ইয়াসমীন রীমা||
পৃথিবীব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তিত হচ্ছে এবং পৃথিবীর সব স্থানে ভৌত,প্রাকৃতিক সমাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রসহ জনগোষ্ঠির জীবন ও জীবন ব্যবস্থার ওপর তা প্রভাব ফেলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণ হলো পৃথিবীর উঞ্চায়ন। গত ৫০ বছরে এ উষ্ণায়নের হার অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি এবং প্রধান কারণ হচ্ছে উন্নত বিশ্বে ব্যাপকভাবে জ্বালানি গ্রিনহাউজ গ্যাস প্রভৃতির ব্যবহার। পৃথিবীব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বিভিন্ন দুর্যোগের পরিমাণ এবং ব্যাপ্তি বৃদ্ধি পেয়েছে।
ভৌগোলিক কারণেই পৃথিবীর অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশগুলির মধ্যে বাংলাদেশ একটি। বন্যা, খরা, নদীভাঙন ,ঘূণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের নিয়মিত মোকাবেলা করতে হয়। বাংলাদেশ পৃথিবীর সর্বোচ্চ জলবায়ু বিপন্ন দেশগুলোর একটি। ভৌগোলিক অবস্থান, বর্ধিত জনসংখ্যা ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগের কারণে এমনিতেই দেশটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তার ওপর জলবায়ু পরিবর্তন এ সমস্যাগুলোকে আরো জটিল করে তুলেছে। বিগত বছরগুলোতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশেষত বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা এবং অতিরিক্ত গরম ও শীতের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে ব্যাপকহারে। এসব দুর্যোগের কারণে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। সেই সঙ্গে অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক সম্পদও বিনষ্ট হচ্ছে।
গত ২০০৯ সালের ২৫ মে প্রবল বেগে এবং দীর্ঘস্থায়ী ঘূর্ণিঝড় আইলা আঘাত হানে উপকূলীয় খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলায়। আইলার আঘাতে নদীর বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। গৃহহীন হয়ে পড়ে প্রায় দেড় লাখ মানুষ। আইলার আঘাতের পরপরই শুরু হয় বর্ষাকাল। নদীগুলোর পানি বৃদ্ধির কারণে সময়মতো বাঁধ মেরামত সম্ভব হয় না। গৃহহীন জনগণ আশ্রয় নেয় নদীর বেড়িবাঁধের ওপর। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভানেত্রী আয়েশা খানম বলেন- “সরকার এসব এলাকায় পর্যাপ্ত ত্রাণের ব্যবস্থা করলেও পানীয় জল এবং চিকিৎসা সেবার অপর্যাপ্ততা রয়েই যায়। এর প্রভাব পড়ে নারী ও শিশুদের ওপর। খাবার পানির অভাব তো আছেই সেই সঙ্গে রোগবালাই এবং চিকিৎসার অভাব দেখা দেয়। দুই গ্রাম খুঁজেও ডাক্তারের দেখা মেলে না। গত কয়েক মাসে পদ্মপুকুর ইউনিয়নে (শ্যামনগর) প্রসব বেদনা, ডায়রিয়া, আমাশয়, হৃদরোগ, অপুষ্টিসহ বিভিন্ন রোগে ২৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এদের মধ্যে অধিকাংশই নারী।”
দুর্যোগ কবলিত এলাকায় সব মানুষই সমস্যার মধ্যে থাকে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হয়। আশ্রয়কেন্দ্র যাওয়া,সেখানে থাকা, পয়োনিস্কাষন-কোনোটিই নিরাপদ নয়। তারা যৌন হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হয়। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে কিশোর-কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য পরিবারে ও সমাজে খুব গুরুত্ব পায়না। দুর্যোগ পরিস্থিতিতে কৈশোর স্বাস্থ্য আরও নাজুক অবস্থার মধ্যে পড়ে। বিশেষ করে কিশোরীরা যৌন হয়রানির শিকার হয়। তারা প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয়।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্ল্যান বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মুনির হোসেন বলেন,“ দুর্যোগের সময় এসব কেন্দ্রে আসা কিশোরীরা নানা প্রতিকুলতার মুখে পড়ে। তাদের জন্য পৃথক কোনো কক্ষ নেই। এসব কেন্দ্রে তাদের যৌন হয়রানির ঝুঁকি বাড়ে। দুর্যোগের সময় গঠিত মেডিকেল টিমে সাধারণত নারী চিকিৎসক থাকেন না বলে দুর্যোগকবলিত নারীরা বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা নিতে পারেন না।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সেলিং অ্যান্ড এডুকেশনাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক মেহতাব খানম বলেন,“ঋতুকালীন সময়ে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে আসা কিশোরীদের বিড়ম্বনা সবচেয়ে বেশি। এসব কেন্দ্রে যে সাহায্য-সহয়তা দেওয়া হয়,তার মধ্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন রাখা দরকার।”
