ঢাকা অফিস।।
পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার মূলত হিন্দু ধর্মালম্বীদের শাঁখা-সিদুর, টোপর-মালা, মন্দির-কীর্তনের জন্য বিখ্যাত হলেও এখানকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ঘুড়ি, সুতা ও নাটাইয়ের দোকানগুলো। বলা হয়ে থাকে, রাজধানীর সবচেয়ে বড় ঘুড়ির কারখানা ও দোকানগুলো গড়ে উঠেছে শাঁখারীবাজার ঘিরে।
ঘুড়ি ওড়ানোর সংস্কৃতি হাজার বছর আগে চীনাদের মাধ্যমে শুরু হলেও বাংলাদেশে ঘুড়ি ওড়ানো জনপ্রিয়তা লাভ করে নবাবী আমলে। নবাবদের অবসর সময়ে পছন্দের খেলা ছিল ঘুড়ি ওড়ানো। নবাব প্রাসাদের ছাদের এই অভিজাত সংস্কৃতি এখন ছড়িয়ে পড়েছে পুরান ঢাকার প্রায় প্রতিটি অলিতে-গলিতে।
ঘুড়ি ওড়াতে লাগে নাটাই ও সুতা। আর এই তিন উপকরণ নিয়েই শাঁখারীবাজারে জমজমাট থাকে ঘুড়ি ব্যবসা। বিশেষ করে সাকরাইনের আগে ঘুড়ি ব্যবসার কাটতি থাকে তুঙ্গে। একেক দোকানে বিক্রি হয় ১০-২০ লাখ টাকার ঘুড়ি ও ঘুড়ি সংক্রান্ত সামগ্রী।
সাকরাইন মূলত হিন্দু ধর্মালম্বীদের পৌষ সংক্রান্তি হলেও বহু বছর ধরে চলে আসা এ উৎসব এখন আর আলাদা করে কারও ধর্মীয় উৎসব তা নিয়ে পুরান ঢাকার বাসিন্দারা মাথা ঘামায় না। সব ছাপিয়ে সাকরাইন হয়ে উঠেছে পুরান ঢাকার একটি অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যবাহী উৎসব।
প্রতি বছর ১৪ জানুয়ারি ঘুড়ি উড়িয়ে, আতশবাজি ফুটিয়ে আর পিঠা-পুলি দিয়ে পালন করা হয় সাকরাইন। সাকরাইনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ঘুড়ি ওড়ানো ও কাটাকাটি খেলা। কাটাকাটি খেলায় বিজয়ীদের জন্য রয়েছে আবার নানা রকমের পুরস্কার। সাকরাইনের সময়ে প্রায় প্রতিটি বিল্ডিংয়ের ছাদে আয়োজন করা হয় উৎসবের।
সাকরাইন ও ঘুড়ি ওড়ানো নিয়ে পুরান ঢাকার বাসিন্দা বকুল সময় সংবাদকে বলেন, ‘আমাদের ঘুড়ি ওড়ানো এক রকমের পরম্পরা বলতে পারেন। ছোটবেলায় দেখতাম বাপ-চাচারা ঘুড়ি ওড়াচ্ছে, মাঞ্জা দিচ্ছে। সেই থেকে শিখে এখন আমরা ঘুড়ি উড়াই। সাকরাইনের এই সময়ে পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার, লক্ষ্মীবাজার, রায়বাজার ও আশপাশের এলাকার প্রতিটা বিল্ডিং এ উৎসবের আয়োজন করা হয়। একেকটা বিল্ডিংয়ের বাজেট কম করে হলেও ১০ লাখ টাকা।’
একটি উৎসবের পেছনে সবাই এত টাকা কীভাবে খরচ করে জানতে চাইলে বকুল বলেন, ‘এইটার প্রস্তুতি চলে ৬ মাস ধরে। ৩০-৪০ জনের একটা গ্রুপই থাকে। সবাই মিলে টাকা জমায়। কার ছাদে উৎসব কতটা জমজমাট হলো এই নিয়ে প্রতিযোগিতা চলে। বাইরে থেকে অনেকে দেখতে আসে। তাদের আবার আলাদা টাকা দিতে হয়। অনেকে লাখ টাকার বিনিময়ে একদিনের জন্য ছাদ ভাড়া দেয়। অনেকে উৎসব দেখার জন্য ছাদে টিকিট সিস্টেম করে। এ এক ভিন্ন রকমের আনন্দ।’
