খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
এক সময় সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদ আশাশুনি ও শ্যামনগরের গ্রামগুলো ছিল নানা জাতের ফলগাছে সমৃদ্ধ। বাড়ির আঙিনায় দেখা মিলতো আম, জাম, জামরুল, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, সফেদা, বিলম্বি, জলপাই, কুল, করমচা ও নারকেল গাছ। মৌসুম এলেই ফলের সুবাসে মুখর থাকত গ্রাম। শিশুদের পুষ্টির বড় একটি উৎস ছিল এসব দেশীয় ফল।
কিন্তু গত দুই দশকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় ও নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করায় মাটির ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা বদলে দিয়েছে সেই চিত্র। একের পর এক ঘূর্ণিঝড়, সিডর, আইলা, বুলবুল, আম্পান, ইয়াস ও রিমালের আঘাতে উপকূলের পরিবেশে এসেছে বড় পরিবর্তন। অনেক এলাকায় বিলুপ্তির পথে চলে গেছে পরিচিত ফলগাছের বহু জাত।
প্রকৃতি শূন্যতা পছন্দ করে না। যেখানে আম, কাঁঠাল কিংবা লিচু টিকতে পারছে না, সেখানে নতুন করে জায়গা করে নিচ্ছে তাল, নারকেল, তেঁতুল, কদবেল, সফেদা (ছবেদা) ও কয়েকটি দেশীয় লবণ-সহিষ্ণু ফলগাছ। এসব গাছ শুধু টিকেই থাকছে না, বরং ভালো ফলনও দিচ্ছে। আর সেই ফল এখন কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করছে দেশের বড় বড় আচার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান।
সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উপকূলীয় অঞ্চলে সব ফলগাছ সমানভাবে লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে না। আম ও কাঁঠাল তুলনামূলকভাবে কম লবণ সহনশীল; মাটির লবণমাত্রা ২ থেকে ৩ dS/m ছাড়ালে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, পাতা পুড়ে যায় এবং ফলন কমে যায়।
‘আইলার পর থেকে মাটিতে এতবেশি লবণ জমে গেছে যে আম, জাম বা কাঁঠালের একটা চারা রোপণ করলেও তা বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।’
অন্যদিকে জাম কিছুটা বেশি সহনশীল হলেও নারিকেল ও তালগাছ উচ্চমাত্রার লবণাক্ত পরিবেশেও টিকে থাকতে সক্ষম। বিশেষজ্ঞদের মতে, নারিকেল ৬ থেকে ৮ dS/m এবং তাল ৮ dS/m-এর বেশি লবণাক্ত মাটিতেও ভালোভাবে বেড়ে ওঠে। এছাড়া কুল বা বরই ৪ থেকে ৬ dS/m লবণমাত্রার মাটিতেও সন্তোষজনক ফলন দিতে পারে। উপকূলীয় এলাকায় ফলবাগান সম্প্রসারণে তাই লবণ সহনশীল প্রজাতি নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সামাজিক বন বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, উপকূলীয় এলাকায় চরম আবহাওয়া ও লবণাক্ততা সহ্য করে টিকে থাকার অনন্য ক্ষমতা রয়েছে তেঁতুল ও কদবেলের মতো টক জাতীয় ফলগাছের। এর পাশাপাশি সফেদা, পেয়ারা, বরই (কুল), কাঠবাদাম, তাল ও নারকেল গাছ লাগিয়েও এখন ভালো ফলন পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি মিষ্টি পানির পুকুর পাড়ে যেখানে লবণ কম সেখানে আম্রপালির মতো নতুন জাতের আমগাছ লাগানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুল করিম গাজী (৬২) আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের বাড়ির চারপাশে কত রকমের ফলের গাছ যে ছিল, তার কোনো হিসাব নেই। অথচ এখনকার ছেলেমেয়েরা সেসব গাছের নামও ঠিকমতো জানে না। আইলার পর থেকে মাটিতে এত বেশি লবণ জমে গেছে যে আম, জাম বা কাঁঠালের একটা চারা রোপণ করলেও তা বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।’
