সুন্দরবন—বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদাপ্রাপ্ত এই বন কেবল প্রাকৃতিক সম্পদের ভাণ্ডারই নয়, উপকূলীয় হাজারো মানুষের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। অথচ সেই সুন্দরবনেই আজ বিরাজ করছে ভয়, অনিশ্চয়তা আর বেঁচে থাকার সংগ্রাম। বনদস্যুদের একের পর এক অপহরণ ও মুক্তিপণের ঘটনায় জেলেরা মাছ ধরা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন। দুবলার চরসহ দক্ষিণাঞ্চলের শুঁটকি পল্লীর দশ সহস্রাধিক জেলে সাগরে না গিয়ে চরে বসে দিন কাটাচ্ছেন—এ এক গভীর মানবিক সংকট।
মাছ ধরা বন্ধ মানেই শুধু আয় বন্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবার-পরিজনের আহার, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ। মৌসুমের শেষ সময়ে এসে আয়হীন হয়ে পড়া জেলেদের হতাশা ও দুশ্চিন্তা সহজেই অনুমেয়। বনদস্যুদের হাতে অপহৃত জেলেদের খোঁজ না মেলা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। আহত জেলেদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবর প্রমাণ করে, বিষয়টি কেবল গুজব বা আতঙ্ক নয়—বাস্তব ও নির্মম।
আরও উদ্বেগের বিষয়, বনদস্যুরা সংগঠিতভাবে একাধিক গ্রুপে সক্রিয় থেকে সুন্দরবন ও সাগর এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করছে। জেলেদের অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় এবং নির্যাতনের অভিযোগ নতুন নয়, কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান তৎপরতা না থাকলে দস্যুরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে—এ আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
এই সংকট কেবল জেলেদের ব্যক্তিগত দুর্দশায় সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়ছে রাষ্ট্রীয় রাজস্বেও। জেলেরা মাছ ধরার পাস না নেওয়ায় বন বিভাগের রাজস্ব ঘাটতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অর্থাৎ নিরাপত্তাহীনতার প্রভাব এখন অর্থনীতির শিরায় শিরায় পৌঁছে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি উপকূলীয় অর্থনীতি ও শুঁটকি শিল্পে বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সুন্দরবনের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা এখন সময়ের দাবি। সমন্বিতভাবে বন বিভাগ, কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর অভিযান প্রয়োজন। পাশাপাশি জেলেদের জন্য নিরাপদ নৌপথ, জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া ইউনিট গঠন করা যেতে পারে। অপহৃতদের দ্রুত উদ্ধার এবং দস্যু চক্রের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কঠোর ব্যবস্থা না নিলে আতঙ্ক কাটবে না।
সুন্দরবন আমাদের জাতীয় সম্পদ; আর জেলেরা সেই সম্পদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পরিশ্রমী মানুষ। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু মানবিক দায় নয়, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বও। দস্যুমুক্ত সুন্দরবনই পারে উপকূলীয় মানুষের মুখে আবারও স্বস্তির হাসি ফিরিয়ে দিতে। এখন প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ—অন্যথায় এই সংকট আরও গভীর হবে।











































