Home কলাম গর্ভকালীন মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কমিউনিটি ক্লিনিক

গর্ভকালীন মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কমিউনিটি ক্লিনিক

32

-জিনাত আরা আহমেদ

রুবিনা একটি বেসরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক। সেদিন স্থানীয় কমিউনিটি ক্লিনিকে উপস্থিত হয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন চিত্তে জানতে চাইলেন তার বাচ্চার উন্নতির জন্য কোন চিকিৎসা আছে কিনা। পরিবার কল্যাণ সহকারী ফাতেমা যখন বললেন, আপনার বাচ্চাকে নিয়ে আসেন তখন কিছুটা সান্তনা পেলেন। নির্ধারিত দিনে রুবিনার বাচ্চাকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে ফাতেমা বুঝতে চেষ্টা করল ওর সমস্যা। বাচ্চাটা ঠিকমত বসতে পারে না এবং নিউরো ডেভলপমেন্ট ঠিকমত না হওয়ায় ওর কথা বলায় জড়তা রয়েছে। আচরণেও অস্বাভাবিকতা, যেমন কামড়ানোর প্রবণতা রয়েছে। বাচ্চাকে দেখার সময় রুবিনার সাথে কথাবার্তার ফাঁকে কিছুটা আন্তরিকতা গড়ে ওঠায় জানা গেল বাচ্চা গর্ভে থাকা অবস্থায় রুবিনা প্রায়ই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতেন। কারণ জানতে চাইলে বললেন, বিয়ের পর থেকেই রুবিনার শাশুড়ি ওকে নানা ধরণের মানসিক কষ্ট দিয়ে আসছেন। কখনো কখনো শারীরিকভাবেও আঘাত করেছেন। সন্তান গর্ভে আসার পর রুবিনার মনোকষ্ট বাড়তে থাকে, তাই প্রায়ই ফুঁপিয়ে কাঁদতেন।

গর্ভাবস্থা একজন নারীর জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সূচনালগ্ন। এসময়টাতে মায়ের মনোদৈহিক যতেœর সাথে তার পারিপার্শিক পরিবেশও অনুকূল থাকা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশের অনেক নারী সন্তান গর্ভে থাকাকালীন নানা ধরণের মানসিক কষ্ট সহ্য করেন। পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের নানাবিধ আচরণের কারণে কষ্টের অনুভূতি তৈরি হয়। কিন্তু গর্ভাবস্থায় যে কোন ধরণের মানসিক চাপে গর্ভস্থ সন্তানের বিকাশ বাধাগ্রস্থ হতে পারে। মনের যেকোন চাপ যেমন: দুশ্চিন্তা, অবদমন, টেনসন গর্ভকালীন সময়ে হরমোনাল ইমব্যালান্স তৈরি করে, যা গর্ভস্থ শিশুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই কথাগুলো বলছিলেন পরিবার কল্যাণ সহকারী ফাতেমা। গর্ভকালীন সময়ে নারীরা মানসিকভাবে বেশ স্পর্শকাতর হয়ে থাকে। কারো কারো ক্ষেত্রে অতি আবেগের কারণে রেগে যাওয়ার প্রবণতা থাকে। এসময়ে মানসিক জটিলতা পরিহার করা উচিত। যেমন: স্বেচ্ছাচারিতা ও হিংসাত্মক আচরণ পরিহার করে চলা জরুরি। গর্ভবতী মাকে মনোবল বাড়াতে হবে। পরিবারের সবার মন মানসিকতা একরকম হয় না, আবার পারিপাশির্^ক পরিস্থিতিও সবক্ষেত্রে অনুকূল থাকে না। তবুও শিশুর স্বার্থে অনাগত সন্তানের সুস্থতার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া মা এবং অন্যদের বিশেষ দায়িত্ব।

মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে গ্রামীন নারীদের জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক এখন আশীর্বাদ। কমিউনিটি ক্লিনিক হচ্ছে স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও পরিবার-পরিকল্পনা সেবার একটি পরামর্শ কেন্দ্র। দৈহিক সুস্থ্যতার সাথে মানসিক স্বাস্থ্যকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পরিবার পরিকল্পনা ও প্রসূতি সেবাকে সহজলভ্য করতে শেখ হাসিনা সরকার তৃণমূল পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করেন। গ্রামের সাধারণ মানুষ যেকোন স্বাস্থ্য সমস্যার সম্মুখীন হলে তারা যেন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে সেই লক্ষ্যে ১৯৯৮-২০০১ সাল মেয়াদে প্রায় ৮,০০০ ক্লিনিক চালু হয়েছিল। পরবর্তীতে আবার ২০০৯-২০১৪ সাল পর্যন্ত ৫ বছর মেয়াদে কমিউনিটি ক্লিনিক প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১২ হাজারের অধিক কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে সারা দেশে কমিউনিটি ক্লিনিকের সংখ্যা প্রায় ১৪ হাজার। সরকারের লক্ষ্য প্রতি ছয় হাজার পরিবারের জন্য অন্তত একটি করে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা। একজন স¦াস্থ্য সহকারী ও একজন পরিবার কল্যাণ সহকারী নির্দিষ্ট সময়ে যৌথভাবে কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবা প্রদান করে থাকেন। এখান থেকে টিকা প্রদান কর্মসূচিসহ বিনামূল্যে ২৭ প্রকার ঔষধ সরবরাহ করা হয়।