একই এলাকার কৃষক নিতাই মণ্ডল নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, ‘আগে আমাদের নিজেদের বাগানের ফল দিয়েই পুরো পরিবারের চাহিদা মিটে যেত। আর এখন টাকা দিয়ে ফল কিনে খেতে হয়। লবণাক্ততার কারণে নতুন করে আম, কাঁঠাল বা লিচুর চারা লাগালেও সেগুলো দুই-তিন বছরের বেশি বাঁচে না।’
‘মাটিতে লবণের মাত্রা ৩ থেকে ৫ ডিএস/মিটারের বেশি হলেই ফলজ গাছের শিকড় ‘অসমোসিস’ প্রক্রিয়ার জটিলতায় পড়ে। অর্থাৎ মাটির অতিরিক্ত নোনা ভাবের কারণে গাছ মাটি থেকে পানি, নাইট্রোজেন বা ক্যালসিয়াম শোষণ করতে পারে না, উল্টো গাছের ভেতরের মিষ্টি পানিই মাটিতে বেরিয়ে গিয়ে গাছটি শুকিয়ে মারা যায়।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে জমিতে নোনা জল জমে থাকায় মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা হারিয়ে গেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে তীব্র মিষ্টি পানির সংকট। ফলে প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাবে ফলগাছগুলো অকালেই মরে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট সাতক্ষীরা আঞ্চলিক কার্যালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর কৃষিজমিতে লবণের স্বাভাবিক মাত্রা ধরা হয় ৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি অব স্যালিনিটি (ডিএস)। সেখানে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকার কৃষিজমিতে ২৫ ডিএস মাত্রায় লবণের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
অপরদিকে উপকূলীয় অঞ্চলে মাটি ও পানির লবণাক্ততা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বলে জানিয়েছেন মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) সাতক্ষীরা আঞ্চলিক কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্বে) শামসুন নাহার রত্না।
তিনি বলেন, লবণাক্ততার বিস্তার ও মাত্রা দুই-ই আগের তুলনায় বেড়েছে, যা কৃষি উৎপাদনের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এসআরডিআই পরিচালিত ২০২৬ সালের সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, চলতি বছরের মে মাসে শ্যামনগর উপজেলার খোলপেটুয়া নদীর পানিতে সর্বোচ্চ ৫৫ দশমিক ৩২ ডিএস/মিটার লবণাক্ততা রেকর্ড করা হয়েছে, যা অতীতের সব জরিপের রেকর্ড অতিক্রম করেছে। একই সময়ে কৃষিজমিতে সর্বোচ্চ ১৩ দশমিক ৫০ ডিএস/মিটার লবণাক্ততা পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাটি ও পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধির এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে কৃষি, নিরাপদ পানি এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
‘ কদবেল ও তেঁতুল গাছ এখন সবচেয়ে ভালো টিকে থাকে। খুব একটা পরিচর্যা লাগে না। ঝড়েও সহজে নষ্ট হয় না। এছাড়া তাল গাছ, নারকেল গাছ ও সফেদা গাছে ভালো ফল হয়।’
শামসুন নাহার রত্না বলেন, এই চরম লবণাক্ততার কারণে ফসল ও ফলদ গাছের বৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এজন্য তিনি কৃষকদের মাটি পরীক্ষা করে লবণ-সহিষ্ণু জাত চাষের পরামর্শ দেন। চাষিরা চাইলে সাতক্ষীরার এসআরডিআই কার্যালয়ে এসে একদম বিনা খরচে মাটি পরীক্ষা করিয়ে নিতে পারবেন।
এসআরডিআই-এর এই বৈজ্ঞানিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান (Botany) বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ড. মোছা. নাসরিন আক্তার বলেন, উপকূলের মাটিতে লবণের মাত্রা ৮ থেকে ২৫ ডিএস/মিটার পর্যন্ত উঠছে, যা সাধারণ উদ্ভিদের জন্য একটি ‘ডেড জোন’ বা মৃত্যুফাঁদ।
