Home Lead কাঁঠালের খোসা থেকে পরিবেশবান্ধব ‘চামড়া’, বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনা

কাঁঠালের খোসা থেকে পরিবেশবান্ধব ‘চামড়া’, বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনা

4
এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি


খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।


বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়নের জোয়ারে ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে এক অভূতপূর্ব নীরব বিপ্লব শুরু হয়েছে। পশুর চামড়া ব্যবহার নিয়ে বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান নৈতিক বিতর্ক এবং কৃত্রিম বা সিনথেটিক চামড়ার মারাত্মক পরিবেশগত ক্ষতির প্রেক্ষাপটে গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরেই খুঁজছিলেন সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প। আর এই অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দুতে এবার উঠে এসেছে বাংলাদেশের জাতীয় ফল ‘কাঁঠাল’।

এক সময় যা কেবলই আবর্জনা হিসেবে ফেলে দেওয়া হতো, সেই কাঁঠালের খোসা, বোঁটা ও ভেতরের আঁশ থেকে এখন তৈরি হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের উন্নত উদ্ভিজ্জ চামড়া বা ‘ভেগান লেদার’ (Vegan Leather)। বিশ্বখ্যাত গবেষক ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলো প্রমাণ করেছে যে, কাঁঠালের বর্জ্য ব্যবহার করে সফলভাবে পরিবেশবান্ধব চামড়া তৈরি সম্ভব, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্লাস্টিক ও পশুর চামড়ার শক্তিশালী বিকল্প হয়ে উঠছে।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কাঁঠাল উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সামনে এই চামড়া শিল্প এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে যাচ্ছে। আমাদের দেশে প্রতি বছর উৎপাদিত লাখ লাখ টন কাঁঠালের প্রায় ৬০ শতাংশই বর্জ্য হিসেবে অবহেলিত থাকে। এই বিশাল পরিমাণ বর্জ্যকে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ‘সবুজ সোনা’ বা গ্রিন গোল্ডে রূপান্তর করা সম্ভব।

যদি সঠিক উপায়ে এই নতুন বায়োপলিমার প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণ করা যায়, তবে আগামী এক দশকে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী চামড়া শিল্পের পাশাপাশি এই ‘ভেগান লেদার’ খাত বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় এনে দিতে পারে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বাংলাদেশ ভ্যালু চেইন ডিজাইন রিপোর্টের তথ্যমতে, এই ফেলে দেওয়া অংশ থেকেই এখন বিশেষ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তৈরি হচ্ছে উচ্চমানের বায়োপলিমার লেদার, যা দেখতে হুবহু পশুর চামড়ার মতোই মসৃণ, দীর্ঘস্থায়ী ও ফ্লেক্সিবল বা নমনীয়।

কাঁঠাল থেকে চামড়া তৈরির বৈজ্ঞানিক প্রসেস বা উৎপাদন প্রক্রিয়া

কাঁঠাল থেকে বাণিজ্যিক ও শিল্প খাতের উপযোগী চামড়া তৈরির প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব ও রাসায়নিক দূষণমুক্ত। আন্তর্জাতিক প্লাস্টিক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ক গবেষণা এবং ফিলিপাইনের বিখ্যাত ‘লংকা তুলদ (LANGKAtulad)’ পরিবেশ প্রজেক্টের (২০২৫) কার্যপ্রণালি সূত্র ধরে কাঁঠাল থেকে ভেগান লেদার তৈরির প্রধান ধাপগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

১. বর্জ্য সংগ্রহ ও বাছাইকরণ: প্রথমে মাঠ পর্যায় বা প্রসেসিং প্ল্যান্ট থেকে কাঁঠালের পরিত্যক্ত অংশ যেমন- বাইরের কাঁটাযুক্ত খোসা, বোঁটা ও ভেতরের অতিরিক্ত আঁশ সংগ্রহ করা হয়। এরপর এগুলো ধুয়ে পরিষ্কার করে ব্যাকটেরিয়ামুক্ত করা হয়।

২. তন্তু নিষ্কাশন: পরিষ্কার করা খোসা ও আঁশগুলোকে বিশেষ হাইড্রোলিক ক্রাশার মেশিনে দিয়ে টুকরো বা পেস্ট করা হয়। এরপর রাসায়নিক বা এনজাইমেটিক ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে তা থেকে লিগনোসেলুলোজিক ফাইবার আলাদা করা হয়।

