Home আন্তর্জাতিক হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে নতুন শর্ত ইরানের

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে নতুন শর্ত ইরানের

0


আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে আবারও মুখোমুখি অবস্থানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। তেহরানের অনুমোদন ছাড়া এই নৌপথ ব্যবহার করলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে সতর্ক করেছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। একই সঙ্গে সম্প্রতি প্রস্তাবিত বিকল্প নৌপথকে তারা অবৈধ ও বিপজ্জনক বলে উল্লেখ করেছে।

সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের সংঘাতের সময় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল ইরান। পরবর্তীতে দুই দেশের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও স্থায়ী সমাধানের আলোচনা চলাকালেই এই কৌশলগত জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে বিরোধ দেখা দিয়েছে।

ইরান জানিয়েছে, ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজ থেকে সামুদ্রিক সেবা বাবদ ফি আদায় করা হবে। তবে ওয়াশিংটনের দাবি, এটি আন্তর্জাতিক নৌপথ হওয়ায় কোনো দেশ একতরফাভাবে শুল্ক বা টোল আরোপ করতে পারে না।

তেহরানের সাম্প্রতিক বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ অটুট রাখতে তারা অনড় অবস্থানে রয়েছে। যদিও গত সপ্তাহে এই রুটে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে দুই পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, তারপরও জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অনিশ্চয়তা কাটেনি।

সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক নৌ-তথ্য সংস্থা নিরাপত্তার স্বার্থে জাহাজগুলোকে ওমানের জলসীমা ঘেঁষে দক্ষিণের বিকল্প রুট ব্যবহারের পরামর্শ দেয়। সংস্থাটি জানায়, ওই পথটি মাইনমুক্ত এবং আপাতত চলাচলের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ।

শিপ-ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠান মেরিন ট্রাফিকের তথ্য বলছে, যুদ্ধবিরতির পর জাহাজ চলাচল কিছুটা বেড়েছে। গত সপ্তাহের শেষদিকে ৯৩টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে, যা আগের সময়ের তুলনায় প্রায় তিনগুণ। তবে সংঘাত শুরুর আগে প্রতিদিন ১০০টির বেশি জাহাজ এই পথে চলাচল করত।

মঙ্গলবার বাণিজ্যিক ও জ্বালানি বহনকারী ৩১টি জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে জাহাজগুলো ইরান, ওমান এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত বিভিন্ন রুট মিলিয়ে ব্যবহার করছে। তবে অপারেটররা এখনও পরিস্থিতিকে পুরোপুরি নিরাপদ মনে করছেন না।

এরই মধ্যে গত মে মাসে ইরানের পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, সামুদ্রিক বাণিজ্যে চাপ সৃষ্টি করে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করছে তেহরান। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের টোল আদায়ের উদ্যোগ মেনে নেওয়া হবে না।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের বিশ্লেষক হেলিমা ক্রফ্টের ভাষ্য, সংঘাত-পরবর্তী সময়েও যদি ইরান এই পথের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে, তাহলে বিশ্ববাজারে তেল পরিবহনের প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।

বৃহস্পতিবার আইআরজিসি পুনরায় জানিয়ে দেয়, হরমুজ প্রণালি পারাপারের জন্য কেবল ইরান ঘোষিত রুটই বৈধ। অন্য কোনো পথ ব্যবহার করলে তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হবে বলে সতর্ক করা হয়।

বর্তমানে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) এবং ওমানের সমন্বয়ে একটি অস্থায়ী ব্যবস্থার আওতায় বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে পারাপারের উদ্যোগ চলছে। এই ব্যবস্থায় গত তিন দিনে ৫৭টি জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। তবে বিকল্প রুট ব্যবহারের পরপরই ইরানের নতুন এই সতর্কবার্তা পরিস্থিতিকে আবারও উত্তপ্ত করে তুলেছে।

এদিকে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হলে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কীভাবে পরিচালিত হবে, তা এখনও অনিশ্চিত। মধ্যপ্রাচ্য সফরে থাকা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বাহরাইনে সাংবাদিকদের বলেন, আন্তর্জাতিক নৌপথ ব্যবহারের জন্য কোনো রাষ্ট্র একতরফাভাবে শুল্ক আরোপ করতে পারে না।

উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি আরও বলেন, হরমুজে ইরানের টোল আরোপের দাবিকে অঞ্চলটির কোনো দেশ সমর্থন করছে না। একই সঙ্গে তিনি মিত্র দেশগুলোকে আশ্বস্ত করেন, ভবিষ্যতে ইরানের সঙ্গে যেকোনো সমঝোতায় তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই যুক্তরাষ্ট্র এগোবে।

অন্যদিকে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সামরিক বাহিনীর প্রশংসা করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মুখেও দেশটির সশস্ত্র বাহিনী শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। তার দাবি, প্রতিপক্ষ ভেবেছিল অল্প সময়ের মধ্যেই ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে পরাজিত করা সম্ভব হবে, কিন্তু বাস্তবে তাদের সেই হিসাব সফল হয়নি।