ডেস্ক রিপোর্ট।।
ক্রিকেট এমনই এক খেলা, যেখানে খ্যাতি অর্জিত হয় নিখাদ প্রতিভায়। আর এই নিখাদ প্রতিভার উজ্জ্বল উদাহরণ বিহারের ১৫ বছরের কিশোর বৈভব সূর্যবংশী। আইপিএল কাঁপানো এই তরুণ প্রতিভা এখন ক্রিকেট দুনিয়ার অন্যতম চর্চিত নাম। শুনলে চমকে যাবেন, তার কাছে ইতিমধ্যেই এসেছে বছরে ১২ কোটি রুপি স্পনসরশিপের প্রস্তাব।
এবারের আইপিএলে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে সূর্যবংশী তার ব্যাটের ‘বৈভব’ দেখিয়েছেন। ৬৮০ রান এবং ২৪০ এর বেশি স্ট্রাইক রেটে ব্যাট করে শুধু টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকই নন, অনেকের অন্যতম পছন্দের ক্রিকেটার হয়ে উঠেছেন। আন্তর্জাতিক মানের বোলারদের বিপক্ষে তার আগ্রাসী ব্যাটিং নজর কেড়েছে সবার।
কিন্তু ক্রিকেটের সবচেয়ে নির্মম সত্যটা এখানেই- ভালো খেলার পরও কখনো কখনো নেমে আসে নিস্তব্ধতা। শুক্রবার রাতে তেমনই এক দৃশ্য, যেখানে আগ্রাসী ব্যাটসম্যান বৈভবকে দেখা গেল নিরবে কাঁদতে। জয়-পরাজয় হিসাবের বাইরে সেই মুহূর্তটা ছিল এক কিশোরের স্বপ্নভাঙার গল্প।
আইপিএলে বৈভব সূর্যবংশীর ঝড়
রাজস্থান রয়্যালস গতবছর একেবারে ভুলে যাওয়ার মতো একটি মৌসুম পার করার পর এবারের আইপিএল শুরু করে। ২০২৫ আসরে তারা ছিল পয়েন্ট তালিকার নবম স্থানে। এক পর্যায়ে ৯ ম্যাচে মাত্র একটি জয়। দলের অধিনায়ক সঞ্জু স্যামসনও দীর্ঘ সময় চোটে ছিলেন। কিন্তু ২০২৬ মৌসুমে শুরুতেই দেখা মেলে বদলে যাওয়া রাজস্থানের।
প্রথম চার ম্যাচে টানা জয় পায় দলটি। শেষ পর্যন্ত মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের বিপক্ষে ৩০ রানের জয়ে প্লে-অফ নিশ্চিত করে তারা। এলিমিনেটরে সানরাইজার্স হায়দরাবাদকে হারিয়ে কোয়ালিফায়ারে জায়গা করে নেয় রাজস্থান। তবে দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ারে গুজরাট টাইটানসের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়। শুভমন গিলের ১০৪ রানের ইনিংস তাদের ফাইনালের স্বপ্ন ভেঙে দেয়। মৌসুম শেষে রাজস্থান রয়্যালসের অবস্থান দাঁড়ায় তৃতীয়, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে তাদের অন্যতম সেরা অর্জন।
পুরো যাত্রায় সবচেয়ে আলোচিত নাম ছিল বৈভব সূর্যবংশীর। বিহারের এই কিশোর ব্যাটার যেন পুরো টুর্নামেন্টে রাজস্থানের ভরসার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।
১৬ ম্যাচে ৭৭৬ রানের মৌসুম
এবারের আইপিএলে বৈভব সূর্যবংশী খেলেন ১৬টি ম্যাচ। রান করেন ৭৭৬, গড় ৪৮.৫ এবং স্ট্রাইক রেট ২৩৮। ৬৩টি চার আর ৭২টি ছক্কা মারেন তিনি, যা প্রমাণ করে কতটা আক্রমণাত্মক ব্যাটার বৈভব।
তার ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হলো ধারাবাহিক গতি। পাওয়ার প্লেতে তার স্ট্রাইক রেট ২৩৩, মাঝের ওভারে ২৩৪, আর শেষ দিকে তা ২৬৫ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। অর্থাৎ ম্যাচ যত এগোয়, তিনি আরও বিধ্বংসী হয়ে ওঠেন।
ম্যাচ বদলে দেওয়া ইনিংস
