এ বি এম কামরুল হাসান।।
ঈদ সেই কবে শেষ হয়েছে। কিন্তু ছাগলকাণ্ড শেষ হয়নি। চলছে। ছাগলকাণ্ড থেকে ফুল, ফল, পাতা যেন প্রতিনিয়ত গজাচ্ছে। একের পর এক ছাগলামি থেকে বিষয়টি জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে।
আমাদের কালচারে ছাগলামি খারাপ অর্থে ব্যবহার করা হয়। নির্বোধের মত কিছু করলে বলা হয়। ‘ছাগল’ বলে মানুষ মানুষকে গালি দেয়। আসলে ছাগলের বৈশিষ্ঠ্য কিন্তু তা নয়। সাধারণত, ছাগল খুব মিশুক, প্রাণবন্ত, অনুসন্ধিৎসু এবং স্বাধীন প্রাণী। তারা বেশ বুদ্ধিমান বটে। কিন্তু আমরা ছাগলামি বলি বোকা অর্থে।
সবাই বলে, ছাগলে কী না খায়?’ কিন্তু আসল তথ্য হচ্ছে, ছাগল সামনে যা কিছু পায়, তার সবটা খায় না। ছাগল প্রথমে পরখ করে, তারপর গন্ধ শুঁকে নিশ্চিত হয়ে তবেই খায়। যেখানে মানুষ হারাম জেনেও ঘুষ খায়। গন্ধ শুঁকে ঘুষ খায় না। ঘুষ খাবার পর গন্ধ শুঁকে, টাকার গন্ধ।
বস্তুত ছাগল একটি বুদ্ধিমান প্রাণী হলেও আমাদের সমাজে ছাগলকে নির্বুদ্ধ বলা হয়। অপর কথায় ছাগলামি বলে। চলমান ছাগলকাণ্ডে একের পর এক ছাগলামি চলমান। এসব ছাগলামি ধরিয়ে দেয়ার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। সংবাদপত্রকে যদি রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়, তবে আধুনিক যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে রাষ্ট্রের পঞ্চম স্তম্ভ বলা যেতে পারে। ছাগলকাণ্ড নিয়ে আলোচনা প্রথম শুরু হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ছাগল নিয়ে ছাগলামি যখন বাড়তে থাকে, তখন মূলধারার গণমাধ্যম জোরালো ভূমিকা রাখতে শুরু করে।
প্রথম ছাগলামি, মতি পুত্র ইফাত কর্তৃক ছাগলের ছবি ও ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ ও প্রচার করা। এখান থেকে ঘটনা ভাইরাল হয়। জনগণ খুঁজতে থাকে ১৯ বছরের এই ধনাঢ্য বালকের বাবা কে? কি তার আয়ের উৎস? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীরা ইফাতের বাবাকে খুঁজে বের করে। মনে রাখবেন, এ পর্যায়েও মূলধারার গণমাধ্যম ছাগলকাণ্ডে সংযুক্ত হয়নি।
দ্বিতীয় ছাগলামি, ইফাত বলে সে ছাগল কেনেনি। সে এক লাখ টাকার বিনিময়ে ছাগলের সাথে ছবি তুলেছে। সে সাদিক এগ্রোর মালিক ইমরানের ফাঁদে পা দিয়েছে। সে সাদিক এগ্রোর বিপণনে অংশ নিয়েছে। সাথে সাথে ইমরান ইফাতের বক্তব্যকে খণ্ডন করে বলেছে, ইফাত কি সেলেব্রেটি? আমি তাকে দিয়ে প্রতিষ্ঠানের বিপণন করবো কেন? দ্বিতীয় ছাগলামি হালে পানি পায়নি।
তৃতীয় ছাগলামি, ইফাতের পিতা সাবেক কাস্টম কর্মকর্তা মতিউর রহমান এবার এলেন দৃশ্যপটে। অমায়িক অথচ হুংকার সহকারে। তার টার্গেট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীরা। তাদেরকে হুমকি দিলেন। আইসিটি আইনের ভয় দেখালেন। তিনি আইসিটি’তে ‘যাই যাই’ করছেন বলে ভাব দেখালেন। শুধু কি তাই? চোখের পাতা উল্টিয়ে দিলেন। নিজের পুত্রকে দিব্যি অস্বীকার করলেন। এটিই মনে হয় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ছাগলামি। বিপত্তি হলো এখানেই। কেন তিনি নিজ পুত্রকে অস্বীকার করলেন, সেটি খুঁজতে যেয়ে বেরিয়ে এলো তার বিশাল সাম্রাজ্য ভান্ডার।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীরাও ফুঁসে উঠলো। ইফাতের এসএসসি পরীক্ষার নম্বর ফর্দ ভেসে বেড়াতে থাকলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, মতিউর রহমান তার পিতা। এ পর্যায়ে সংযুক্ত হলো মূলধারার গণমাধ্যম কর্মীরা। মূলত, মতিউরের অগাধ সম্পদ ভান্ডারের তথ্য প্রকাশ পায় এ পর্যায়ে। একজন বর্তমান এমপি গণমাধ্যমে বললেন, ইফাতের মা তার কাজিন। ইফাত মতির ছেলে। তারপর থেকে সেই যে মতি লাপাত্তা, আর কোন হদিস নেই। ইফাত তার ছেলে নয়, তার স্বপক্ষে আর কোন তথ্য প্রমাণ নিয়ে অমায়িক বদনে তিনি আর হাজির হলেন না।
চতুর্থ ছাগলামি, এবার বিদেশ থেকে এক মামু অতিথি ভূমিকায় ক্ষনিকের জন্য আবির্ভুত হলেন। বললেন, ইফাত নিজের জন্য ছাগল কেনেনি। আমার (মামুর) জন্য কিনেছে। পরে জানা গেলো, তিনি ইফাতের আপন মামু না। ইফাতের মায়ের কাজিন। ইফাত বলে ছাগল আমি কিনিনি। ছাগল নিয়ে ফটোসেশন করেছি। মামু বলে তার জন্য কিনেছে। এটি ছিল সবচেয়ে দুর্বল চিত্রনাট্য। তাই এই ছাগলামি বেশিক্ষণ টেকেনি।
এবার পঞ্চম ছাগলামি। ঘটনার সপ্তাহ দুয়েক পর এবার দৃশ্যপটে এলেন মতিউরের প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজ। তার টার্গেট গণমাধ্যম কর্মীরা। নিজের উপজেলা পরিষদের দুটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে দম্ভোক্তি করে বলেন, ‘ঢাকার ও নরসিংদীর জাতীয় পত্রিকা ও টেলিভিশনের বড় বড় সাংবাদিকদের মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে কিনেই উপজেলা পরিষদে এসেছেন। তারা আর কিছু করতে পারবে না। নিউজসহ, সব থেমে যাবে।’ মনে হচ্ছে, এটিই ছাগলকাণ্ডে সবচেয়ে বড় ছাগলামি !
