খুলনাঞ্চল রিপোর্ট
শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিট। সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় তখনো অনেকে ছিলেন ঘুমিয়ে, কেউ নাশতা করছিলেন, কেউবা ছিলেন বাজারে। হঠাৎ কম্পন। প্রথমে কিছুটা হতভম্ব হয়ে গেলেও কয়েক সেকেন্ডেই বোঝা গেল, আঘাত হেনেছে ভূমিকম্প। যার ঝাঁকুনি ছিল অত্যাধিক। দেশের মধ্যে স্মরণকালে এমন কম্পন কেউ অনুভব করেনি।
রিখটার স্কেলে এ ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৭, অর্থাৎ মাঝারি। কিন্তু উৎপত্তিস্থল ঢাকার পাশে নরসিংদীর মাধবদীতে হওয়ায় তা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দেয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে উৎপত্তি হওয়া সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প ছিল এটি। এতে অবকাঠামোগত প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শিশুসহ নিহত হয়েছে অন্তত ১০ জন। আহত আছে কয়েক শ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্প্রতি হওয়া ছোট ও মাঝারি ভূমিকম্প সামনে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে তেমন ঝুঁকিতেই রয়েছে বাংলাদেশ। বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ঢাকা শহর। কারণ এ শহরের বেশির ভাগ ভবন বিল্ডিং কোড মেনে নির্মিত হয়নি। এছাড়া এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতি কমাতে তেমন ব্যবস্থা নেয়নি কোনো সরকার।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, গত বছরের শেষ দিকে এবং চলতি বছরের প্রথমে ও মাঝামাঝি সময়ে দেশের আশপাশে বিভিন্ন মাত্রার অর্ধশতাধিক ভূমিকম্প হয়েছে। গত ১৫ বছরে ছোট-বড় ভূমিকম্প হয়েছে দেড় শতাধিক, যা আশঙ্কাজনক।
৯ মাত্রার ভূমিকম্পের শঙ্কা: বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশে সিলেট থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত পার্বত্য এলাকায় শক্তিশালী ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেই সঙ্গে ভারতের মণিপুর, মিজোরাম ও মিয়ানমারের পার্বত্য এলাকাও ঝুঁকির মধ্যে আছে।
এছাড়া কিশোরগঞ্জের হাওর দিয়ে মেঘনা নদী হয়ে বঙ্গোপসাগর ও আন্দামানের পাশ দিয়ে দক্ষিণে যদি একটি রেখা কল্পনা করা যায়, এটি হচ্ছে দুটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থল। এ দুটি প্লেটের মধ্যে পূর্বে অবস্থিত মিয়ানমার প্লেট ও পশ্চিমে ভারতীয় প্লেট। এর সংযোগস্থলের ওপরের ভাগটি অর্থাৎ সুনামগঞ্জ থেকে শুরু হয়ে পূর্বে মণিপুর ও মিজোরাম পর্যন্ত অঞ্চলটি লকড হয়ে আছে। দুটি টেকটোনিক প্লেটে গত শত বছরেও বড় কোনো ভূমিকম্প হয়নি। তাই জমেছে দীর্ঘদিনের সঞ্চিত শক্তি। যা যেকোনো মুহূর্তে ৮ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পের মধ্য দিয়ে হাজির হওয়ার আশঙ্কা আছে।
ভারত ও মিয়ানমারের প্লেট এবং বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক অবস্থান বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বলছেন, যেকোনো সময় বড় ধরনের ভূমিকম্প আঘাত হানবে। রিখটার স্কেলে ৭ মাত্রার বেশি ভূমিকম্প আর এর কেন্দ্র ঢাকার চারপাশের এলাকা হলে রাজধানীর প্রায় দুই লাখ ভবন পুরোপুরি ধসে পড়বে। এমন ঝুঁকি থাকলেও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় নেই পর্যাপ্ত প্রস্তুতি। গ্যাস-বিদ্যুতের অপরিকল্পিত লাইন ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প হলে মৃত্যুকূপে পরিণত হতে পারে পুরো ঢাকা শহর।
বড় ভূমিকম্প নেই প্রায় ৭৫ বছর: মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্যমতে, বাংলাদেশ ভূকম্পনের সক্রিয় এলাকায় অবস্থিত। দুর্যোগ সূচক অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ভূমিকম্পের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি শহরের মধ্যে রয়েছে ঢাকা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ছোটোখাটো কম্পন দেশে আরও শক্তিশালী ভূমিকম্পের আশঙ্কা নির্দেশ করে।
ঐতিহাসিকভাবে ১৮৬৯ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে রিখটার স্কেলে ৭-এর বেশি মাত্রার পাঁচটি ভূমিকম্পে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৮৮৫ সালের ভূমিকম্প এবং ১৯১৮ সালের শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্পের প্রতিটিরই কেন্দ্র ছিল বাংলাদেশের মধ্যে এবং যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছিল। এরপর এ অঞ্চলে বড় ভূমিকম্প প্রায় ৭৫ বছর ধরে ঘটেনি। তাই শিগগির একটি বড় ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি।









































