>>জোরপূর্বক হলে প্রবেশের অপচেষ্টায় প্রশাসনের উদ্বেগ
বিশেষ প্রতিনিধি।।
মারধরের ঘটনার প্রায় দু’মাস পর খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের ২২ শিক্ষার্থীর নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরো ১৫-২০ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে। বৃহষ্পতিবার নগরীর মহেশ^রপাশা উত্তর বনিকপাড়ার মো: হোচেন আলী নামে এক ভুক্তভোগী মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আমলী আদালতে এ মামলাটি দায়ের করেন। আদালত বাদী অভিযোগ গ্রহণ করে খানজাহান আলী থানাকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।
অপরদিকে কুয়েটে শিক্ষার্থীদের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের ঘটনায় একাডেমিক কার্যক্রম ও হল বন্ধের ঘোষণার মধ্যে পুনরায় হল চালুর উদ্দেশ্যে শিক্ষার্থীদের আগামী ১৩এপ্রিল সোশ্যাল মাধ্যমে হলে প্রবেশের ঘোষণায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়টি এক বিজ্ঞপ্তিতে স্বার্থান্বেষী মহল কুয়েটে তদন্ত কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করা ও চলমান অচলাবস্থাকে দীর্ঘায়িত করতেই আইন অমান্য করে জোরপূর্বক হলে প্রবেশের অপচেষ্টা করছে বলে অভিযোগ তুলেছে। তারা সংশ্লিষ্ট সকলকে এ কাজ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানিয়েছে। সব মিলিয়ে আবার উত্তপ্ত পরিবেশ বিরাজ করছে কুয়েটে।
আদালত সূত্রে জানাযায়, গত বৃহষ্পতিবার দৌলতপুরের মহেশ^রপাশা উত্তর বনিকপাড়া এলাকার মোঃ হোচেন আলী মেট্রোপলিটন ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে কুয়েটের বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের ২২ শিক্ষার্থীর নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাত নামা ১৫ থেকে ২০জন ছাত্রের নামে আদালতে অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি দুপুরে তিনি দৈনন্দিন এর কাজ শেষে কুয়েট রোড হয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছিলেন। এ সময় কুয়েট পকেট গেটের সামনে গেলে আসামীরা তার রাস্তা প্রতিরোধ করে। তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে রড ও লাঠি দিয়ে মাথায় ও ঘাড়ে আঘাত করে। এ সময় তিনি মাটিতে পরে গেলে আসামীরা তার হাত ও পা পাড়িয়ে ধরে তাকে ধাঁরালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে এবং উপর্যপুরি পেটাতে থাকে।
এ সময় আসামীরা তার গলায় থাকা একভরি ওজনের একটি স্বর্ণের চেনও ছিনিয়ে নেয়। এ সময় তিনি প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে পোস্ট অফিসের সন্নিকটে আসামীরা তাকে আবার ঘিরে ধরে বেধড়ক পিটায়। তাকে হত্যার হুমকিসহ ছিনতাই মামলায় পুলিশে দেওয়ার হুমকি দেয়। এ সময় তার চিৎকারে স্থানীয় জনতাএগিয়ে আসলে শিক্ষার্থীরা তাদেরও মারপিট করে আহত করে পালিয়ে যায। পরে স্থানীয় জনতা, তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় মন্টু ডাক্তারের মমতা ক্লিনিকে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। আর অন্যান্য আহতদেরকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
মামলায় আসামী করা হয়েছে, কুয়েট মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থী ওমর ফারুক (২২), ইসিই ডিপার্টমেন্টের জাহিদুর (২৩), ট্রিপল ই ডিপার্টমেন্টের ওবাইদুল্লাহ (২৩), টি.ই, ডিপার্টমেন্টের মোহন (২৩), ট্রিপল ই ডিপার্টমেন্টের গালিব রাহাত (২৩), ট্রিপল ই ডিপার্টমেন্টের সাদাত তানভীর মাহিন (২৩), ট্রিপল ই ডিপার্টমেন্ট, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট রায়হান শরিকুল (২৩), ট্রিপল ই ডিপার্টমেন্ট এর শেখ মুজাহিদ (২৩), ট্রিপল ই ডিপার্টমেন্ট, আই,ই,এম, ডিপার্টমেন্ট এরে সাজ্জাদ ফরহাদ (২৩), মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট এর হিমেল (২৩), মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট, শোভন (২৩), ই সিই ডিপার্টমেন্ট এর ইছা আনছারী (২০), সি এইচ ই ডিপার্টমেন্ট এর আবু হাসান খালিদ (২৩), এল ই ডিপার্টমেন্ট এর ইয়াছিন রোওয়ান (২০), এম ই ডিপার্টমেন্ট এর ফজলে রাব্বি, কুয়েট শিক্ষার্থী জাহিদুল ইসলাম নায়েল, এম ই ডিপার্টমেন্ট এর সাফতি আনছারী (২৩), কুয়েট শিক্ষার্থী আব্দুর রাহিম মৃধা (২০), এম ই ডিপার্টমেন্ট এর আজমাইন ইসরাক অর্নব (২০), ট্রিপল ই ডিপার্টমেন্ট এর মুজাহিদ (১৯), ইন্ডাষ্ট্রিয়াল প্রোডাকশন ও ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট এর মাহাদি হাসান (২৫), কুয়েট শিক্ষার্থী অভি (২৩) ও অজ্ঞাতনামা আরো ১৫/২০ জন।
এ বিষয়ে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালতের বিচারক মামলাটি গ্রহণ করে খানাজাহান আলী থানা অফিসার ইনচার্জকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
অপরদিকে গত কয়েকদিন ধরে কুয়েটের বিভিন্ন ব্যাচের ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে আগামী ১৩ এপ্রিল প্রশাসনের নির্দেশ অমান্য করে হলে প্রবেশের সেন্ট্রাল সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আহ্বান জানানো হচ্ছে। তাদের দাবি তারা কুয়েট উপচার্য, উপ উপচার্য ও ছাত্র বিষয়ক পরিচালকের পদত্যাগ ও তাদের উপর হামলাকারীদের গ্রেপ্তার পূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তারা বলেন, প্রশাসন যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে তা তারা মানেননা। প্রহসনের এই তদন্ত কমিটিতে তাদের কোন আস্থা নেই। তারা এই তদন্ত কমিটি পরিবর্তনেরও দাবি জানান।
বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের জোর পূর্বক হলে প্রবেশের এই চেষ্টাকে স্বার্থান্বেষী মহলকে কুয়েটের তদন্ত বাধাগ্রস্থ করা ও চলমান অচলাবস্থাকে দীর্ঘায়িত করতেই আইন অমান্য করে জোরপূর্বক হলে প্রবেরেশর অপচেষ্টা চলছে বলে বিবৃতি দিয়েছেন। কুয়েটের জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা ডিভিশনের পাবলিক রিলেশনস অফিসার শাহেদুজ্জামান শেখ স্বাক্ষরিত এই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সংঘটিত অনভিপ্রেত ঘটনার প্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের ৯৯তম (জরুরী) সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষা কার্যক্রম পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং সকল আবাসিক হল ভ্যাকান্ট করে সিলগালা করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত যৌক্তিক দাবিসমূহের প্রতি আন্তরিকভাবে সম্মতি প্রদান করেছে এবং ইতোমধ্যে অধিকাংশ দাবি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। অবশিষ্ট দাবিসমূহ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট বিভাগসমূহ আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। একইসাথে, ঘটনার প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত করে যথাযথ বিচার নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালের সিন্ডিকেট কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটি নিরলসভাবে তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এবং উক্ত তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন আগামী ১৩ এপ্রিল, ২০২৫ তারিখে মধ্যে দাখিল করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এতদ্বসত্ত্বেও, লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে কিছু শিক্ষার্থী ও স্বার্থান্বেষী মহল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ও উস্কানিমূলক বক্তব্য ছড়িয়ে শিক্ষার্থীদের উত্তেজিত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এহেন কর্মকান্ড থেকে প্রতীয়মান হয় যে, তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী প্রকৃত অপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত এবং চলমান অচলাবস্থাকে দীর্ঘায়িত করতেই আইন অমান্য করে আগামী ১৩ এপ্রিল, ২০২৫ খ্রি. হলে প্রবেশ করার অপচেষ্টা। এমতাবস্থায়, সকল শিক্ষার্থীকে এই ধরনের অপপ্রচারে প্রভাবিত না হয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে এবং অনভিপ্রেত কোনো কর্মকান্ডে জড়িত না হতে অনুরোধ করা যাচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবিগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন সাপেক্ষে অতি দ্রুত আবাসিক হলসমূহ খুলে দেওয়া এবং শিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় শুরু করার লক্ষ্যে আন্তরিকতার সাথে কাজ করে যাচ্ছে। এ প্রেক্ষিতে ১৮ ফেব্রুয়ারি সংঘটিত অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক ঘটনার সাথে জড়িত প্রকৃত দোষীদের বিচার নিশ্চিতের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে শিক্ষার্থীদের প্রতি ধৈর্য ধারণের জন্য অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি কুয়েট ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের দ্ইু গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় কুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে শিক্ষার্থীরা দাবি করে কুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্রদল রাজনীতি চালু করার প্রতিবাদে তাদের মিছিল হয়। এ সময় ছাত্রদলের নেতা কর্মীরা বহিরাগতদের নিয়ে তাদের উপর হামলা করে। অপরদিকে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল দাবি করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও গুপ্ত সংগঠন ছাত্র শিবির কুয়েটে তাদের আধিপত্য বিস্তার করতে ছাত্রদলের সমর্থকদের উপর হামলা করে। এ সময় তারা কুয়েট ক্যাম্পাসের বাইরে সাধারণ মানুষদের উপর হামলা করলে সাধারণ মানুষ তাদের প্রতিহত করে।
এই সময় কুয়েটের উপচার্য ড. মুহাম্মদ মাছুদ কুয়েট শিক্ষার্থীদের দ্বারা লাঞ্ছিত হন। তাকে একদিন কুয়েট চিকিৎসা কেন্দ্রে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। পরে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে তিনি গণমাধ্যমে এই তথ্য জানান।
এই ঘটনার পর সাধারণ শিক্ষার্থীরা কুয়েটের উপচার্য্য, উপ উপচার্য ও ছাত্র বিষয়ক পরিচালকের পদত্যাগসহ ছয় দফা দাবিতে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভসহ নানা কর্মসূচি পালন করে। এই প্রেক্ষিতে কুয়েট প্রশাসন তাদের ৯৯তম সিন্ডিকেট সভায় কুয়েটের সকল দাপ্তরিক ও একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা ও শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগের নির্দেশ দেয়।











































