Home আঞ্চলিক মনের জোরে স্বাবলম্বী তিন নারী

মনের জোরে স্বাবলম্বী তিন নারী

15

মেহেরপুর প্রতিনিধি।।
নসিরন বেগমের স্বামী মারা যান সাত বছর আগে। হতদরিদ্র সংসারে তাঁর স্বামীই ছিলেন একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। স্বামী মারা যাওয়ার পর দু’চোখে অন্ধকার নেমে আসে। তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে কষ্টে দিন কাটে তাঁর।

নসিরনের প্রতিবেশী বারেজান খাতুন (৫৮)। তাঁর স্বামী মারা যান পাঁচ বছর আগে। অসুস্থ একমাত্র ছেলেকে নিয়ে বিপাকে পড়েন তিনি। তাদের সঙ্গী আরেক প্রতিবেশী আয়মা জান। অসুস্থ স্বামীসহ সংসারে দুই ছেলে তাঁর।

দারিদ্র্যের একই সূত্রে গাঁথা তাদের জীবন। তিনজনই একে অপরের সুখ-দুঃখের সঙ্গী। সংসার নিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন তারা। কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। কেউ বলেন ভিক্ষাবৃত্তি করতে আবার কেউ বলেন ঝিয়ের কাজ করতে। তবে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার অবলম্বন খুঁজছিলেন তারা। একসময় তিনজন সিদ্ধান্ত নেন, ছাগল পালন করবেন। কিন্তু তাদের মনে ভয়, কীভাবে মাঠে ছাগল চরাতে যাবেন। সমাজ কীভাবে দেখবে। এসব চিন্তা মাথায় নিয়ে তারা সিদ্ধান্ত নেন– একসঙ্গে ছাগল কিনবেন, একসঙ্গে মাঠে ছাগল চরাবেন। সামাজিক বাধা-বিপত্তি এলে একসঙ্গে মোকাবিলা করবেন।

নসিরন বেগম মুরগি, সামান্য ধান-চাল বিক্রির টাকা এবং দিনমজুর ছেলের সহায়তায় ৮ থেকে ৯ হাজার টাকায় দুটি ছাগল কেনেন। বারেজান বাবার বাড়ি ও ধান-চাল বিক্রির ৭-৮ হাজার টাকায় কেনেন দুটি ছাগল। আয়মা জানের অসুস্থ স্বামীকে চিকিৎসায় সহায়তা দেন গ্রামের মানুষ। সেখান থেকে কিছু টাকা বাঁচিয়ে এবং ছেলেদের সহায়তায় দুটি ছাগল কেনেন।

পাঁচ বছর আগে প্রায় একই সময়ে তিনজনই ছয়টি ছাগল কেনেন। শুরু হয় নতুন সংগ্রাম। সকাল ৯টা থেকে ১২টা পর্যন্ত আবার বিকেলে দুই ঘণ্টা মাঠ, সড়কের ধারে বা পতিত জমিতে ছাগল চরান তারা। কয়েক মাস পর থেকে তাদের ছাগল বাচ্চা দিতে শুরু করে। বাড়তে থাকে ছাগল। ছাগল লালনপালনের এক বছর পর থেকে ছাগল বিক্রি করতে শুরু করেন তারা। এবারের কোরবানিতে একেকজন ৭-৮টি করে ছাগল বিক্রি করেছেন। প্রতিটি ছাগল বিক্রি হয় ১৪ থেকে ২০ হাজার টাকায়।

এখন তাদের সংসারে অভাব নেই। ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনি নিয়ে খেয়ে-পরে দিন কাটছে তাদের। সংগ্রামী এই তিন নারীর বাড়ি মেহেরপুর শহর থেকে তিন কিলোমিটার উত্তরে ফতেপুর গ্রামে।

বর্তমানে নসিরন বেগমের ছাগলের সংখ্যা ছোট-বড় মিলে ২০টি। আয়মা জানের ১৫টি। ছাগল বিক্রির আয়ের টাকায় তাদের প্রত্যেকের একটি করে গাভিও রয়েছে। গাভির দুধ বিক্রি করেও আয় হয়। বর্তমানে তাদের দেড় থেকে দুই লাখ টাকার ছাগল রয়েছে। গাভির দামও প্রায় লাখ টাকা।

নসিরন খাতুন বলেন, ‘অভাব আছে বলে ভিক্ষা করা, লোকের কাছ থেকে চেয়ে খাওয়া লজ্জার। বরং কাজ করে খাওয়া অনেক সম্মানের। আমরা তিনজন বোনের মতো। একসঙ্গে ছাগল চরানো, গরুকে খাওয়ানো, পরস্পরকে সহায়তা করে আসছি।’ তিনি বলেন, তাদের মধ্যে কখনও অমিল হয়নি। খুব কষ্ট করে সংসারে সচ্ছলতা এনেছেন তারা। দু’বেলা ভালোভাবে খেতে-পরতে পারছেন। ছেলেমেয়েদের ভালো পোশাক, বই-খাতা দিতে পারছেন।

বারেজান খাতুনের রয়েছে ছোট-বড় ২৫টি ছাগল। তিনি বলেন, ‘ওরা (অন্য দুজন) ওদের ছাগল বিক্রি করে আমাকে প্রথমেই গাভি কিনে দেয়। গাভির দুধ বিক্রি করে সংসার চলে। পরে ওদের টাকা ছাগল বিক্রি করে পরিশোধ করেছি। ওরাও গরু কিনেছে। এভাবে কষ্ট করে আমরা এখন ভালো আছি।’

আয়মা জানের মেয়ে সাদিয়া স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে। সে বলল, পড়ালেখার ফাঁকে মায়ের কাজে সহযোগিতা করতে চাইলে মা বলেন, ‘তোমরা আগে লেখাপড়া করো, চাকরি অথবা ব্যবসা করো। মানুষের মতো মানুষ হও।’

ফতেপুর সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক শফিউদ্দিন বলেন, ছাগল পালনকারী তিন নারী এখন অনেক নারীর অনুপ্রেরণা। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. সাইদুর রহমান বলেন, ওই নারীদের ছাগলের অসুখ হলে প্রাণিসম্পদ অফিসে নিয়ে আসেন। তাদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করেন তারা।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘ফতেপুর গ্রামের সংগ্রামী তিন নারীকে গাভি কিনে দেওয়া প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।’