Home আলোচিত সংবাদ বিশ্বকাপ উন্মাদনায় দেশজুড়ে ঝরল ১১ প্রাণ

বিশ্বকাপ উন্মাদনায় দেশজুড়ে ঝরল ১১ প্রাণ

8


স্পোর্টস ডেস্ক:

ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে পুরো দেশ যখন উৎসবের আমেজে মাতোয়ারা, ঠিক তখনই এই আনন্দের আড়ালে দানা বাঁধছে এক উদ্বেগজনক ও ভয়ঙ্কর সহিংসতা। প্রিয় দলের জয়-পরাজয় কিংবা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি, মারামারি, ছুরিকাঘাত এবং নির্মম হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটছে। কোথাও পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে, কোথাও বিজয় শোভাযাত্রার সড়ক দুর্ঘটনায়, আবার কোথাও অতিরিক্ত উচ্ছ্বাসের কারণে হার্ট অ্যাটাকে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। বিশ্বকাপ উন্মাদনার জেরে দেশে এ পর্যন্ত অন্তত ১১ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খেলাকে স্রেফ বিনোদনের উপকরণ হিসেবে না দেখে অতিরিক্ত আবেগতাড়িত হয়ে পড়ার কারণেই দেশজুড়ে এই রক্তক্ষয়ী ও প্রাণঘাতী পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।

তুচ্ছ বিতর্কে নৃশংস খুন ৪ জন
সবশেষ গত ৭ জুলাই রাতে কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার ধনপুরে আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচ চলাকালে মেসি পেনাল্টি মিস করায় উল্লাস প্রকাশ করেন শরিফুল ইসলাম (৩৫) নামের এক অটোচালক। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে স্থানীয় আর্জেন্টিনা সমর্থকরা তাকে দুই দফায় নির্মমভাবে মারধর করলে তিনি মারা যান।

এর আগে গত ১ জুলাই রাজধানীর আদাবরে খেলা দেখার সময় বাঁশি বাজানোকে কেন্দ্র করে আবুল বাশার বাদশা নামে এক বিএনপি নেতাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। একই রাতে সিলেটের জকিগঞ্জে চিৎকার করাকে কেন্দ্র করে চাচাতো ভাইয়ের ছুরিকাঘাতে খুন হন আলম আহমদ (২৮) নামের এক যুবক। এছাড়া আশুলিয়ায় ব্রাজিল-জাপান ম্যাচকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে নাহিদ হাসান নামে এক কিশোরকে ছুরিকাঘাতের পর বালুচাপা দিয়ে হত্যার লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে।

পতাকা টাঙাতে গিয়ে প্রাণ গেল ৩ ছাত্র-তরুণের
প্রিয় দলের আকাশচুম্বী ভালোবাসা দেখাতে গিয়ে অসচেতনভাবে পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুতায়িত হয়ে অকালে ঝরে গেছে ৩টি প্রাণ। গত ১৯ জুন ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে ব্রাজিলের পতাকা টাঙাতে গিয়ে মাহিন শেখ নামের এক স্কুলছাত্র, ১৫ জুন চট্টগ্রামে আর্জেন্টিনার পতাকা টাঙাতে গিয়ে রামহরি বৈষ্ণব এবং ৯ জুন মানিকগঞ্জে ব্রাজিলের পতাকা টাঙাতে গিয়ে ফয়সাল (১৮) নামের এক তরুণ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান।

অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস ও দুর্ঘটনায় আরও ৪ মৃত্যু
গত ৭ জুলাই মিশরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার নাটকীয় জয়ের পর অতিরিক্ত আনন্দ ও হার্ট অ্যাটাকে ঝিনাইদহের শৈলকুপার রসুল উদ্দীন (৪০) নামের এক ভ্যানচালকের মৃত্যু হয়। ৩ জুলাই চট্টগ্রামে গোলপোস্ট ভেঙে মাহিদুল ইসলাম (২০) নামে এক তরুণ এবং নড়াইল ও ভোলার বোরহানউদ্দিনে কিশোরদের খেলা ও শোভাযাত্রার সংঘর্ষ ও সড়ক দুর্ঘটনায় আরও ২ জন নিহত হন।

ক্যাম্পাস ও বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় সংঘর্ষ
খেলার উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও। গত ৭ জুলাই রাতে টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচ ঘিরে শিক্ষার্থীদের দফায় দফায় সংঘর্ষে সহকারী প্রক্টরসহ ১০ জন আহত এবং একাডেমিক ভবন ভাঙচুর করা হয়। একই রাতে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রামের মীরসরাইয়েও দুই পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।

ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ও সমাজবিজ্ঞানীদের আহ্বান
বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে এই অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানি ও সহিংসতায় তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক। জাতীয় সংসদে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, “ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাকে ঘিরে যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা যেন কেবলই আনন্দময় থাকে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন সহিংসতার রূপ না নেয় এবং দেশে যেন আর একটিও প্রাণনাশের ঘটনা না ঘটে।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, “খেলা বিনোদনের অংশ এবং এতে জয়-পরাজয় থাকবে—এটি মেনে নেওয়ার মানসিকতার তীব্র ঘাটতি রয়েছে আমাদের। জাতিগতভাবেই আমরা কোনো ক্ষেত্রে হার-জিত স্বাভাবিকভাবে নিতে পারি না। সংঘর্ষ এড়াতে সকলকে এই উগ্র আবেগ থেকে বেরিয়ে এসে অবিলম্বে সচেতন হতে হবে।”