আলোচনায় এড. সুজিতও
স্টাফ রিপোর্টার।।
খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পতিত সরকারের আমলের জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ হারুনুর রশিদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিলেও তিনি কখনোই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি, নিজের বংশ পরিচয় লুকিয়ে নামের শুরুতে শেখ যুক্ত করার অভিযোগসহ নারী কেলেঙ্কারীর ঘটনা প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে।
জানাগেছে, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে হারুনের সকল অপকর্ম মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে। শুধু হারুন-ই নয় জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সুজিত অধিকারীর বিরুদ্ধেও সরাসরি সমালোচনা করে নেতারা তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। দল ক্ষমতাচ্যুত হবার পর প্রায় মাস চারেক জেলা সভাপতি শেখ হারুন, সাধারণ সম্পাদক সুজিত অধিকারী রীতিমতো নিখোঁজ ছিলেন। শেখ হারুন বয়স্ক হওয়ায় নেতা-কর্মীরা কিছুটা মেনে নিলেও সুজিত অধিকারীর নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি দলের নেতা-কর্মীরা মেনে নেয়নি স্বাভাবিকভাবে।
বিক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, এই দুই নেতাই দলকে ধ্বংস করেছেন। দল ক্ষমতাসীন থাকার সময়ে মনোনয়ন বানিজ্য, কমিটি বেচা-কেনা, হাইব্রিড নেতাদের স্পেস দেয়াসহ নানারকম অনৈতিক কাজ এই দুই নেতা একত্রে করে গেছেন। জেলা কমিটিসহ জেলার সর্বত্র দলে উপদল সৃষ্টি করেছেন। ৫ আগস্ট দল ক্ষমতাচ্যুত হলে দুই নেতাই পালিয়ে যান। এই দুই নেতা দলের কোন নেতা-কর্মীরই খোঁজ নেননি। অঢেল সহায় সম্পত্তির মালিক হওয়া সত্বেও দলের দু:সময়ে কোন নেতা-কর্মীকে দশটি টাকা দিয়ে পর্যন্ত সাহায্য করেননি। শেখ হারুন টানা পনের বছর ক্ষমতায় ছিলেন। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হবার পাশাপাশি দফায় দফায় খুলনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হন। চেয়ারম্যান হবার পরে নিজেকে দুর্নীতির রন্ধে রন্ধে মিশিয়ে ফেলেন।
কথিত এই মুক্তিযোদ্ধা শেখ হারুন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হয়েই নিজ চেম্বারকে রীতিমতো বালাখানা বানিয়ে ফেলেন। তার ওখানে দিনভর সুন্দরী মহিলাদের আনাগোনা ছিলো ওপেন সিক্রেট। তিনি তাদের সাহচর্য খুব এঞ্জয় করতেন। নিজ চেম্বারে রেড লাইট জ্বালিয়ে ব্যক্তিগত পাহারা বসিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা দলের নারী কর্মীদের নিয়ে অনৈতিক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন। বিনিময়ে তার কাছে আসা মহিলাদের জেলা পরিষদ থেকে নানা সুযোগ সুবিধা- নগদ টাকা সহায়তা করতেন।
সুত্র বলছে, এসব কর্মকাণ্ডে শেখ হারুন সত্যিকার অর্থেই লাজ-লজ্জ বিহীন একজন বেশরম প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। নগর যুব মহিলা লীগের একজন মধ্য বয়স্কা বিধবা বিতর্কিত নেত্রীকে নিয়মিত নগদ টাকা, জেলা পরিষদের লাখ লাখ টাকার কাজ বিনা টেন্ডারে দিয়েছিলেন শেখ হারুন।
সুত্র বলছে, এই কারনে বিভিন্ন সময়ে জেলার নেতারা ওই নারীনেত্রীকে জেলা পরিষদে আসা বন্ধ করলেও সেটা বেশি দিন কার্যকর হয়নি। শেখ হারুনের আসকরা পেয়ে পুনরায় নিয়মিতই জেলা পরিষদে আসতেন। ওই নারী নেত্রী নিত্য নতুন অল্প বয়সী মেয়েদের নিয়ে শেখ হারুনের কাছে হাজির হতেন। দল এবং দলের বাইরে বিভিন্ন মেয়েদের নিয়ে শেখ হারুন তার অফিসে মনোরঞ্জনে সময় কাটাতেন। বিষয়টি ছিলো ওপেন সিক্রেট। শেখ হারুন নিজের রেস্টরুম লক করে প্রকাশ্যেই নারিসংগ উপভোগ করতেন। এই সময়ে রেস্টরুমের বাইরে অসংখ্য নেতা-কর্মী অসহায়ের মতো বসে থাকতেন। সুত্রমতে, শেষ বয়সে তার লাম্পট্য সকল সীমা ছাড়িয়ে যায়। দলের নেতা-কর্মীরা মুখ বুজে এসব অনৈতিক কর্মকান্ড সহ্য করতে শেখ পাওয়ারের কারনে।
