আজ ১৫ আগস্ট। জাতির জন্য গভীর শোকের দিন, বেদনামথিত স্মরণীয় দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ঘটেছিল বাংলাদেশের মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ড। এই হত্যা শুধু একজন প্রেসিডেন্টের জীবনাবসান ঘটায়নি, এর মধ্য দিয়ে জাতি হারিয়েছে আমাদের জাতীয় স্বাধিকার আন্দোলনের এককালের অবিসংবাদিত নেতাকেও। ইতিহাসের এই অবিস্মরণীয় রক্তাক্ত অধ্যায় রাষ্ট্র ও জাতির ওপর তাৎপর্যবহ ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে।
সে হত্যাযজ্ঞে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ছাড়াও তার সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা, তিন পুত্রসন্তান কামাল, জামাল ও রাসেল এবং প্রথমোক্ত দু’ভাইয়ের নববিবাহিতা স্ত্রীদ্বয়, আওয়ামী যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মণি ও তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী এবং আরো ক’জন আত্মীয় ও অতিথি নিহত হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি ও মন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাত এবং তার পরিবারের কিছু সদস্য, মুজিবের অনুজ শেখ আবু নাসের প্রমুখ। আমরা তাদের প্রত্যেকের রুহের মাগফিরাত কামনা করি। তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি জানাই গভীর সমবেদনা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার প্রয়োজন নেই। আমাদের ইতিহাসের স্মরণীয় মহাচরিত্র তিনি। ইতিহাসে নির্ধারিত অবস্থান থেকে তার অপসারণ অসম্ভব।
ঔপনিবেশিক আমলের অন্তিমপর্বে এই উপমহাদেশের পশ্চাৎপদ সংখ্যালঘুদের পৃথক আবাসভূমি কায়েমের আন্দোলনের একজন ছাত্রকর্মী হিসেবে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক অভিযাত্রার সূচনা। ১৯৪৭ সালে সেই নতুন দেশ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অল্প সময় পরেই শুরু হওয়া গণতন্ত্রের সংগ্রামে তার নেতৃত্ব বিকশিত হতে থাকে। বিভিন্ন নিপীড়ন ও প্রতিবন্ধক সত্ত্বেও একসময় তিনি তদানীন্তন পূর্ববঙ্গের গণম্যান্ডেটের অধিকারী নেতার পর্যায়ে উন্নীত হন। বর্তমান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ন্যায্য অধিকার কায়েমের আন্দোলনে প্রথম থেকেই মুজিব ছিলেন সাহসী ও অগ্রণী সারথি। আমাদের জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার কায়েমের সংগ্রামের ক্রমোত্তরণের ধারাবাহিকতায় শেখ মুজিবুর রহমান নিরঙ্কুশ নেতৃত্বের মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছিলেন। তাকে মূল নেতা হিসেবে মেনে নিয়েই ১৯৭১ সালে পরিচালিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ। সাবেক পাকিস্তান আমলের সিকি শতাব্দীতে গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকার কায়েমের আন্দোলনে তার ছিল অনন্য ভূমিকা। এ সময়ে স্বায়ত্তশাসন আদায়ের সংগ্রাম এবং সামরিক শাসনবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শেখ মুজিবের অবদান বিপুল। তখন নির্যাতন, শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্যের পরিপ্রেক্ষিতে জনসাধারণ জাতীয়তাবাদী চেতনায় জাগ্রত, ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত হয়েছিল। পরিপূর্ণ স্বশাসন বা স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সে আন্দোলনের নেতা ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান।
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে মুক্তিলাভের পর মুজিব আমাদের এ অঞ্চলের প্রধান নেতারূপে আবির্ভূত হন। কিন্তু ’৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় পেয়েও তিনি হন রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বঞ্চিত। এ পরিস্থিতিতে মুজিবের আহ্বানে অসহযোগ আন্দোলন এ দেশে কার্যত পাকিস্তানি শাসনের যবনিকাপাত ঘটায়। জনগণ তখন স্বাধীনতার লক্ষ্যে সরব ও তৎপর। ’৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে সেনাবাহিনীর হত্যা ও ধ্বংসের তাণ্ডবের মধ্যে শেখ মুজিবকে বন্দী করে। বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের কিছু পরে মুজিব মুক্তি পেয়ে বীরের বেশে দেশে ফিরে আসেন।
জাতির বৃহত্তর স্বার্থে শেখ মুজিবের যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া উচিৎ। দেশ ও জাতি তার যাবতীয় সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা, বিজয় ও ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে।










































