Home আঞ্চলিক চার বছরেও শেষ হয়নি কাজ, সড়ক সংস্কারের নামে ভোগান্তি

চার বছরেও শেষ হয়নি কাজ, সড়ক সংস্কারের নামে ভোগান্তি

13

কয়রা প্রতিনিধি।।

খুলনার সর্ব দক্ষিণের উপকূলীয় উপজেলা কয়রায় সড়ক উন্নয়নের নামে শুরু হওয়া একাধিক প্রকল্পের কাজ দীর্ঘদিন ধরে অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে থাকায় জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। কোটি টাকা বরাদ্দ থাকার পরও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীরা। কোথাও সড়ক খুঁড়ে রাখা হয়েছে, কোথাও খোয়া-বালু ছড়িয়ে রেখে কাজ বন্ধ রয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলাচলে দুর্ভোগ হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রকল্প শুরু হলেও বাস্তবে অনেক সড়ক এখন আগের চেয়েও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বর্ষা মৌসুমে কাদা ও জলাবদ্ধতা, আর শুষ্ক মৌসুমে ধুলার কারণে নাজেহাল অবস্থা। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাচ্ছেন শিক্ষার্থী, রোগী, কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী এবং যানবাহনের চালক ও যাত্রীরা।

সোমবার (২৪ আগস্ট) সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে সংস্কারকাজ শুরু হওয়ার পর তা মাঝপথে থেমে আছে। কোথাও পুরোনো কার্পেটিং তুলে ফেলা হয়েছে, কোথাও রাস্তার ওপর খোয়া-বালু ফেলে রাখা হয়েছে। অনেক স্থানে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হওয়ায় যান চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বৃষ্টি হলে এসব গর্তে পানি জমে দুর্ভোগ বেড়ে যায়। বেশি পানি হলে ডুবে যায় এবং বোঝা যায় না কোন স্থানে গর্ত। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

কয়রা সদর ইউনিয়নের মদিনাবাদ মাধ্যমিক বিদ্যালয় মোড় থেকে ৪ নম্বর কয়রা বাজার পর্যন্ত প্রায় আড়াই কিলোমিটার সড়কের সংস্কার কাজ শুরু হয় ২০২১ সালের নভেম্বর মাসে। ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত এ সড়ক সংস্কারের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় ১ কোটি ২৩ লাখ টাকা। কাজটির দায়িত্ব পায় মেসার্স রাকা এন্টারপ্রাইজ। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কয়েক দফায় মেয়াদ বাড়ানো হয়। প্রকল্পটি এখনও অসমাপ্ত।

সড়কের ডব্লিউবিএম লেয়ার অসম্পূর্ণ অবস্থায় দীর্ঘদিন ফেলে রাখা হয়। কিছু কাজ করার পর নির্মাণ সামগ্রীর ব্যয় বেশির অজুহাত দিয়ে ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ না করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর সড়কটি সংস্কারের জন্য পুনরায় দরপত্র আহ্বান করে।

টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর কাজটি পায় মের্সাস নাজিফা এন্টারপ্রাইজ। এতে ব্যায় ধরা হয় ১ কোটি ১৩ লাখ টাকা। কাজটি ১২ এপ্রিল ২০২৬ থেকে শুরু করে ১১ জানুয়ারি ২০২৭ সালে শেষ করার জন্য চুক্তি হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ না শুরু করায় কয়রা উপজেলা প্রকৌশল অফিস হতে গত ৯ জুলাই ৫ দিনের মধ্যে কাজ শুরু করার জন্য তাগিদপত্র প্রদান করে। এরপরও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি কাজ শুরু করেনি।

সড়কটির পাশে বসবাসকারী ১ নম্বর কয়রা গ্রামের বাসিন্দা আসাদুল ইসলাম বলেন, এই রাস্তাটি তিনটি ইউনিয়নের মানুষের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের সড়ক। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই পথ ব্যবহার করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সড়কের এমন অবস্থা যে, চলাচল করতে গিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।