মানসিক রোগ ও অটিজমের ক্ষেত্রে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছেন বর্তমান সরকার। বাল্যবিবাহের কারণে আমাদের দেশে অনেক মায়েদের সন্তানের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। তাই বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করছে কমিউনিটি ক্লিনিক। অল্প বয়সে মেয়েদের শরীর সন্তান ধারণের জন্য উপযুক্ত হয় না। তাই কখনো কখনো প্রতিবন্ধী শিশু জন্ম নেয়। অনেক সময় শিশুর জন্মের কিছুদিনের মধ্যে অটিজমের লক্ষণ প্রকাশ পায়। এক্ষেত্রে জন্মগত ত্রুটির কারণে শিশুর কথা বলা কিংবা আচরণে অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়। এটা এক ধরণের অপরিণত শারীরিক ও মানসিক অবস্থা।

গর্ভধারনের আগে থেকে ফলিক এসিড সেবনে অনাগত সন্তানের জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। কমিউনিটি ক্লিনিক থেকেই ফলিক এসিড সন্তানসম্ভবা নারীরা পেয়ে থাকেন। এখান থেকে নিয়মিত আয়রণ ও ক্যালসিয়াম দেয়া হয়। গর্ভাবস্থায় সবচেয়ে জরুরী হলো ক্যালসিয়াম ও আয়রণ। কারণ সন্তান ধারণ এবং স্বাভাবিকভাবে জন্মদানের জন্য ক্যালসিয়াম গুরুত্বপূর্ণ, এর অভাবে গর্ভপাতের সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া আয়রণের অভাবহেতু রক্তশূণ্যতা প্রসূতির মৃত্যুঝুঁকি তৈরি করে। কমিউনিটি ক্লিনিকে উপস্থিত মায়েদের উদ্দেশ্যে পরিবার কল্যাণ সহকারী ফাতেমা বলেন, প্রাকৃতিক খাবারের মধ্যে ছোলাতে প্রচুর ক্যালসিয়াম থাকে। এছাড়া কচুশাকে যথেষ্ট আয়রণ থাকায় মায়েদের নিয়মিত এগুলো খেতে হবে।

সন্তানের মস্তিষ্কের বিকাশ মায়ের গর্ভাবস্থায়ই শুরু হয়। শিশু মায়ের গর্ভে থাকাকালীন তাই মায়ের দরকার বাড়তি যতœ। এসময় শরীরে যথেষ্ট পুষ্টি উপাদান থাকা প্রয়োজন। গর্ভাবস্থায় ২৯০০ কিলোক্যালরি খাবার দরকার হয়। সামুদ্রিক মাছ শিশুর বুদ্ধিমত্তা বাড়াতে সাহায্য করে। সামুদ্রিক মাছ যেমন টুনা মাছ, কডলিভার অয়েলে প্রচুর ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড থাকে। তাই গর্ভধারণের চতুর্থ মাস থেকে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড যুক্ত খাবার খাদ্য তালিকায় বেশি রাখতে হবে। গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে ভিটামিন-ডি এর অভাব হলে শিশুর মস্তিষ্ক বিকাশ ঠিকভাবে হয়না। ডিম, গরুর মাংস, কলিজা এ জাতীয় খাবারে ভিটামিন-ডি থাকে। এছাড়া সূর্যের আলোয় ভিটামিন-ডি থাকায় দিনের কিছু সময় রোদে থাকা জরুরি। এগুলোর সাথে সাথে নিয়মিত দুধ ও দই খেতে হবে। গর্ভাবস্থায় খাবারে ভিটামিন-ই শিশুর স্মৃতিশক্তি বাড়ায়। বাদাম ও কালোজামে রয়েছে ভিটামিন-ই। ডিমের কুসুমে প্রচুর কোলিন থাকে যা স্মৃতিশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। দৈনন্দিন খাবারে আয়োডিনযুক্ত লবণ থাকতেই হবে। আয়োডিন শিশুর বুদ্ধিমত্তা বিকাশের অন্যতম নিয়ামক।

একটা সুস্থ্য-স্বাভাবিক সন্তান পৃথিবীতে আসার জন্য পুষ্টিকর সুষম খাবার যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি মানসিক প্রশান্তি ও স্থিরতা অত্যন্ত জরুরি। মায়ের আচরণ গর্ভস্থ শিশুর বিকাশ ও চেতনায় গভীর ছাপ ফেলে। মায়ের যেকোন পরিবেশে খাপ খাইয়ে চলার দক্ষতার মাধ্যমে গর্ভস্থ শিশুর বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ঘটে এবং পরবর্তীকালে শিশুর মাঝে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা গড়ে ওঠে। মায়ের ইতিবাচক চিন্তা গর্ভস্থ শিশুর মাঝে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে। তাই গর্ভাবস্থায় শুভ ও কল্যাণ চিন্তায় অতিবাহিত করা জরুরি।

লেখক: উপপ্রধান তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, খুলনা।