ঢাকা অফিস।।
ঢাকায় ব্যস্ত দিন কাটিয়েছেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বেলা সাড়ে ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদির কবর জিয়ারত করে দিনের কর্মসূচি শুরু করেন তিনি। সেখান থেকে নির্বাচন কমিশনে যান ভোটার হওয়ার আবেদন করতে। এরপর বনানী কবরস্থানে প্রয়াত ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকো, প্রয়াত শ্বশুর রিয়ার এডমিরাল (অব.) মাহবুব আলী খান এবং বিডিআর বিদ্রোহে শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের কবর জিয়ারত করেন তিনি। বনানী থেকে যান ধানমণ্ডির মাহবুব ভবনে। সেখানে বেশ কিছু সময় স্বজনদের সঙ্গে কাটান। রাতে অসুস্থ মাকে দেখতে যান এভারকেয়ার হাসপাতালে।
শনিবার সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরীফ ওসমান হাদির কবর জিয়ারত করার উদ্দেশ্যে গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাড়ি থেকে তারেক রহমানের গাড়ি বহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। আগের দু’দিন তাকে বুলেট প্রুফ বাসে চড়তে দেখা গেলেও এদিন তিনি সাদা রংয়ের একটি এসইউভিতে চড়ে আসেন। কর্মসূচিকে ঘিরে সকাল থেকে শাহবাগ মোড় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলাকায় বিএনপি, ছাত্রদলসহ দলের অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের হাজার হাজার নেতাকর্মীদের ব্যানার, ফেস্টুন, জাতীয় ও দলীয় পতাকা নিয়ে জড়ো হতে দেখা গেছে। সাড়ে ১১টার দিকে তারেক রহমানের গাড়িবহর শাহবাগ মোড়ে পৌঁছালে নেতাকর্মীরা ‘তারেক রহমানের আগমন শুভেচ্ছা স্বাগতম’সহ বিভিন্ন স্লোগানে শাহবাগ এলাকা প্রকম্পিত করে তোলেন। তারেক রহমানও হাত নেড়ে জবাব দেন।
তার নিরাপত্তায় শাহবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশসহ (বিজিবি) বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন ছিলেন।
হাদির কবর জিয়ারত-জাতীয় কবির সমাধিতে শ্রদ্ধা: ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরীফ ওসমান হাদির কবর জিয়ারত করেছেন তারেক রহমান। পরে তিনি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবর জিয়ারত করেন। বেলা সাড়ে ১১টার একটু আগে তারেক রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে ওসমান হাদির কবরে পৌঁছান। তিনি প্রথমে ওসমান হাদির কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এরপর মোনাজাত করেন। পরে তারেক রহমান জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরে ফুল দেন ও মোনাজাত করেন। মোনাজাত পরিচালনা করেন শরীফ ওসমান হাদির বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিক। এ সময় উপস্থিত ছিলেন- বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়াজ আহমদ খান, উপ-উপাচার্য মামুন আহমেদ, শিক্ষক নেতা মোর্শেদ হাসান খানসহ শিক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নেতা ফজলুল হক মিলন, ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম বকুল, ছাত্রদলের সভাপতি রকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির উপস্থিত ছিলেন।
ভোটার হতে ইসিতে তারেক-জাইমা, সিদ্ধান্ত আজ: ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে নির্বাচন কমিশনে আবেদন প্রক্রিয়া শেষ করেছেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তার মেয়ে জাইমা রহমান। শনিবার দুপুরে আগে জাইমা এবং পরে তারেক রহমান আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে যান। এ সময় আঙ্গুলের ছাপ দেয়াসহ সব রকম কার্যক্রম শেষ করেন তারা। আবেদনের প্রেক্ষিতে আজ (রোববার) তাদের ভোটার হওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবে কমিশন।
গতকাল দুপুর ১টার দিকে নির্বাচন ভবনের পেছনে নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ভবনের একটি কক্ষে গিয়ে ছবি তোলা, ১০ আঙ্গুলের ছাপ দেয়া, চোখের আইরিশ (চোখের মণির ছাপ) ও স্বাক্ষর করার কাজ করেন তারেক রহমান। একই প্রক্রিয়া জাইমা রহমান শেষ করেন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে। এ সময় সেখানে উপস্থিত থাকা নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ বলেন, আগামীকাল নির্বাচন কমিশনে এটা পেশ করা হবে। কমিশনের সিদ্ধান্তের পরে উনাদের নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবে।
আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা ইতিমধ্যে চূড়ান্ত করেছে ইসি। তবে ভোটার তালিকা আইনে বলা আছে, ইসি যেকোনো সময় ভোটার হওয়ার যোগ্য যেকোনো ব্যক্তির নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। এক-এগারো পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৮ সালে বাংলাদেশে প্রথম ছবিসহ ভোটার তালিকা তৈরি হয়। বিএনপি’র চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান কারামুক্ত হয়ে ২০০৮ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর স্ত্রী-মেয়েকে নিয়ে লন্ডনের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ছাড়েন। জাইমা তখন অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন। বিদেশে থাকায় তখন ভোটার তালিকায় তারা অন্তর্ভুক্ত হননি। গত বছর জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আগামী ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের পথে এগোচ্ছে। আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণের দিন রেখে তফসিলও ঘোষণা করেছে ইসি। তারেক রহমান সপরিবার গত বৃহস্পতিবার দেশে ফিরলেও এর আগেই বিএনপি সংসদ নির্বাচনে অধিকাংশ আসনে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছে। সে অনুযায়ী, পৈতৃক এলাকা বগুড়ার সদর (বগুড়া-৬) আসনে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন তারেক রহমান।