জেলা আওয়ামী লীগের একজন সহ-সভাপতি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, তিনি দুই ঘন্টা ধরে শেখ হারুনের সাথে দেখা করার জন্য জেলা পরিষদে তার চেম্বারে অপেক্ষায় ছিলেন, অথচ আমাদের শ্রদ্ধেয় নেতা আলতু- ফালতু মেয়ে নিয়ে তাদের সামনেই তার রেস্টরুমে সময় কাটিয়েছেন, যেটা তাদের জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর ছিলো। শেখ হারুনের এমন অপকর্ম তাদের চরমভাবে অপমানিত ও আহত করেছে।
অন্যদিকে, হারুনের সীমাহীন দুর্নীতিতে জেলা পরিষদ সর্বস্বান্ত। নগরীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ডাকবাংলা মার্কেট ও চুকনগর বাজারে অবস্থিত জেলা পরিষদের মার্কেটে দোকান বরাদ্দে অনিয়ম নিয়ে দুদক ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে।
জানা গেছে, প্রাথমিক তদন্তে দুদক এই দুই জায়গায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য প্রমাণ পেয়েছে। এর বাইরে শেখ হারুন খুলনার ঐতিহ্যবাহী মিয়া পরিবারের সন্তান হওয়া সত্বেও ৮০র দশকে নিজের নামের আগে “শেখ” লিখে নিজেকে শেখ বংশের সন্তান হিসাবে পরিচয় দেয়া শুরু করেন। দল পরিবর্তন, নেতা পরিবর্তন এই সমাজে দৃশ্যমান হলেও শেখ হারুন রীতিমতো নিজের বংশ পরিবর্তন করে ছাড়েন। বিষয়টি একেবারেই নজিরবিহীন। ৯৬ তে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলে শেখ হারুন নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দেয়া শুরু করেন। নামের আগে মুক্তিযোদ্ধা লেখা শুরু করেন। এভাবেই তিনি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সেজে সরকার থেকে যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা নেওয়া শুরু করেন।
নিজের প্রচুর বিত্ত-বৈভব থাকা সত্বেও সরকারি খরচে হজ আদায় করে সমালোচনার মুখে পড়েন। সুত্র বলছে, ব্যক্তিজীবনে শেখ হারুন নামাজ পড়েন না অথচ সব সময়ে তিনি মাথায় টুপি পরে থাকেন। তার ঘনিষ্ঠ নেতারাই বলেছেন, প্রকৃত অর্থেই শেখ হারুন একজন ভন্ড। টাকা-নারী আর ভন্ডামি ছাড়া তিনি কিছুই বুঝেন না। জানা গেছে, ব্যয় বহির্ভূত আয় ও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সাজার কারনে দুদকের তদন্ত তার বিরুদ্ধে চলমান।
ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার বিষয়ে খুলনা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক জেলা কমান্ডার, খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এডভোকেট এম এম মুজিবর রহমান গণমাধ্যমকে বলেছেন, তিনি দীর্ঘদিন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের জেলা কমান্ডারের দায়িত্বে ছিলেন। প্রায় এক দশক দায়িত্ব পালন করাকালীন সময়ে তিনি কোন দিন শোনেননি শেখ হারুন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। দক্ষিণাঞ্চলের বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা কামরুজ্জামান টুকুর বরাত দিয়ে এম এম মুজিবর আরও জানান, শেখ হারুন মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ভারতে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের বাজার ঘাট করে দিয়েছেন। শেখ হারুন সরাসরি রণাঙ্গণে যুদ্ধ করেছেন এমন রেকর্ড কোথাও পাওয়া যায়নি।
সুত্রমতে, মুক্তিবার্তায় একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে শেখ হারুনের নাম নেই। তিনি কোন সেক্টরে, কার অধীনে, কোন এলাকায়, কোন সময়ে যুদ্ধ করেছেন, এটাও শেখ হারুন আজ অবধি বলতে পারেননি। শেখ হারুনের এসব অপকর্ম তথা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সাজার ঘটনা ফাঁস হয়ে যাওয়ায় দলের নেতা-কর্মীরা প্রচন্ড বিব্রত, হতাশ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে খুলনা জেলা আওয়ামী একজন সহ-সভাপতি বলেছেন, তিনি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা, এটা ভাবতেও অবাক লাগছে। একজন সিনিয়র রাজনীতিক হিসাবে এমন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় বহন করা ঠিক না। যদি ঘটনা সত্য হয়, তবে তার বিচার হওয়া উচিত।