৩. বায়োপলিমার মিশ্রণ: এই প্রাকৃতিক তন্তুর স্থায়িত্ব ও জলপ্রতিরোধী ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য এর সাথে প্রাকৃতিক রেজিন, উদ্ভিজ্জ মোম ও পরিবেশবান্ধব পলিমার যেমন- পলিভিনাইল অ্যালকোহল মিশ্রিত করা হয়। এই পর্যায়টিকে ‘বায়োমিমেটিক মেটেরিয়াল ডিজাইন’ বলা হয়, যা সাধারণ উদ্ভিদ তন্তুকে চামড়ার মতো টেক্সচার দেয়।

৪. শিট প্রস্তুতকরণ ও ড্রাইং: প্রস্তুতকৃত মিশ্রণটিকে নিখুঁত স্তরে সাজিয়ে বড় রোলিং মেশিনের সাহায্যে পাতলা শীট বা লেয়ারে রূপ দেওয়া হয়। এরপর নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় ড্রায়ার বা ওভেনে শুকানো হয় যাতে আর্দ্রতা পুরোপুরি চলে যায় ও উপাদানটি জমাট বাঁধে।

৫. ফিনিশিং ও টেক্সচারিং: শুকিয়ে যাওয়ার পর এই ভেগান লেদারকে বিভিন্ন প্রাকৃতিক রঙে রাঙানো হয় ও বিশেষ রোলার দিয়ে এর ওপর পশুর চামড়ার মতো প্রাকৃতিক খাঁজ বা ‘গ্রেন টেক্সচার’ ফুটিয়ে তোলা হয়।

ফলাফলস্বরূপ যে উপাদানটি পাওয়া যায়, তা দেখতে ও স্পর্শ করতে হুবহু আসল চামড়ার মতোই চমৎকার। কিন্তু এটি তৈরিতে কোনো পশুর ক্ষতি করতে হয় না ও পরিবেশের ওপর কার্বন ফুটপ্রিন্ট থাকে শূন্যের কাছাকাছি।

কেন এই প্রযুক্তি বৈশ্বিক ও দেশীয় বাজারে গুরুত্বপূর্ণ?

বিশ্বজুড়ে এখন টেকসই ফ্যাশনের (Sustainable Fashion) জয়জয়কার। ঐতিহ্যবাহী ট্যানারি শিল্পে পশুর চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় ব্যবহৃত ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়ামসহ বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের চরম ক্ষতি করছে। আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংস্থাগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, বিশেষ করে বাংলাদেশের হাজারীবাগ বা সাভারের চামড়া শিল্পের বর্জ্য বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীকে যেভাবে দূষিত করেছে, তা আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচিত।

বিশ্বে কোন ব্র্যান্ড বা প্রতিষ্ঠান কাঁঠাল থেকে চামড়া তৈরি করছে?

বিশ্বজুড়ে পশুর চামড়ার বিকল্প হিসেবে ‘ভেগান লেদার’ বা উদ্ভিজ্জ চামড়ার বাজার দ্রুত বড় হলেও, কাঁঠাল থেকে বাণিজ্যিক স্তরে চামড়া উৎপাদন ও তা দিয়ে পণ্য তৈরি করা ব্র্যান্ডের সংখ্যা এখনো বেশ সীমিত। কারণ, আনারস বা মাশরুম দিয়ে তৈরি ভেগান লেদার যতটা বাণিজ্যিকভাবে পরিপক্ব, কাঁঠালের চামড়া বা Jackfruit Leather এখনো মূলত স্টার্টআপ ও ল্যাব-পর্যায়ের উদ্ভাবন থেকে বাণিজ্যিকীকরণের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ কেন এই শিল্পের বিশ্বসেরা হাব হতে পারে?

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মতে, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম প্রধান কাঁঠাল উৎপাদনকারী দেশ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে ১০ লাখ টনেরও বেশি কাঁঠাল উৎপাদিত হয়:। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, আমাদের দেশে হিমাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের অভাবে এই উৎপাদিত কাঁঠালের একটি বিরাট অংশ মাঠেই পচে নষ্ট হয় অথবা আবর্জনা হিসেবে ডাম্পিং করা হয়।

