ঢাকা অফিস।।
বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান-উত্তোলনে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি ‘এক্সন মবিল’-এর দেওয়া প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে সরকার। কোম্পানিটির সঙ্গে দরকষাকষির প্রস্তুতি শুরু করেছে জ্বালানি বিভাগ। এজন্য একটি কমিটি গঠন করা হবে। এতে জ¦ালানি বিভাগের কর্মকর্তারা ছাড়াও আন্তর্জাতিক মানের আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হবে। সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান-উত্তোলন সংক্রান্ত দরকষাকষিতে অভিজ্ঞদের বিবেচনায় নেওয়া হবে। এ ছাড়া অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদন পাওয়া উৎপাদন বণ্টন চুক্তি বা প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট বা পিএসসি ২০২৩-এর আদলে দরকষাকষি চালানো হবে।
কমিটি গঠনের পুরো বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। তিনি বলেন, এক্সন মবিল একাধিক প্রস্তাব দিয়েছে। সর্বশেষ প্রস্তাবে তারা সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগ প্রস্তাব করেছে। সেখানে দেখা গেছে, নানা পর্যায়ে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। ধাপে ধাপে সেই বিনিয়োগ আরও বাড়তে পারে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, এখন আমাদের পিএসসি আন্তর্জাতিক মানের হয়েছে। আমরা টেন্ডার আহ্বান করলে বিদেশি কোম্পানিগুলো আকৃষ্ট হবে। গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। বণ্টনে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রের ব্লকগুলোতে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, উত্তোলনে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করছে মার্কিন কোম্পানি এক্সন মবিল। তাদের দেওয়া প্রস্তাব বাস্তবায়নে আগস্টের মধ্যে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করতে চায় তারা। এজন্য গত ১৬ জুলাই প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের কাছে চিঠি দিয়েছেন এক্সন মবিলের নিউ অপরচুনিটি ম্যানেজার জনাথান উইলসন। তাদের এই প্রস্তাবটি বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী।
জ¦ালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এক্সন গভীর সমুদ্রের কী পরিমাণ সম্পদ আছে তা মূল্যায়নের জন্য দ্বিমাত্রিক জরিপ করতে ৪০ থেকে ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে।
এতে তেল-গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে আরও নিশ্চিত হতে পরে ত্রিমাত্রিক জরিপ করা হবে। এতে ব্যয় হবে ৫০ থেকে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এ ছাড়া প্রতিটি কূপের উন্নয়নে ৮০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পাশাপাশি গভীর সাগরে অনুসন্ধানের লক্ষ্যে অন্তত ১০ থেকে ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে মার্কিন এই প্রতিষ্ঠানটি। পুরো প্রক্রিয়া সফল হলে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করছে তার তুলনায় প্রতিবছর ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থ সাশ্রয় হবে বলে ধারণা দিয়েছে এক্সন তাদের প্রস্তাবে।
তেল-গ্যাস উত্তোলনে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করতে ইতোমধ্যে উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তিও (পিএসসি) সংশোধন করেছে সরকার। এতে অনুসন্ধানে পাওয়া গ্যাসের দাম আগের তুলনায় বাড়ানো হয়েছে। ইতোমধ্যে সংশোধিত পিএসসি মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হয়েছে।
উল্লেখ্য, প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার এবং ভারতের সঙ্গে সমুদ্র বিরোধ মীমাংসার পর বঙ্গোপসাগরকে ২৬টি ব্লকে ভাগ করা হয়েছে। যার মধ্যে অগভীর অংশে ব্লক আছে ১১টি। আর গভীর সমুদ্রে ব্লক আছে ১৫টি। এক্সন মবিল গভীর সমুদ্রের ১৫টি ব্লক এক সঙ্গে ইজারা পেতে চেষ্টা করছে। ২০১৪ সালের পর দফায় দফায় পেট্রোবাংলা চেষ্টা করছে সমুদ্র ব্লকগুলো ইজারা দিতে। তবে তেমনভাবে বিদেশি কোনো কোম্পানির আগ্রহ দেখা যায়নি। এর আগে দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানি পসকো দাইয়ু ইন্টারন্যাশনাল বঙ্গোপসাগরের একটি ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান করেছিল।
পরে বাণিজ্যিকভাবে আরও লাভজনক শর্ত যুক্ত করে পিএসসির মেয়াদ বাড়ানোর দাবি করেছিল। পেট্রোবাংলা রাজি না হওয়ায় কোম্পানিটি বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যায়। এ ছাড়া মার্কিন কোম্পানি কনোকোফিলিপস ও নরওয়েভিত্তিক স্ট্যাটঅয়েল যৌথভাবে সাগরে কয়েকটি ব্লকে অনুসন্ধানের কাজ পেয়েছিল। কিন্তু লাভজনক মনে না হওয়ায় তারা পিএসসি সই হওয়ার আগেই চলে যায়। শুধু ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ওএনজিসি বিদেশ লিমিটেড (ওভিএল) সমুদ্রের একটি ব্লকে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটি অগভীর সমুদ্রের ৪ নম্বর ব্লকে কাঞ্চন নামের এলাকায় অনুসন্ধান কূপ খনন করেছিল। কিন্তু তারা কোনো গ্যাস পায়নি বলে জানিয়েছে। এখন আরেকটি কূপ খননের কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এক্সন মবিলের প্রস্তাব গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা উচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ তেল গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক হোসেন মনসুর আমাদের সময়কে বলেন, মার্কিন কোম্পানি এক্সন মবিল গভীর সমুদ্রে তেল গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে অত্যন্ত দক্ষ এবং পৃথিবীর সেরা প্রতিষ্ঠান। তবে তিনি বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ খুব গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আছে। গভীর সমুদ্র ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূরাজনীতি কী হতে পারে সেই বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে।











