এই দম্ভোক্তিতে কয়েকটি প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে। প্রথমত, ধরে নেয়া যাক, তিনি বড় বড় সাংবাদিকদের ম্যানেজ করেছেন। যদি তিনি ম্যানেজ করেই থাকেন, তাহলে সেটা প্রকাশ করাটা ছাগলামি ছাড়া কিছুই নয়। দ্বিতীয়ত, নাকি তিনি তার স্বামীর মত একটি হুংকার দিয়ে ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে চাইছেন? যেমনটি মতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্রচারকারীদের উদেশ্যে বলেছিলেন, তিনি তাদের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নিতে যাচ্ছেন। তৃতীয়ত, ঘুষ দেয়া ও নেয়া দুটোই অপরাধ। সাংবাদিকদের কেনার নামে ঘুষ দেয়ার কথা বলে তিনি প্রকাশ্যে যে দম্ভোক্তি করলেন, শুধুমাত্র তাতেই তাকে অভিযুক্ত করা যায় কিনা? তিনি শপথ ভঙ্গ করেছেন কি না, সেটাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ছাগল পাগলের পাশাপাশি মতিউরের স্ত্রীর এই দম্ভোক্তি নিয়ে তদন্ত শুরু করা আশু প্রয়োজন। দম্ভোক্তিটি ভয়ঙ্কর। সাংবাদিক জাতির জন্য বিরাট অপমানজনক। তিনি যদি সাংবাদিকদের কিনে থাকেন, তবে কোন সাংবাদিক কত টাকায় বিক্রি হলো, সেটি জানার অধিকার জাতির রয়েছে। সেটি জানাবার দায়িত্ব সাংবাদিকদের রয়েছে। আশাকরি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে সেটি জেনে জাতিকে শীঘ্রই জানাবেন।
তদন্ত করছে দুদক। মোটা অংকের টাকা দিয়ে সাংবাদিক থামালে কি দুদক থামবে? তাহলে লায়লা কানিজ কিভাবে বলেন, ‘তারা আর কিছু করতে পারবে না! নিউজ সহ সব ঠিক থেমে যাবে!’ ‘সব’ থেমে যাবে মানে কি তদন্ত, বিচার সব থেমে যাবে? এটি কি দেশের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার উপর চরম আঘাত নয় কি?
বড় বড় সাংবাদিক বিক্রি হয়েছে। একথা শোনার পর এখন পর্যন্ত কোন সাংবাদিক সংগঠনের পক্ষ থেকে কোন বক্তব্য বিবৃতি চোখে পড়েনি। সাংবাদিক সংগঠনগুলো থেকে পদক্ষেপ আশা করছি। তাদের তদন্ত করা প্রয়োজন নিজেদের প্রয়োজনে, পেশার প্রয়োজনে, পেশার বিকাশ, উৎকর্ষ সাধন ও মর্যাদা রক্ষার প্রয়োজনে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলনে বলেছিলেন, “প্রশাসনকে ঠিকভাবে চালাতে সময় লাগবে। এর একেবারে পা থেকে মাথা পর্যন্ত গলদ আছে।” জাতির পিতার উপলব্ধির অর্ধ শতাব্দী পরও আমরা এখনো প্রশাসনকে ঠিকভাবে চালাতে পারিনি। এখনো মাথা পর্যন্ত গলদ আছে, মাথায় গলদ আছে।
তিনি ওই সমাবেশে আরও বলেছিলেন, “এই ঘুষ, দুর্নীতি, চুরি-ডাকাতির বিরুদ্ধে গ্রামে গ্রামে থানায় থানায় সংঘবদ্ধ হয়ে আন্দোলন গড়ে তোল।” এখানে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, ঘুষ দুর্নীতির বিরুদ্ধে গ্রামে গ্রামে, থানায় থানায় সংঘবদ্ধ আন্দোলন এখনো গড়ে উঠেনি। কিন্তু সচেতনতা গড়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে। সেখানে ঘুষখোর দুর্নীতিবাজদের মুখোশ উন্মোচন করা হচ্ছে। পেশাদার গোয়েন্দা সংবাদকর্মীরা কোন কিছু প্রকাশ করার আগেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এগুলো প্রকাশিত ও প্রচার হচ্ছে। সরকার ও সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর দায়িত্ব হচ্ছে, এই সচেতনাকে নগদায়ন করা। লেখক: প্রবাসী চিকিৎসক, কলামিস্ট।
-বাংলাদেশ ইনসাইডার থেকে নেয়া










