এফএও-এর ‘ওয়ান কান্ট্রি ওয়ান প্রায়োরিটি প্রোডাক্ট’ (ওসিওপি) উদ্যোগের আওতায় বাংলাদেশে কাঁঠালকে প্রধান অগ্রাধিকারমূলক পণ্য হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে। এই প্রজেক্টের উদ্দেশ্যই হলো কাঁঠালের বহুমুখী বাণিজ্যিক ব্যবহার নিশ্চিত করা। এফএও-এর অধীনে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি নারী উদ্যোক্তা ক্ষুদ্র পরিসরে কাঁঠালের আচার, বার্গার এবং কেকের পাশাপাশি পরীক্ষামূলকভাবে ‘প্ল্যান্ট-বেসড লেদার’ বা উদ্ভিজ্জ চামড়া তৈরি করা শুরু করেছেন।

আমাদের সাভারের ট্যানারি শিল্পে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক বাজারের সংযোগ রয়েছে। এর সাথে যদি কাঁঠালের বর্জ্য থেকে কাঁচামাল সরবরাহের চেইন যুক্ত করা যায়, তবে এটি দেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের পর সবচেয়ে বড় টেকসই ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

অর্থনৈতিক সুফল ও সার্কুলার ইকোনমি

বাংলাদেশ যদি কাঁঠালের চামড়া শিল্পকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়, তবে এর অর্থনৈতিক সুফল হবে বহুমুখী:

কৃষকদের বাড়তি আয়

সাধারণত কাঁঠালের মৌসুম এলে বাজারে দাম অনেক কমে যায়। অনেক সময় চাষিরা বিক্রির খরচ তুলতে না পেরে ফল মাঠেই ফেলে দেন। কিন্তু যদি খোসা ও বর্জ্য বাণিজ্যিক মূল্যে কেনা শুরু হয়, তবে প্রান্তিক কৃষকরা প্রতিটি কাঁঠাল থেকে বাড়তি অর্থ উপার্জন করতে পারবেন।

পরিবেশ দূষণ রোধ

কাঁঠালের খোসা দ্রুত পচে মারাত্মক দুর্গন্ধ এবং মিথেন গ্যাসের সৃষ্টি করে, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এই বর্জ্য ট্যানারিতে চলে গেলে শহর ও গ্রামীণ অঞ্চলের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অনেক সহজ হবে।

বিকল্প কর্মসংস্থান

কাঁচামাল সংগ্রহ, ফাইবার নিষ্কাশন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় হাজার হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে, বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি পাবে।

চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়

সম্ভাবনা আকাশচুম্বী হলেও বাংলাদেশের জন্য এই পথটি সম্পূর্ণ মসৃণ নয়। এই শিল্পকে সফল করতে হলে যেসব বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে-

প্রযুক্তির অভাব

কাঁঠালের ফাইবার থেকে নিখুঁত লেদার শিট বানানোর উচ্চ প্রযুক্তির মেশিন ও ল্যাবরেটরি বাংলাদেশে এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এর জন্য সরকারি অনুদান ও বিদেশী প্রযুক্তির স্থানান্তর প্রয়োজন।

মৌসুমী কাঁচামাল

কাঁঠাল মূলত একটি নির্দিষ্ট ঋতুতে (এপ্রিল থেকে আগস্ট) পাওয়া যায়। তাই সারা বছর কাঁচামাল সচল রাখতে হলে খোসা সংরক্ষণ বা পাল্প আকারে ড্রাইং করে রাখার আধুনিক হিমাগার ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।

বিনিয়োগের ঘাটতি

দেশীয় বড় বড় ফ্যাশন ব্র্যান্ড ও শিল্পগ্রুপগুলোকে এই গ্রিন ভেঞ্চারে এগিয়ে আসতে হবে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ‘গ্রিন ফান্ডিং’ বা সবুজ ঋণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

সবশেষে কাঁঠাল থেকে চামড়া তৈরি কোনো কাল্পনিক গল্প নয়, বরং একুশ শতকের অন্যতম বাস্তবমুখী পরিবেশবান্ধব উদ্ভাবন। বাংলাদেশ যদি এই নতুন সুযোগকে কাজে লাগাতে পারে, তবে বিশ্ববাজারে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগযুক্ত পরিবেশবান্ধব জ্যাকেট, ওয়ালেট কিংবা জুতো এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করবে। এখন প্রয়োজন সমন্বিত সরকারি নীতি, কৃষি গবেষক ও চামড়া শিল্প মালিকদের মেলবন্ধন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে কার্যকর কূটনৈতিক সংযোগ।-জাগো নিউজ