ঘুড়ির দাম ও চাহিদা কেমন জানতে চাইলে শাঁখারীবাজারের ঘুড়ির দোকানি সুবির নন্দী বলেন, ‘নানা দামের ঘুড়ি আছে। তবে ৮-১০ টাকার ঘুড়ির চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া বড় ঘুড়ির দাম ১৫-২০ টাকা। একদম ছোট ঘুড়ির দাম ৫ টাকা। ঘুড়ির ব্যবসা সারা বছর চলে। তবে সাকরাইনের আগের তিনদিন ব্যবসা এতটা জমজমাট হয় যে ১৪ জানুয়ারির আগে বেশিরভাগ দোকানের ঘুড়ি শেষ হয়ে যায়।’
শাঁখারীবাজারের দোকানগুলোতে পাওয়া যায় বাহারি রঙের ও হরেক রকম নামের নানা ধাচের ঘুড়ি। গোয়াদার, চোকদার, মাসদার, গরুদান, লেজলম্বা, চারভুয়াদার, পানদার, লেনঠনদার, গায়েল কত নাম ঘুড়ির। শাঁখারীবাজার মাতৃভাণ্ডারের ঘুড়ি কারখানায় গিয়ে দেখা যায় নানা রঙের পাতলা কাগজ, আঠা আর বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি হচ্ছে বাহারি রঙ ও সাইজের ঘুড়ি। সাকরাইনের আগে ব্যস্ত সময় কাটে কারখানা কর্মীদের। শুধু সাকরাইন না, সারা বছরই থাকে ঘুড়ির চাহিদা।
ঘুড়ি ব্যবসায়ী বিমলেশ সেন সময় সংবাদকে বলেন, ‘ঘুড়ি এখন শুধু ওড়ায় না। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ঘর সাজতেও ঘুড়ি নেয়া হয়। সারা বছর গাঁয়ে হলুদ-বিয়ের মতো অনুষ্ঠান লেগে থাকে। এজন্য সারাবছরই ঘুড়ির চাহিদা থাকে। তবে বড় বেচাকেনা হয় সাকরাইনের সময়। গত বছর সাকরাইনের শেষ তিনদিনে আমি নিজেই ২০ লাখ টাকার ঘুড়ি বিক্রি করেছি।’
ঘুড়ির পাশাপাশি শাঁখারীবাজারের দোকানগুলোতে বিক্রি হয় নানা রঙের সুতা ও নাটাই। আগে দেশি সুতায় মাঞ্জা দিয়ে বিক্রি করা হলেও এখন ভারতীয় ও চীনা সুতায় মাঞ্জা দেয়া লাগে না- এমনটাই জানান ঘুড়ি ব্যবসায়ীরা।
সুতার মাঞ্জা দেয়া নিয়ে পুরান ঢাকার প্রবীণ বাসিন্দা হলাপেকে কর্মকার বলেন, ‘সুতা যতই বাইরে থেইক্কা আনুক মাঞ্জা দেয়া সুতার দগই আলাদা। আগে আমরা সাগু দানা, শিরিষ, ভাতের মার জ্বাল দিয়া ওইঠির মধ্যে রঙ দিতাম। ঠান্ডা হয়া গেলে চুড় (কাঁচের গুঁড়া) মিশাইতাম। চূড় না থাকলে কাটাকাটি খেলন জমে না। পরে সুতার সঙ্গে সব মিশায়া শুকাইতে দিতাম। ওহন তো এই কালচারই উইঠা গেছে।’
সুতার দাম মূলত নির্ভর করে ধরন ও রিলের সাইজের ওপরে। শাঁখারীবাজারে ২০০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা দামের সুতা পাওয়া যায়। সুতারও আছে নানা ঢঙের নাম। মাক্ষি, ঈগল, বর্ধমান, লালগুন, কালাগুন, কৃষ্ণা, সম্রাট, টাইগার, রক, কিংকোবরা, ডাবল ড্রাগন, ব্ল্যাক ডেভিল ও ডাবল ব্লেটের মতো নানা রকমের সুতা মিলবে শাঁখারীবাজারে।