এই মৌসুমে সূর্যবংশীর ৭টি ইনিংসকে ‘ঐতিহাসিক’ বা ‘অবিশ্বাস্য’ পর্যায়ের বলা হয়েছে। আরও ৩টি ইনিংস ছিল ম্যাচ-জেতানো পারফরম্যান্স। তবে তিনটি ম্যাচে তিনি দ্রুত আউট হয়েছেন। তবুও যখন তিনি সেট হয়ে যান, তখন ম্যাচের রঙ একাই বদলে দিতে পারেন।
সূর্যবংশীর দল রাজস্থান রয়্যালস শেষ পর্যন্ত ফাইনালে যেতে পারেনি। গুজরাট টাইটানসের কাছে দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ারে হেরেছে ৭ উইকেটে। সূর্যবংশীও কাছাকাছি গিয়ে সেঞ্চুরি পাননি।
নিউ চণ্ডীগড়ের উপকণ্ঠে মহারাজা যাদবীন্দ্র সিং স্টেডিয়ামে তখন আইপিএলের দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ার শুরুর তিন ঘণ্টা বাকি। নিরাপত্তাকর্মী পাশ কাটিয়ে গ্যালারিতে ঢোকার সময় সূর্যবংশীর গোলাপি রঙের ০৩ নম্বর জার্সি দেখিয়ে এক কিশোর বলে ওঠে, ‘আমরা এসেছি বৈভবকে দেখতে।’ আসলে এটি ছিল স্টেডিয়ামে উপস্থিত বহু দর্শকের মনের কথা।
এক কিশোরের কান্না
ম্যাচ শেষে বেঞ্চে বসে কাঁদছিলেন ১৫ বছরের সেই কিশোর। বয়সের তুলনায় তার পারফরম্যান্স এতটাই বড় যে সেই কান্নাও ছুঁয়ে গেছে ক্রিকেট দুনিয়াকে। শিরোপা না পাওয়ার কষ্ট থাকলেও পুরো মৌসুমে তিনি যেভাবে খেলেছেন, তা অবিশ্বাস্য। ম্যাচ শেষে রাজস্থান রয়্যালসের প্রধান কোচ কুমার সাঙ্গাকারা বলেন, ‘আজও অসাধারণ ব্যাটিং করেছে বৈভব। চারপাশে উইকেট পড়ছিল, ফলে এটি অনেক কঠিন একটি ইনিংস ছিল। কিন্তু ও স্নায়ুর দৃঢ়তা ধরে রেখেছে। আমাদের লড়াই করার মতো স্কোর এনে দেওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ওর।’
সাঙ্গাকারা আরও বলেন, ‘মাত্র ১৫ বছর বয়সে সে অবিশ্বাস্য রকম পরিণত। খেলার পরিস্থিতি খুব ভালোভাবে বুঝতে পারে, ম্যাচও দারুণ পড়ে। আর সবচেয়ে বড় কথা, ওর মধ্যে কোনো ভয় নেই।’
ভবিষ্যতের বাজারমূল্য কত?
বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, এই মৌসুমে তার পারফরম্যান্সের মূল্য প্রায় ৩৪ দশমিক ৯৭ কোটি রুপি। অথচ তিনি খেলছেন মাত্র এক দশমিক এক কোটি রুপিতে। অর্থাৎ পারফরম্যান্স অনুযায়ী তিনি অনেক বড় ব্যবধানে সবচেয়ে কম পারিশ্রমিক পাওয়া খেলোয়াড়।
ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে এমন পারফরম্যান্স ভবিষ্যতে তাকে ২০ থেকে ২৮ কোটি রুপির বাজারমূল্যে নিয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আইপিএল ২০২৭ ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী রাজস্থান রয়্যালস চাইলে তাকে কম মূল্যে ধরে রাখতে পারবে। তবে তার পারফরম্যান্স এতটাই বড় যে, আগামী নিলামে বড় বড় ফ্র্যাঞ্চাইজির লড়াই নিশ্চিত। রিশভ পন্ত বা যশস্বী জয়সওয়ালের মতো তারকা ক্রিকেটারদের সঙ্গে তুলনা হলেও সূর্যবংশীকে অনেকেই ভবিষ্যতের বিধ্বংসী ব্যাটার হিসেবে দেখছেন।
১৫ বছর বয়সে এত বড় মঞ্চে এমন পারফরম্যান্স ক্রিকেট দুনিয়াকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। বৈভব সূর্যবংশী এখন শুধু একজন খেলোয়াড় নন, বরং আইপিএলের ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। প্রশ্ন একটাই- এই কিশোরের পরবর্তী গন্তব্য কত দূর?











































