Home Lead স্বাস্থ্যঝুঁকি ও জীবিকা সংকটে কয়রার বাসিন্দারা

স্বাস্থ্যঝুঁকি ও জীবিকা সংকটে কয়রার বাসিন্দারা

21


কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি।।

সুন্দরবনঘেঁষা বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী অঞ্চল খুলনার কয়রার বাসিন্দারা বছরের পর বছর টিকে রয়েছে নোনাপানির সঙ্গে লড়াই করে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তারা স্বাস্থ্য ও জীবিকার সংকটে ভুগছেন। ব্যাহত হচ্ছে জীবিকার প্রধান উৎস কৃষি ও সুন্দরবনের সম্পদ আহরণও।

ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে বছরজুড়ে।

আবার দূষিত পানিতে বাড়ছে পানিবাহিত রোগ। আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাস্তুহারা হয়ে অনেকে শহরের বস্তিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে, যেখানে স্বাস্থ্যকর খাবার, স্যানিটেশন এবং অন্যান্য মৌলিক সুবিধার অভাব।
উপজেলার উপকূলবর্তী একটি ইউনিয়ন দক্ষিণ বেদকাশি। এ ইউনিয়নের ছোট আংটিহারা গ্রামেই বেড়ে উঠেছেন ষাটোর্ধ্ব বাসিন্দা আবু মুসা গাজী।

জীবিকার তাগিদে তাঁর দীর্ঘ সময় কেটেছে নদীর নোনাজলে, ত্বক হারিয়েছে স্বাভাবিকতা। তিনি বলেন, ‘চারিদিকে অথৈ পানি থাকলেও তা ব্যবহারের উপযোগী নয়, সব লবণাক্ত। বাধ্য হয়ে এই পানিই ব্যবহার করতে হচ্ছে।’ বাতাসে মাত্রাতিরিক্ত লবণের উপস্থিতি থাকায় এ অঞ্চলে সূর্যের উত্তাপ গায়ে লাগে খুব বেশি।

শিশু থেকে বৃদ্ধ প্রায় সবাই বলছেন, সূর্যের উত্তাপ এত বেশি গায়ে লাগে, যা অনেকটা চামড়া পুড়ে যাওয়ার মতো।
আশরাফ হোসেন, মোনায়েম, নাঈম ইসলাম, বুলবুল আহম্মেদসহ একাধিক শিশুরা জানায়, খেলাধুলা করলে বা নদীতে ঝাঁপাঝাঁপি করলে তাদের শরীরে জ্বালা করে। এখানে নদী, খাল ও পুকুরে সব লোনা পানি। তাই বাধ্য হয়ে তাদের লোনা পানিতেই নামতে হয়।

শুধু স্বাস্থ্যেই নয়, বাতাসে মাত্রাতিরিক্ত লবণের উপস্থিতির প্রভাব পড়েছে এ অঞ্চলের অর্থনীতিতেও।

মূলত কয়রার এ অঞ্চলটির প্রধান জীবিকা নির্বাহের উৎস সুন্দরবনের সম্পদ আহরণ ও মাছ চাষ। তবে এবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অতিবৃষ্টি, নদী ও মাটিতে লবণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় তার প্রভাব পড়েছে মাছ চাষের ওপর।


স্থানীয় রেজাউল গাজী, আমজেদ শেখ, আলামিন ইসলামসহ স্থানীয়দের দাবি, কয়রার মানুষ কেবল লবণাক্ত পানির সঙ্গে বসবাস করছে না, তারা লড়ছে প্রতিদিন নিজের অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধে। এই লড়াইয়ে কেবল সহানুভূতি নয়, প্রয়োজন নিরাপদ পানির টেকসই ব্যবস্থা, নারীর স্বাস্থ্যসেবা এবং জলবায়ু অভিযোজনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা।

সুন্দরবনঘেঁষা কয়রার দ্বীপ ইউনিয়ন দক্ষিণ বেদকাশির বাসিন্দা আব্দুর রব বলেন, ‘খরা, ঝড়, বৃষ্টি ও নদীভাঙন আমাদের নিত্যসঙ্গী। আইলার পর থেকে গোটা এলাকা উদ্ভিদশূন্য। লবণাক্ততার কারণে সব গাছ মারা গেছে। এলাকায় বসবাস করা খুবই কষ্টের। সব সময় সুপেয় পানির অভাবে থাকতে হয়।’

তথ্যমতে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে কয়রায় এক লাখেরও বেশি মানুষ সুপেয় পানির সংকটে। ঘূর্ণিঝড় আইলার তাণ্ডবের পর কয়রা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সুপেয় পানির সংকট তীব্র হয়, নষ্ট হয়ে যায় সুপেয় পানির উৎস।

উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর বলছে, প্রতি লিটার পানিতে শূন্য থেকে এক হাজার মিলিগ্রাম লবণ থাকলে সে পানি পানযোগ্য। কিন্তু উপকূলে প্রতি লিটার পানিতে এক হাজার থেকে ১০ হাজার মিলিগ্রাম লবণ রয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, কয়রায় ২৫ শতাংশ মানুষ খাওয়ার পানির সংকটে রয়েছে বলে জানানো হলেও বাস্তবে এই চিত্র আরো ভয়াবহ।

জলবায়ু সচেতনতা এবং সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক সাংবাদিক শুভ্র শচীন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে উপকূল আরো দুর্যোগপ্রবণ হয়ে উঠেছে। এতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষিজীবী ও সুন্দরবননির্ভর মানুষ। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে তাদের জীবন-জীবিকা।

শুভ্র শচীন আরো বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনে প্রতিবেশ ও দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহারযোগ্য পানির সংকট উপকূলে প্রকট করে তুলেছে। লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং সুপেয় পানির সংকটে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। নদীভাঙন বাড়ছে, যা আবাদি জমি নষ্ট করছে। জমির উর্বরতা কমে যাওয়ায় উৎপাদনও কমছে। এতে মাছচাষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং মানুষ কর্মহীন হয়ে বাস্তুহারা হচ্ছে। এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ এবং সচেতনতা জরুরি।’

কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজাউল করিম বলেন, ‘গত কয়েক বছরে উপকূলীয় শিশুদের নানা রোগসহ নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যা অনেক বেড়েছে। অনিয়মিত ঋতুস্রাব, জরায়ু সংক্রমণ, এমনকি ক্যান্সারের মতো রোগও এখন নিয়মিত দেখা যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ লবণাক্ত পানি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল্লাহ আল বাকি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় এলাকায় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করা সম্ভব নয়, তবে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ক্ষতি কমানো সম্ভব। বাংলাদেশ এখন দুর্যোগ মোকাবেলায় রোল মডেল।

ইউএনও আরো বলেন, সরকারি, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং উপকূলীয় অঞ্চলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সচেতনতার মাধ্যমে উপকূলীয় মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব। পরিবেশ নষ্ট করে নিজের বিপদ ডেকে আনা যাবে না। যার দায়িত্ব তাকে পালন করতে হবে। তাহলেই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে এনে উপকূলকে দুর্যোগসহিষ্ণু অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।