বিজ্ঞান অনুযায়ী, মাটিতে লবণের মাত্রা ৩ থেকে ৫ ডিএস/মিটারের বেশি হলেই ফলজ গাছের শিকড় ‘অসমোসিস’ প্রক্রিয়ার জটিলতায় পড়ে। অর্থাৎ মাটির অতিরিক্ত নোনা ভাবের কারণে গাছ মাটি থেকে পানি, নাইট্রোজেন বা ক্যালসিয়াম শোষণ করতে পারে না, উল্টো গাছের ভেতরের মিষ্টি পানিই মাটিতে বেরিয়ে গিয়ে গাছটি শুকিয়ে মারা যায়।
প্রফেসর নাসরিন আক্তার আরও ব্যাখ্যা করেন, আম, জাম ও কাঁঠালের মতো ঐতিহ্যবাহী গাছগুলো এই নোনা মাটির চাপ সহ্য করতে পারে না বলেই চারা লাগানোর ২-৩ বছরের মধ্যে মরে যায়। তবে তেঁতুল, কদবেল ও সফেদার কোষীয় গঠন প্রাকৃতিকভাবেই লবণ-সহিষ্ণু (Salt-tolerant)। এদের শিকড় অনেক গভীরে গিয়ে লবণের স্তর ভেদ করে টিকে থাকতে পারে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতায় উপকূলের পুষ্টি ও পরিবেশ রক্ষায় এই বিশেষ দেশীয় জাতগুলোর বনায়নই এখন সবচেয়ে বিজ্ঞানসম্মত সমাধান।
উপকূলীয় এলাকায় ফলের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় শিশু ও নারীদের পুষ্টি পরিস্থিতিতেও প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্যকর্মী ও উন্নয়নকর্মীরা।
শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়নের গৃহিণী রহিমা খাতুন বলেন, আগে বাচ্চারা গাছ থেকে পেয়ারা, কুল, আম পেড়ে খেত। এখন সেগুলো খুব কম পাওয়া যায়। বাজারের ফলের দাম বেশি, সব সময় কেনা যায় না। তবে বাড়ির উঠানে একটি কদবেল গাছে প্রচুর কদবেল হয়েছে।
স্থানীয় একটি এনজিওর পুষ্টি কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত মনিরুজ্জামান বলেন, ‘ফলের বৈচিত্র্য কমে যাওয়া মানে খাদ্যতালিকায় ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের ঘাটতি তৈরি হওয়া। বিশেষ করে শিশু ও নারীরা এর প্রভাব বেশি ভোগ করে। উপকূলে এটি একটি নীরব সংকট হিসেবে দেখা দিচ্ছে।’
উপকূলের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, তেঁতুল, কদবেল, সফেদা, কিছু এলাকায় দেশীয় কুল এবং সীমিত আকারে নারকেল গাছ তুলনামূলক ভালো অবস্থায় রয়েছে।
আশাশুনির খাজরা এলাকার কৃষক মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, কদবেল ও তেঁতুল গাছ এখন সবচেয়ে ভালো টিকে থাকে। খুব একটা পরিচর্যা লাগে না। ঝড়েও সহজে নষ্ট হয় না। এছাড়া তাল গাছ, নারকেল গাছ ও সফেদা গাছে ভালো ফল হয়।
একই এলাকার গৃহিণী শেফালী রানী জানান, কদবেল আগে তেমন গুরুত্ব পেত না। এখন অনেকেই লাগাচ্ছে। ফলও ভালো হয়, বাজারেও চাহিদা আছে। কোনো বাড়তি যত্ন করা লাগে না। এমনিতেই বেড়ে উঠছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, মৌসুমে কালিগঞ্জ, আশাশুনি ও শ্যামনগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ তেঁতুল ও কদবেল সংগ্রহ করা হয়।
কালিগঞ্জ উপজেলার কুশলিয়া হাটের জামাল উদ্দিন বলেন, ঢাকা, যশোর ও খুলনার বিভিন্ন আচার কোম্পানির লোকজন সরাসরি এসে ফল কিনে নিয়ে যায়। তেঁতুলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এছাড়া প্রচুর পরিমাণ কদবেলও বিক্রি হয়।
তিনি বলেন, আগে যেসব ফল শুধু পারিবারিক ব্যবহারে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন সেগুলো অনেক পরিবারের জন্য অতিরিক্ত আয়ের উৎস হয়ে উঠছে।
উপজেলার বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও কোথাও নতুন করে তেঁতুল ও কদবেলের চারা রোপণ করা হয়েছে। সাতক্ষীরা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী এএসএম তারিকুল হাসান খান বলেন, আগে সৌন্দর্যবর্ধন বা ছায়ার জন্য যেসব গাছ লাগানো হতো, সেগুলোর অনেকগুলো এখন টিকছে না। তাই আমরা স্থানীয় পরিবেশে টিকে থাকতে পারে এমন প্রজাতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছি। এর মধ্যে তেঁতুল, কদবেল, খই বাবলা, দেশি নিমসহ বেশ কিছু জাতের গাছ লবণাক্ত এলাকায় টিকে থাকতে পারছে।