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান বলেছেন, হারুন-সুজিত জুটি ফুটবলের ৮০’র দশকে সালাহউদ্দিন-চুন্নু জুটিকেও হার মানিয়েছেন। চেয়ারম্যান মনোনয়নে জেলার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দুজনেরই স্বাক্ষর প্রয়োজন হতো বিধায় একজন টাকা হাতে পেয়ে স্বাক্ষর করে অন্যজনকে বলতেন, আমি পেয়েই স্বাক্ষর দিয়েছি, তুমিও দিয়ে দাও। এভাবেই তারা ভাগে যোগে চলতেন। জেলার কয়রা- ডুমুরিয়ার দুটি শুন্য আসনে উপ নির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্যের পরে শেখ হারুনের পক্ষ থেকে জেলা পরিষদের টেন্ডারের গাড়ি গিফট পান সাধারণ সম্পাদক। উপজেলা নির্বাচনে মনোনয়ন বানিজ্য করে এই জুটি কোটি কোটি টাকা আয় করেন। তাদের মনোনয়ন বানিজ্য ও অতিরিক্ত অর্থ লোভের কারনে জেলার অনেক ইউনিয়নে সর্বশেষ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অধিকাংশ জায়গায় চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হতে ব্যর্থ হয়। এসব জায়গায় বিদ্রোহী প্রার্থী বিজয় লাভ করেন। এমনকি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হারুনের আপন ভাইপো ও আপন ভাগ্নে চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হতে ব্যর্থ হন। আবার বিভিন্ন জায়গায় উপজেলা চেয়ারম্যান পদে সভাপতি- সাধারণ সম্পাদক দুইজন দুই প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছেন এমন ঘটনা ছিলো ওপেন সিক্রেট। এই জুটি জেলা কমিটি গঠনে ব্যাপক দুর্নীতির আশ্রয় নেন। টাকার বিনিময়ে ঢাকাতে বসবাসরত একাধিক নেতাকে তারা জেলা কমিটিতে জায়গা দেন।
সুজিত অধিকারীর খুব ঘনিষ্ঠ একনেতা দাবি করেছেন, এরশাদ জামানায় সুজিত কোন দিন রাস্তায় নামেননি বা আন্দোলন করেননি। ৯০ সালে এরশাদের পতন পর্যন্ত খুলনার রাজপথে মিছিল সমাবেশ করেছেন এমন অন্তত দুই ডজন নেতা-কর্মীদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, সুজিত নামে কাউকেই তারা রাজপথে দেখেননি। এই সুজিত অধিকারী আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হবার আগে তিনি খুলনায় একেবারেই অপরিচিত ছিলেন। দলের একাধিক নেতা বলেছেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হয়ে সুজিত মুলত আইন পেশায় অধিকতর সময় দিয়েছেন। সপ্তাহের পাঁচ দিনই তিনি আদালতে সময় দিয়েছেন। শুক্র ও শনিবার তিনি অফডে-তে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে নিজের সুবিধামতো সময় আসতেন।
জেলা আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নাম প্রকাশ না করে বলেছেন, স্রেফ পার্ট টাইম জব হিসাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে ধারণ করতেন সুজিত অধিকারী। খুলনাতে আওয়ামী লীগের পতন হলে জনশ্রুতি আছে, একজন নারি সহকর্মীর বোরখা পরে তিনি পালিয়ে যান। সেই থেকে তিনি টানা চার মাস টোটালি আত্মগোপনে ছিলেন। এই প্রতিবেদন তৈরি করতে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য নিতে তাদের সেল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করলে ফোন বন্ধ থাকায় তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এই বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি বিএমএ সালাম, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান জামাল, সদস্য অসিত বরণ বিশ্বাস কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অন্য দিকে জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শরফুদ্দিন বিশ্বাস বাচ্চু, দপ্তর সম্পাদক রিয়াজ কচির মোবাইল- হোয়াটসঅ্যাপ বন্ধ থাকায় তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।











