শিক্ষক মেসবাহ উদ্দীন বলেন, উপজেলায় ৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে। শিক্ষার্থীদের এই সড়ক দিয়েই যাতায়াত করতে হয়। দুঃখের বিষয় ৪ বছরের বেশি সময় পার হলেও সড়কটির সংষ্কার কাজ শেষ হয়নি। এই ভোগান্তির দায়ভার কে নেবে? সরকারি অর্থের যাথাযথ ব্যবহার না করা ও উদাসীনতার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের শাস্তির দাবি জানান তিনি।

কয়রা উপজেলার উপ সহকারি প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন বলেন, তাগিদপত্র দেওয়ার পরও কাজ শুরু না করায় স্থানীয় প্রকৌশল অফিস হতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চিঠি প্রদান করা হবে। পুনরায় দরপত্রের প্রস্তুতি চলছে।

অন্যদিকে উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের হুদুবুনিয়া-চাঁন্নিরচক সড়কের চিত্রও ভিন্ন নয়। পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দুই কিলোমিটার সড়ক কার্পেটিংয়ের জন্য ২০২১ সালে ১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। দরপত্রের মাধ্যমে কাজ পায় মেসার্স রাকা-সিয়াম (জেভি) এন্টারপ্রাইজ। কাজ শুরুর কিছুদিন পরই সড়ক খুঁড়ে রেখে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কার্যত কাজ বন্ধ করে দেয়। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে প্রায় চার বছর হতে চললেও প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সম্প্রতি ঐ কাজের রিটেন্ডারের জন্য যৌথ মেজারমেন্টের কাজ চলছে। প্রক্রিয়া শেষে টেন্ডারের মাধ্যমে সড়কটির কাজ শুরু করা হবে।

স্থানীয়রা বলছেন, খোড়াখুড়ির পর কাজ বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের স্কুলে যেতে, রোগীদের হাসপাতালে পৌঁছাতে এবং কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য বাজারে নিতে বাড়তি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সড়কের অবস্থা খারাপ হওয়ার কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। সময়মতো পণ্য আনা-নেওয়া সম্ভব না হওয়ায় ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখেও পড়তে হচ্ছে অনেককে। কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসল বাজারজাত করতে নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।

চান্নিরচক গ্রামের ভ্যানচালক ভবতোষ মন্ডল বলেন, প্রতিদিনই ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালাতে হয়। অনেক সময় গর্তে পড়ে ভ্যান উল্টে যায়। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কায় থাকতে হয়।

স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে মানুষকে এত দীর্ঘ ভোগান্তি পোহাতে হতো না।

কয়রার সচেতন নাগরিক কপোতাক্ষ কলেজের সাবেক অধ্যাপক আ. ব. ম. আ. মালেক বলেন, উন্নয়নের নামে সড়ক খোড়াখুড়ি করে রেখে জনগণকে বছরের পর বছর দুর্ভোগে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দ্রুত প্রকল্পগুলো শেষ না হলে মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়বে।

তবে এলজিইডির কর্মকর্তারা বলছেন, কিছু প্রকল্পে কারিগরি জটিলতা, নকশা সংশোধন ও সমন্বয় সমস্যার কারণে কাজ বিলম্বিত হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি স্থগিত প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে এবং কিছু প্রকল্প পুনরায় দরপত্রের মাধ্যমে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এলজিইডির কয়রা উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী মো. শাফিন শোয়েব বলেন, ‘মদিনাবাদ হাইস্কুল থেকে ৪ নম্বর কয়রা পর্যন্ত সড়কটির কাজ শুরু না করায় ঠিকাদারকে তাগিদপত্র দেওয়া হয়েছে। তবে বর্ষা মৌসুমের পরে কাজ শুরুর করার কথা জনিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি। এছাড়াও যেসব প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে সেগুলো দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না করলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’