ডা. এটিএম কামরুল হাসান।।
সাধারণত দেহের সব কোষ একটি সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিভাজিত হয়। ফলে কোষকলার স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত থাকে। যখন এ কোষ বিভাজন অনিয়ন্ত্রিত ও অবিন্যস্ত হয়ে পড়ে, অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা কোষকলার সমষ্টিকে তখন বলা হয় টিউমার। টিউমার প্রধানত দুই ধরনের- বিনাইন ও ম্যালিগন্যান্ট। ম্যালিগন্যান্ট টিউমারই ক্যানসার নামে পরিচিত। জরায়ুমুখে সৃষ্ট ম্যালিগন্যান্ট টিউমার জরায়ুমুখ ক্যানসার নামে পরিচিত, যা শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে চিকিৎসা শুরু করা জরুরি। ১৮ বছরের নিচে বিয়ে বা যৌনমিলন, একাধিক সঙ্গীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক, অপরিচ্ছন্ন জননেন্দ্রিয়, জননেন্দ্রিয়ের সংক্রামক রোগ, যেমন- হার্পিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস টাইপ-২ ও হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস সংক্রমণ, ২০ বছরের নিচে গর্ভধারণ ও মা হওয়া, ধূমপান এবং নিম্ন আর্থসামাজিক অবস্থা- এসব বিষয় জরায়ুমুখ ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।
এ রোগের সাধারণ লক্ষণের মধ্যে রয়েছে অনিয়মিত রক্তস্রাব, ঋতু বন্ধ হওয়ার এক বছর পরও রক্তপাত, যৌনসঙ্গমের পর রক্তস্রাব, যোনিপথে অতিরিক্ত বাদামি বা রক্তমাখা স্রাব এবং দুর্গন্ধযুক্ত সাদা স্রাব। তবে এসব লক্ষণের কোনোটি এককভাবে ক্যানসার নিশ্চিত করে না; পরীক্ষার মাধ্যমে রোগের ধরন ও অবস্থান নির্ণয় করা হয়। ক্যানসারের আগের স্তরে রোগ শনাক্ত হলে যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তোলা সম্ভব। এ পর্যায়ে জরায়ুমুখের অস্বাভাবিক ও অনিয়ন্ত্রিত কোষ বিভাজনের চিকিৎসায় ক্রায়োথেরাপি প্রয়োগ করা হয়, যেখানে প্রচণ্ড ঠান্ডা ব্যবহার করে আক্রান্ত কোষকলা ধ্বংস করা হয়। এছাড়া ইলেকট্রোকোয়াগুলেশন বা বৈদ্যুতিক প্রবাহের মাধ্যমে সৃষ্ট উচ্চ তাপ প্রয়োগ করেও আক্রান্ত কোষকলা নষ্ট করা যায়। এসব চিকিৎসা পদ্ধতিতে রোগীর সন্তান ধারণক্ষমতা অক্ষুণ্ন থাকে। ক্যানসার যদি উৎপত্তিস্থলেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে অনেক ক্ষেত্রে সার্জারি চিকিৎসা গ্রহণ করা হয়, যেখানে সম্পূর্ণ জরায়ু অপসারণ করা হয়; এ পদ্ধতিকে হিস্টারেক্টমি বলা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যোনিপথের ওপরের অংশ, আশপাশের কোষকলা এবং লসিকাগ্রন্থিও অপসারণ করা হয়, যাতে ক্যানসার কোষ শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে না পারে। রেডিয়েশন থেরাপিতে বিকিরণের মাধ্যমে ক্যানসার আক্রান্ত কোষ ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত করা হয় এবং অনেক সময় টিউমারের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ বা ব্যথা কমানোর উদ্দেশ্যেও এ চিকিৎসা দেওয়া হয়। সার্জারির মাধ্যমে যদি সব ক্যানসার কোষ অপসারণ সম্ভব না হয়, তবে অস্ত্রোপচারের পর অতিরিক্তভাবে রেডিয়েশন থেরাপি প্রয়োগ করা হয়। সার্জারি বা রেডিয়েশন থেরাপির পর রোগীকে নির্দিষ্ট সময় পরপর নিয়মিত পরীক্ষা করাতে হয় এবং কিছুদিন যৌনমিলন থেকে বিরত থাকতে হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ যথাযথভাবে মেনে চললে সাধারণত দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরে যেতে পারেন। বিবাহিত বা যৌনজীবনে প্রবেশকারী প্রত্যেক নারীর প্রতি তিন বছর অন্তর নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষা করানো উচিত এবং মাসিক চলাকালীন বা ঋতু বন্ধের পর অস্বাভাবিক রক্তস্রাব বা স্রাব দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন। প্রত্যেক নারী যদি নিজের শরীর ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হন, তবে জরায়ুমুখ ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগের ভয়াবহ পরিণতি এড়ানো সম্ভব।
লেখক : মেডিক্যাল অনকোলজিস্ট, গবেষণা সহকারী, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, মহাখালী, ঢাকা
চেম্বার : পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, উত্তর বাড্ডা, ঢাকা
হটলাইন : ০৯৬১৩৭৮৭৮০৯, ০১৭১২২৪৫৯৪৪











