সুতার পাশাপাশি ঘুড়ির দোকানগুলোতে বিক্রি হয় নানা রকম ও সাইজের নাটাই। মূলত তিন রকমের নাটাই পাওয়া যায় শাখারীবাজারে কাঠের, প্লাস্টিকের ও লোহার। আগে কাঠের নাটাইয়ের চাহিদা থাকলেও ঘুনে ধরে বলে অনেকেই এখন আর কাঠের নাটাই কিনতে চান না। তবে বিক্রেতারা বলেন, নাটাইয়ের মধ্যে কাঠের নাটাইয়ের জুড়ি নেই। নতুন নাটাই কিনে সরিষার তেল মেখে দুদিন দুবেলা রোদে দিলে নাটাইয়ে আর ঘুন পোকা আক্রমণ করতে পারে না। ইঞ্চির ওপরে ভিত্তি করে নাটাইয়ের দাম নির্ধারণ করা হয়। একদম ছোট সাইজের নাটাইয়ের দাম ১৫০ টাকা আর ভালো মানের বড় সাইজের নাটাইয়ের দাম ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে দেড় হাজার টাকা।
করোনাকালে দেশের প্রায় প্রতিটি ব্যবসায় ধস নামলেও ঘুড়ি ব্যবসায়ীরা জানান, স্মরণকালের সেরা ব্যবসা হয়েছে করোনাকালে।
ঘুড়ি ব্যবসায়ী অনুপম বলেন, ‘লকডাউনে মানুষ বাসা থেইক্কা বাইর হইবার পারে নাই। তখন তো আর করবার মতোন কুনু কাম নাই, ছাদে উইঠা ঘুড্ডি উড়াইছে। ওই সময় সব ব্যবসা ডাইল গেলেও ঘুড্ডি ব্যবসা হইছে মারাত্মক। চাহিদা বেশি থাকায় ঘুড্ডির দামও বাইড়া গেছিল। এখন যে ঘুড্ডির দাম দেখতাছেন ১০ টাকা, ওইটা করোনাসময়ে বেচছি ২০ টাকায়। ২০০ টাকার সুতার দাম ৮০০ টাকা হওয়ার পরও মাইনষ্যে ধুমায়া কিনছে।’
সাকরাইনের এক সপ্তাহ আগেই জমে ওঠে শাঁখারীবাজারের ঘুড়ির ব্যবসা। তবে ক্রেতারা বলছেন, এবার ঘুড়ি-নাটাইয়ের দাম আগের বছরের তুলনায় বেশি।
ঘুড়ি কিনতে আসা মেহেদি হাসান বলেন, ‘৬ টাকার ঘুড়ির দাম রাখতেছে ৮ টাকা। ৫০০ টাকার নাটাই চাইতেছে ৮০০ টাকা। এইবার দাম একটু বেশি।’
দাম বেশি কেন জানতে চাইলে ঘুড়ি ব্যবসায়ীরা জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর কাগজের দাম বেশি। এ ছাড়া কাঠ-লোহার দাম বাড়ায় বেড়ে গেছে নাটাইয়ের দাম।
পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারের সবচেয়ে বড় শিল্প শাঁখা-শঙ্খ। তবে শাঁখা-শঙ্খ ছাড়াও ঘুড়ি-নাটাইয়ের ব্যবসায় সবসময় জমজমাট থাকে শাঁখারীবাজারের ব্যবসা। সপ্তদশ শতকে নবাবদের ছাদে অবসরের এ খেলা কালক্রমে হয়ে উঠেছে পুরান ঢাকার প্রতিটি বাড়ির ছেলে-বুড়োদের সংস্কৃতির অংশ। আর এই সংস্কৃতির সূতিকাগার হিসেনে কালের সাক্ষী হয়ে এখনও টিকে আছে শাঁখারীবাজার।









