প্ল্যান বাংলাদেশের বাংলাদেশীয় প্রকল্প ব্যবস্থাপক সেলিনা আমিন বলেন,“ দেশের জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ কিশোর-কিশোরী। এদের বয়স ১০ বছর থেকে ১৯ বছরের মধ্যে। সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে গ্রাম ও শহরের কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বৈষম্য আছে। দুর্যোগের সময় ঘূর্নিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে আসার কিশোরীরা ঋতুকালীন পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করে, তা বর্ণনাও করা কঠিন।”
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আবদুল ওয়াজেদ বলেন,“ ২০১২ সালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনে শিশু ও বৃদ্ধরা গুরুত্ব পেয়েছে। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে নির্মাণ বিষয়ক নীতিমালা নারী, শিশু, বৃদ্ধ ,প্রসূতি ও প্রতিবন্ধীদের বিষয় আছে। তবে কিশোরীদের বিষয়গুলি আলাদা করে স্থান পায়নি। ১২টি জেলায় ১৬ হাজার স্বেচ্ছাসেবক আছে যাঁরা দুর্যোগের সময় কাজ করেন। তাঁদের এক-তৃতীয়াংশ নারী। কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে নারী স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজে লাগানো যেতে পারে।”
কানাডার আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা মোমেনা খাতুন বলেন,“ কিশোর-কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক কৌশলপত্র ২০০৬ তৈরি হয়েছে। তবে কৌশলপত্র বাস্তবায়নে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। দুর্যোগে কৈশোর প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকারের বিষয়টি কৌশলপত্রে অর্ন্তভুক্ত করার সুপারিশ রয়েছে।”
বাংলাদেশে ৬৮ শতাংশ কিশোরীর বিয়ে হয় ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগে। এদের প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিত করতে হলে কোথায় সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে তা জানাতে হবে। আর সংশ্লিষ্ট কর্মসুচিগুলির সঙ্গে অভিভাবকদেরও সংম্পৃক্ত হওয়া জরুরি। পরিবারে ও সমাজে এখনও নারীকে কিশোরীকে বোঝা ভাবা হচ্ছে। স্বাভাবিক অবস্থায় কিশোরীর স্বাস্থ্য পরিবারে সমাজে প্রাধান্য পায় না। পরিস্থিতি বদল হতে হবে মনোজগত পরিবর্তন হওয়া দরকার। দরকার কিশোর-কিশোরীবান্ধব দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি। তাছাড়া বৈষম্যহীন, নিরাপদ প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য অবাধ তথ্যপ্রবাহ দরকার। সাংবাদিকেরা ‘স্পর্শকাতর’ বা ‘নিষিদ্ধ’ এসব ধারণা নিয়ে বার্তা দেওয়ার বা শব্দ ব্যবহারের সময় দ্বন্দে¦ ভোগেন। এ ক্ষেত্রে অবস্থান স্পষ্ট করা উচিত। দুর্যোগ পরিস্থিতিতে অসহায়ত্বের সুযোগ যেন কেউ নিতে না পারে, সে জন্য স্থানীয় সরকার ভূমিকা রাখতে পারে। তবে দুর্যোগ কিশোরীদের ওপর দীর্ঘ মেয়াদের প্রভাবটি হচ্ছে দুর্যোগের কারণে দরিদ্র মানুষ আরও দরিদ্র হয়। বাল্যবিবাহের শিকার হয় দরিদ্র পরিবারের কিশোরী। অন্যদিকে অনেকে উপকূল থেকে ঢাকা শহরে চলে আসে। তারা বস্তিতে আশ্রয় নেয় এবং নগর দারিদ্রের দুষ্ট চক্রে আটকে যায়।
দুর্যোগে অনেকে আতংকগ্রস্থ হয়ে পড়ে মানসিক আঘাত পায়। সহায়তা কর্মসূচিতে এদের জন্য মানসিক চিকিৎসার ব্যবস্থা জরুরি হয়ে পড়ে। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে যৌন হয়রানি বা কোনো ধরনের আঘাতের প্রভাব থেকে যায় সারা জীবনের জন্য দুর্যোগ মোকাবিলা পরিকল্পনা বা কর্মসূচিতে এদের বিষয়গুলি তাই অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন।
ইয়াসমীন রীমা, জেলা প্রতিনিধী, ডেইলী নিউএজ, শাসনগাছা, কুমিল্লা/ পিআইডি- শিশু ও নারী উন্নয়নে সচেতনতামূলক যোগাযোগ কার্যক্রম (৫ম পর্যায় প্রকল্প কার্যক্রম)










