তিনি আরও বলেন, বন বিভাগসহ বিভিন্ন দপ্তরের পক্ষ থেকে রাস্তার পাশের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে জলবায়ু সহনশীল প্রজাতি অন্তর্ভুক্ত করা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় বনায়ন কার্যক্রমে নতুন কৌশল গ্রহণের কথা জানান সাতক্ষীরা সামাজিক বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক প্রিয়াংকা হালদার।
তিনি জানান, ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে আগের অনেক প্রজাতির গাছ টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে লবণাক্ততা ও চরম আবহাওয়া সহনশীল প্রজাতির গাছ রোপণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, তেঁতুল ও কদবেলের মতো টক জাতীয় ফলগাছ উপকূলীয় পরিবেশে টিকে থাকার বিশেষ সক্ষমতা দেখিয়েছে। পাশাপাশি সফেদা, পেয়ারা, বরই ও নারকেল গাছও ভালো ফলন দিচ্ছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলে বর্তমানে আমলকি, তেঁতুল, কদবেল, অর্জুন, খয়ের, খই, বাবলা, দেশি নিম ও কাঠবাদাম গাছ তুলনামূলক ভালোভাবে বেড়ে উঠছে। সামাজিক বন বিভাগ স্থানীয় জনগণের মধ্যে এসব গাছের চারা বিতরণ করছে। এছাড়া উপকূলীয় সুরক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের অংশ হিসেবে নদীতীরে ম্যানগ্রোভ প্রজাতির কেওড়া ও বাইন গাছের চারা রোপণ করা হচ্ছে।
সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক কাউছার আজিজ জানিয়েছেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সরকার দেশব্যাপী ৫ কোটি গাছ রোপণের মহতী উদ্যোগ নিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সাতক্ষীরা জেলাতেও চলতি বছর থেকে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হয়েছে, যেখানে ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের চরম বৈরী আবহাওয়ায় মাটির তীব্র লবণাক্ততা সহ্য করে যে গাছগুলো দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে সক্ষম, বনায়ন কর্মসূচিতে এবার সুনির্দিষ্টভাবে সেই জাতের গাছ লাগানোর ওপরই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে; এবং এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে লবণাক্ততার বিস্তার শুধু কৃষিকেরই নয়, গ্রামীণ জীবনের পুরো পরিবেশ ব্যবস্থাকে বদলে দিচ্ছে। ফলগাছের বৈচিত্র্য কমে যাওয়া সেই পরিবর্তনের একটি দৃশ্যমান উদাহরণ।
একদিকে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী ফলবাগান, অন্যদিকে নতুন বাস্তবতায় অভিযোজিত হচ্ছে তেঁতুল, কদবেল ও কয়েকটি দেশীয় প্রজাতি। এসব গাছ এখন শুধু পরিবেশ রক্ষার উপাদান নয়, স্থানীয় অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তারও অংশ হয়ে উঠছে।
উপকূলের শিশুরা এখন এমন এক বাস্তবতায় বড় হচ্ছে, যেখানে তাদের বাবা-মায়ের পরিচিত ফলগাছগুলো দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। আম, কাঁঠাল বা লিচুর জায়গা দখল করছে তেঁতুল, কদবেল ও তাল। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজনের এই গল্প একদিকে যেমন টিকে থাকার সংগ্রামের, অন্যদিকে তেমনি হারিয়ে যাওয়া জীববৈচিত্র্য, পুষ্টি ও গ্রামীণ সংস্কৃতিরও গল্প। প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতের উপকূল কি শুধু লবণ-সহিষ্ণু কয়েকটি গাছের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে, নাকি বিজ্ঞান ও পরিকল্পনার সমন্বয়ে ফিরিয়ে আনা যাবে ফলের বৈচিত্র্য?











































