খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে শেরপুরের নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতি ও শ্রীবরদী; ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া এবং নেত্রকোনার কমলাকান্দা ও দুর্গাপুরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকায় গ্রামের পর গ্রাম জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। পানিবন্দি লাখ লাখ মানুষের ভোগান্তি পৌঁছেছে চরমে। উদ্ধার তৎপরতা ও ত্রাণ কর্যক্রম চালানো হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এদিকে বন্যায় শেরপুরে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭ জনে দাঁড়িয়েছে।
শেরপুর ও নালিতাবাড়ী : শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে বন্যার পানির স্রোতে নিখোঁজ হওয়া দুই ভাইয়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ নিয়ে বন্যায় ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। শনিবার উপজেলার নন্নী ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুর কুতুবাকুড়া গ্রামের ফসলের মাঠ থেকে সহোদর দুই ভাইয়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মৃতরা হলেন- হাতেম আলী (৩০) ও তার ভাই আলমগীর হোসেন (১৮)। তারা অভয়পুর গ্রামের মৃত বাছির উদ্দিনের ছেলে। এর
আগে নালিতাবাড়ী ও ঝিনাইগাতীতে বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছেন ইদ্রিস আলী, খলিলুর রহমান ও বাঘবেড় বালুরচর গ্রামের ওমিজা বেগম, পোড়াগাঁও ইউনিয়নের বাতকুচি গ্রামের আব্দুল হেকিমের স্ত্রী জহুরা বেগমসহ ৫ জন।
সীমান্তবর্তী জেলা শেরপুরের সবকটি পাহাড়ি নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বাঁধ ভেঙে ও উপচে প্লাবিত হয়েছে নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতি ও শ্রীবরদীর ১৬ গ্রাম। আর শনিবার রাতে নতুন করে নকলা ও সদর উপজেলার ৭ ইউনিয়নে পানি প্রবেশ করায় পানিবন্দি অবস্থায় দুর্ভোগে পড়েছে দুই লাখ মানুষ।
নালিতাবাড়ী উপজেলার ১২ ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা এলাকা ছাড়াও নদীতীরবর্তী গ্রামগুলো বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। নিম্নাঞ্চলের ইউনিয়নগুলোর নতুন নতুন গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। রান্না করতে না পেরে অভুক্ত রয়েছেন এলাকার হাজার হাজার মানুষ। প্রবল স্রোত নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে তীরবর্তী গ্রামের বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি ল-ভ- করে দিয়েছে। ক্ষতবিক্ষত করেছে এলাকার যাতায়াতের রাস্তাঘাট। এতে বেশ কয়েকটি স্থানে জেলা শহরের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।
রবিবার সকাল থেকে পাহাড়ি নদীগুলোতে পানির তীব্রতা কিছুটা কমে এলেও ভাটি অঞ্চলের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হতে শুরু করেছে। বন্যার্ত মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে উঁচু রাস্তা, স্কুল ও হাটবাজারে আশ্রয় নিয়েছেন। পাশাপাশি পানিতে নিমজ্জিত হয়ে আছে সবজি ক্ষেতসহ চলতি আমন ধানের মাঠ।
এ ছাড়া অনেক মানুষের মাটির দেয়ালের বসতঘর ধসে পড়েছে। অধিকাংশ পুকুরের মাছ ও পোলট্রি খামার ঢলের পানিতে ভেসে গেছে। স্রোতের তোড়ে প্রধান সড়ক ভেঙে গেছে। গাজীর খামার টু শেরপুর, নালিতাবাড়ী টু তিনআনি-শেরপুর ও বারমারী-নন্নী টু শেরপুর জেলা শহরের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। চিকিৎসা, খাদ?্য ও আবাসন সংকটে অনেক নারী ও শিশুদের নিয়ে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন বানভাসিরা।
বহু পরিবারের মানুষ জীবন বাঁচাতে গরু-ছাগল নিয়ে হাটবাজার ও স্থানীয় স্কুল-কলেজে আশ্রয় নিয়েছেন। ইতোমধ্যে সরকাারভাবে, বিজিবি, স্থানীয় বিএনপি ও বেশ কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের উদ্যোগে কিছু পরিমাণে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে, যা একেবারেই অপ্রতুল।
হালুয়াঘাট (ময়মনসিংহ) : মযমনসিংহে ভারত সীমান্তবর্তী উপজেলা হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়ার ৮০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এর সঙ্গে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন এ দুই উপেজলার লক্ষাধিক মানুষ। নতুন করে বন্যার অবনতির কথা জানিয়েছেন এলাকাবাসী। দুটি উপজেলার পানিবন্দি মানুষের জন্য ২০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল এবং খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যাপক সংকট রয়েছে।