তারেক রহমান ও জাইমা রহমান ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডে ভোটার হতে আবেদন করেছেন বলে জানান ইসি সচিব আখতার আহমেদ। যেখানে থাকছেন তারেক রহমান, সেখানেই ভোটার হতে আবেদন করেছেন তিনি। এই ওয়ার্ডটি ঢাকা-১৭ আসনের অন্তর্ভুক্ত। এই আসনটি বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থকে বিএনপি ছেড়ে দিয়েছে। তিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনেও বিএনপি জোটের প্রার্থী ছিলেন। স্থানীয় নির্বাচনে যে কারও প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকায় ভোটার হওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে সংসদ নির্বাচনে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকায় যে কেউ দেশের যেকোনো আসনে প্রার্থী হতে পারেন।
তারেক রহমান ও জাইমা রহমানের ভোটার হওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে ইসি সচিব আখতার আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, আজকে নিবন্ধন প্রক্রিয়া যেটা আছে ফরম ২, ওই ফরম ফিলাপ করে ওনারা ছবি তুলেছেন, বায়োমেট্রিকস দিয়েছেন এবং দিয়ে ওনারা আবেদন করেছেন যে ওনাদের যেন ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই আবেদন নিয়ে আগামীকাল পূর্ণাঙ্গ কমিশন বৈঠকে বসবে কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিবন্ধনটা চলমান প্রক্রিয়া। নিবন্ধন কমপ্লিট করেছেন তিনি। ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি যেটা আগামী আপনার ১২ই ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্কিত। সে ক্ষেত্রে কমিশনের সিদ্ধান্ত লাগবে। কমিশনের সিদ্ধান্ত দুইভাবে পাওয়া যায়। একটা হচ্ছে আনুষ্ঠানিক সভা করে, আরেকটা হচ্ছে নথির মাধ্যমে। ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) পেতেও নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সারেন তারেক রহমান।
এনআইডি উইংয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) এ এস এম হুমায়ুন কবীরের কাছে সকালে সাংবাদিকরা জানতে চেয়েছিলেন, তারেক রহমানের নিবন্ধন প্রক্রিয়াটি শেষ হতে কতো সময় লাগতে পারে? উত্তরে এ এস এম হুমায়ুন কবীর বলেন, তা সুনির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। এটা ৫ ঘণ্টা, ৭ ঘণ্টা, ১০ ঘণ্টা, কারও কারও ক্ষেত্রে আরও বেশি লাগে, আবার কারও কারও ক্ষেত্রে একটু কম লাগে।
ছোট ভাই আরাফাত রহমানের কবর জিয়ারত: তারেক রহমান তার ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর কবর জিয়ারত করেছেন। রাজধানীর বনানী কবরস্থানে গতকাল বেলা ১টা ৫০ মিনিটের দিকে পৌঁছান তারেক রহমান। এরপর কবরের পাশে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন। এ সময় সুরা ফাতেহা ও দরুদ শরিফ পাঠ করে ভাইয়ের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করেন তিনি।
২০১৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি মালয়েশিয়ায় হৃদরোগ আক্রান্ত হয়ে মারা যান আরাফাত রহমান কোকো। ওই সময়ে লন্ডনে নির্বাসিত ছিলেন তারেক রহমান। একদিন পরে কোকোর মরদেহ দেশে এনে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়।
বনানী করবস্থানে শায়িত আছেন তারেক রহমানের শ্বশুর সাবেক নৌপ্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান। সেখানে প্রয়াতের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করেন তারেক রহমান।
বিকাল ৩টার দিকে বনানীর সামরিক কবরস্থানে সেনা কর্মকর্তাদের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করেন তারেক রহমান। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬শে ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় সীমান্তরক্ষা বাহিনীর সদর দপ্তরে বিদ্রোহের ঘটনায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন। শহীদ সেনা কর্মকর্র্তাদের দাফন করা হয় বনানীর সামরিক কবরস্থানে।
ধানমণ্ডিতে মাহবুব ভবনে: বিকালে রাজধানীর ধানমণ্ডিতে শ্বশুরবাড়ি মাহবুব ভবনে যান তারেক রহমান। বিকাল ৪টা ২৫ মিনিটের দিকে গুলশান এভিনিউয়ের ১৯৬ নম্বর বাসভবন থেকে তাকে বহনকারী গাড়িবহর শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়। সেখানে তিনি কিছু সময় স্বজনদের সঙ্গে কাটান।
গত বৃহস্পতিবার ১৭ বছর পর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। সেদিন সংবর্ধনা, বক্তৃতা শেষে মা বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে দেখতে এভারকেয়ার হাসপাতালে যান। পরদিন বিকালে তিনি বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারত করে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।











































