চালু থাকলেও সীমিত সংখ্যক ট্রেন পরিচালনা করা হয়েছে। প্রবল বাতাস ও বৃষ্টির মধ্যেও তাইপের কিছু এলাকায় মানুষকে বাইরে চলাফেরা করতে দেখা যায়।
৬৮ বছর বয়সী ইয়ে মাও-শিয়ুং সকালে নিজের কুকুর নিয়ে হাঁটতে বের হন। তিনি বলেন, পরিস্থিতি খুব বেশি ভয়াবহ নয়, শুধু বাতাসের গতি কিছুটা বেশি। তবে তাইপের উপকণ্ঠের বেইতো এলাকায় ঘণ্টায় প্রায় ১০০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া বয়ে যায়। এতে বেশ কয়েকটি গাছ উপড়ে পড়ে এবং আশপাশের নদীগুলোর পানির স্তর বেড়ে যায়। অন্যদিকে ওয়েনঝৌ শহরের ষাটোর্ধ্ব বাসিন্দা চেন চিউছিন টানা বৃষ্টির মধ্যেই তার বয়স্ক বাবা-মায়ের বাড়িতে রওনা হন। ঘূর্ণিঝড়ের প্রস্তুতিতে তাদের সাহায্য করতেই তিনি সেখানে যাচ্ছিলেন।









