টানা তিন দিন ধরে প্রবল বর্ষণে বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ভেসে গেছে হাজার হাজার মৎস্য খামার। পানির নিচে তলিয়ে গেছে একরের পর একর আমন ফসল। হালুয়াঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছেন। ইতোমধ্যে বন্যাদুর্গত এলাকায় উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। রবিবার সকালে হালুয়াঘাটের বিভিন্ন বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেন বিভাগীয় কমিশনার উম্মে সালমা তানজিয়া।
কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর (নেত্রকোনা) : টানা দুদিন অতিবর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলায় নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে প্লাবিত হচ্ছে নদীতীরবর্তী ও নিম্নাঞ্চল। পানির তীব্র স্রোতে কিছু গ্রামীণ সড়ক ভেঙে গেছে। বেশ কিছু বাড়িঘরও ধসে গেছে। এ ছাড়া অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠ ও বারান্দায় পানি ঢুকেছে। অতিবর্ষণ ও পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকলে কলমাকান্দায় বন্যার শঙ্কা রয়েছে। গত শনিবার মধ্য রাত থেকে রবিবার সকাল পর্যন্ত কলমাকান্দায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ৭২ মিলিমিটার। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে উপজেলার হাজারও মানুষ। পাশাপাশি তলিয়ে গেছে শতাধিক পুকুর, আউশ ফসল, রোপা, আমন ফসল, রবিশস্যসহ বীজতলা। পাহাড়ি ঢলের কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে কলমাকান্দা সদরের সঙ্গে চার ইউনিয়নের যোগাযোগব্যবস্থা। অপরদিকে কলমাকান্দা সদর ইউনিয়নসহ কয়েকটি ইউনিয়নের বেশ কিছু গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার সাত ইউনিয়নের মধ্যে পাঁচ ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকে প্লাবিত হয়ে গেছে অনেক এলাকা। এতে প্রায় ৩০-৪০ গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সূত্র বলছে, গত কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সোমেশ্বরী নদীর পানি বৃদ্ধি পেলেও এখনও বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
সোমেশ্বরী ও পার্শ্ববর্তী নেতাই নদীর পানি প্রবেশ করে উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের ৪০-এর অধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় জীবনযাপন করছেন। পানিতে তলিয়ে গেছে ফসলি জমি। গবাদিপশু নিয়েও বিপাকে পড়েছেন মানুষ। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের সংকট।
সিরাজগঞ্জ : ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে আবারও সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২৪ ঘণ্টায় সিরাজগঞ্জে যমুনার পানি ২৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে পানি বাড়লেও তা বিপদসীমার অনেক নিচে রয়েছে।
বগুড়া : অব্যাহত ভারী বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা পানির কারণে বগুড়ার সারিয়াকান্দির যমুনা ও বাঙালি নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীতে পানি ৭৬ সেন্টিমিটার এবং বাঙালি নদীর পানি ৯৭ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। পানি বাড়ায় ডুবে গেছে যমুনার নিচু চরগুলো। প্লাবিত হয়েছে বাঙালি নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলও। এ ছাড়া সারিয়াকান্দি উপজেলার চালুয়াবাড়ী, সদরের আংশিক, কাজলা, কর্ণিবাড়ী, বোহাইল এবং হাটশেরপুর ইউনিয়নের আংশিক এলাকা পানিতে ডুবে গেছে। অন্যদিকে ধুনট উপজেলার সহরাবাড়ি, বৈশাখীচর এবং সোনাতলার নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানি বাড়ায় যমুনার আগের নৌরুট আবারও চালু হয়েছে।
সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) : ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বাড়ছে তিস্তার পানি, ডুবছে নিচু এলাকা। পাশাপাশি ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে বিভিন্ন চরে। পৌরসভার রামডাকুয়া এলাকায় অবস্থিত কেন্দ্রীয় শ্মাশানঘাটে পানি উঠেছে। নদীর পানি বাড়ায় চরগুলোর যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। নৌকা ছাড়া এক চর থেকে অন্য চরে যাওয়া-আসা করা সম্ভব হচ্ছে না।











































